রিচাকে ভারত অধিনায়ক দেখতে চান সৌরভ; নিয়োগপত্র তুলে দিলেন মমতা, সঙ্গে বঙ্গভূষণ
শনিবার ইডেন সাক্ষী থাকল এক নয়া অধ্যায়ের ৷ সোনার ব্যাট, 34 লক্ষ টাকা, ডিএসপি পদমর্যাদার পুলিশে চাকরি ও বঙ্গভূষণে সম্মানিত বঙ্গতনয়া রিচা ঘোষ ৷

Published : November 8, 2025 at 7:58 PM IST
কলকাতা, 8 নভেম্বর: রিচাময় ইডেন ৷ এমন হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ৷ প্রথম বাঙালি বিশ্বকাপজয়ী রিচা ঘোষকে সম্মাননা দিল সিএবি ৷ ইডেন গার্ডেন্সে রিচার জন্য আজ পুরস্কারের মেলা প্রস্তুত ছিল। সন্ধে হতেই আকাশ ছেয়ে গেল বাজির রোশনাই ৷ একের পর এক রিচার জন্য সম্মান হাজির হল মঞ্চে ৷ সোনার ব্যাট থেকে 34 লক্ষ টাকা, ডিএসপি পদমর্যাদার পুলিশে চাকরি ও বঙ্গভূষণে সম্মানিত বঙ্গতনয়া রিচা ঘোষ ৷
রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার তরফে আয়োজিত রিচার সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রাক্তন ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী-সহ রিচা ঘোষের বাবা, মা এবং বিশিষ্টজনরা ৷ এদিন ইডেন গার্ডেন্সের ক্লাব হাউসের লনের সামনেই বাঁধা হয়েছিল মঞ্চ। সেখানে রিচাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন সিএবি সচিব বাবলু কোলে। তাঁর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট নীতীশরঞ্জন দত্ত। মিষ্টি তুলে দেন যুগ্মসচিব মদন ঘোষ।
পুরস্কার আর উপহারের প্লাবনে ভাসলেন রিচা
এরপরই আসল চমক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত দিয়ে রিচাকে সোনার ব্যাট ও বল তুলে দেয় সিএবি। রিচাকে দেওয়া হয় 34 লক্ষ টাকার চেক। যেহেতু তিনি ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে 24 বলে 34 রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেছিলেন। ফাইনালে প্রত্যেক রান পিছু এক লক্ষ টাকা করে দেয় সিএবি। রিচা ধন্যবাদ জানান সকলকে। তাঁর চোখে আরও বড় স্বপ্ন। ভারতের হয়ে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করার অঙ্গীকার নেন ইডেনের মঞ্চ থেকে ৷ রিচা যখন পুরস্কার আর উপহারের প্লাবনে ভাসছেন, তখন ইডেনের আলো ঝলমলে মঞ্চে বসে মুখে চওড়া হাসি বাবা মানবেন্দ্র ও মা স্বপ্না ঘোষে। মেয়ের এই সাফল্য গর্বিত তাঁরা।
রিচার ব্যাটিং করা সবথেকে কঠিন
এদিন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ক্রিস্টালের ঘোড়া তুলে দেন রিচার হাতে। মহারাজ আগামিদিনে ভারতের অধিনায়ক হিসাবে দেখতে চান 22-এর এই রিচাকে ৷ মঞ্চে বসে তখন রিচার হাসিমুখ ৷ রিচার জন্য আরও প্রত্যাশা বাড়বে বলেও জানিয়ে দিলেন মহারাজ ৷ বললেন, রিচার ব্যাটিং করা সবথেকে কঠিন ৷ 6 নম্বরে যে ব্যাটার নামেন তাঁকে প্রবল চাপে থাকতে হয় ৷ হাতে বল থাকে না, সঙ্গে দলের রান সংখ্যা বাড়ানোর চাপ ৷ রিচার স্ট্রাইট রেট ভীষণ ভালো ৷ আমরা চাই আগামীতে রিচা ভারতীয় দলের অধিনায়ক হোক ৷
এদিন দাদার গলায় উঠে এল, মেয়েদের ক্রিকেটের উত্তরণের কথা। শোনা গেল ঝুলন গোস্বামীর লড়াইয়ের গল্প। একইভাবে ঝুলন গোস্বামীর অনুরোধে রিচাকে বাংলা দলে অনেক কম বয়সে অন্তর্ভুক্ত করার কথা।
বাংলার সেরা খেলোয়াড় রিচা
অন্যদিকে, প্রাক্তন ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বমী শোনালেন রিচাকে পাওয়ার গল্প। 'চাকদা এক্সপ্রেসের কথায়, "রিচা খুব ট্যালেন্ডেড, ওর মতো বয়সে এত ট্যালেন্ট দেখিনি ৷ আমার দেখা বাংলার সেরা খেলোয়াড় রিচা ৷ সমস্ত ট্রফি রয়েছে ওর কাছে ৷ আমাদের স্বপ্নপূরণ করেছে রিচা ৷ ওর জার্নি শুরু হল, তাই এক্সপেকটেশন আমাদের বাড়তে থাকবে ৷

ঝুলনের বক্তব্য
ঝুলন বলেন, "2013 সালে সিএবি-কে বলেছিলাম, জেলা থেকে প্রতিভা তুলে আনতে চাই। সেই বছর শুরু হয়েছিল ট্যালেন্ট হান্ট। সেখানেই রিচাকে প্রথম দেখি। আমার দেখা সেরা প্রতিভা।" তবে রিচাকে সিনিয়র দলে খেলাতে সমস্যায় পড়েছিলেন ঝুলন। তিনি বলেন, "ওকে যখন বাংলার সিনিয়র দলে খেলাতে চাই, অনেকে বলেছিল, ওর বয়স কম। কিন্তু সিএবি ও কর্তারা পাশে ছিল। সকলে বুঝে গিয়েছে, আমার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। তবে এখান থেকে রিচার নতুন লড়াই শুরু।"
সৌরভের বক্তব্য
শিলিগুড়ির রিচা প্রথম বাঙালি যাঁর বাড়িতে বিশ্বকাপ রয়েছে। কাকতালীয় ভাবে, রিচা এমন সময়ে বিশ্বকাপ জিতলেন যখন সৌরভ বাংলার ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি। শুধু তাই নয়, সেই সৌরভই রিচাকে সংবর্ধনা জানালেন। ভারতীয় দলে রিচার কতটা দায়িত্ব সে কথা শোনা গিয়েছে সৌরভের মুখে। তিনি বলেন, "রিচা 6 নম্বরে ব্যাট করতে নেমে যে কাজটা করে সেটা সবচেয়ে কঠিন। কারণ, বল কম পায়। রান করতে হয় অনেক বেশি। সেখানে ও রান করেছে। ওর স্ট্রাইক রেটটাই তফাত গড়ে দিয়েছে (এ বারের বিশ্বকাপের সেরা স্ট্রাইক রেট রিচার। 133.34 স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন তিনি)।" তারপরেই নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন সৌরভ। তিনি বলেন, "এক দিন যেন বলতে পারি রিচা ঘোষ ভারতের অধিনায়ক। সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি।"
ডুমুরজলায় নতুন অ্যাকাডেমি তৈরি
হাওড়ার ডুমুরজলায় নতুন অ্যাকাডেমি তৈরি হচ্ছে সিএবি-র। জায়গা দিয়েছে রাজ্য সরকার। সৌরভের প্রতিশ্রুতি, "এক বছরের মধ্যে বিশ্বমানের অ্যাকাডেমি তৈরি হবে ডুমুরজলাতে। তার ফল বাংলার ক্রিকেটারেরা পাবে।"

ধোনির মতো দুধ প্রিয় রিচার ?
রিচা বলেন, "নেটে একটা লক্ষ্য রেখে ব্যাট করি। ম্যাচে যা হতে পারে, সেটাই অনুশীলনে করি। তাতে ম্যাচে সুবিধা হয়।" সাজঘরে সতীর্থদের অনেকেই তাঁকে 'ছোট মাহি' বলে ডাকেন । মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো বড় বড় ছক্কা মারেন বলেই এই নাম তাঁর। তবে কি ধোনির মতো দুধও তাঁর প্রিয়? রিচা বলেন, "ছোটবেলায় খেতাম। কিন্তু এখন আর খাই না।" তিনি জানিয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতিতে খেলতেই ভালোবাসেন তিনি। দলকে জেতাতে ভালোবাসেন। জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বকাপ জেতার পর যে পদক পেয়েছেন, তা বাড়িতে তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে একেবারে সামনে রাখা থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতার বক্তব্য
মমতা বলেন, "ওর কাছে অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু ওর উপর চাপ দেব না। যা করছে, সেটা ভালোভাবে করুক। সব সময় তো একই পরিকল্পনায় সাফল্য আসে না। পরে হয়তো অন্য কোনও পরিকল্পনা করবে। অন্যভাবে সফল হবে।" পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, তিনি সৌরভকে বিশ্ব ক্রিকেটের মসনদে দেখতে চান। মমতা বলেন, "জানি, সৌরভ হয়তো রাগ করবে। কিন্তু আমি একটা কথা বলতে চাই। এ এত বছর ভারতের অধিনায়ক ছিল। প্রশাসনও সামলেছে। ওর কি আইসিসি-র প্রধান হওয়া উচিত ছিল না? আমি বিশ্বাস করি, ও এক দিন সেটা হবেই। ওকে আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই।"
কী কী পেলেন বঙ্গকন্যা?
এদিন রাজ্য সরকারের তরফে রিচার হাতে পুলিশের নিয়োগপত্র তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেন্ডেন্ট (ডিএসপি) পদে চাকরি পেলেন রিচা। সঙ্গে তাঁর হাতে বঙ্গভূষণ পুরস্কার ও ট্রফি তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। রাজ্য সরকার ও ক্রীড়া দফতরের তরফ থেকে রিচাকে সোনার হার পরিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আগেই রিচাকে সোনার ব্যাট-বল ও 34 লক্ষ টাকা তুলে দেয় সিএবি ৷

