ETV Bharat / sports

শিখিয়েছেন পরিশ্রম করতে, রিচার স্বপ্নের উড়ানের প্রথম পাইলট 'পিটার গ্রাফ' মানবেন্দ্র

নিজে হতে পারেননি ৷ তারকা ক্রিকেটার হওয়ার অধরা স্বপ্ন মেয়ের মাধ্যমে পূরণ করলেন মানবেন্দ্র ৷ হার না মানা বাবা-মেয়ের কাহিনি তুলে ধরল ইটিভি ভারত ৷

RICHA GHOSH
বাবা ও মায়ের সঙ্গে রিচা (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 3, 2025 at 5:33 PM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 3 নভেম্বর: এ যেন পিটার গ্রাফ এবং স্টেফি গ্রাফের ভারতীয় সংস্করণ। সাতের দশকের শেষ এবং আটের দশকের শুরুতে জার্মানিতে মেয়ে স্টেফি গ্রাফের হাতে টেনিস ব়্যাকেট তুলে দিয়েছিলেন বাবা পিটার। তিনিই ছিলেন মেয়ের প্রথম কোচ। যতদিন মেয়ে টেনিস সার্কিটে রাজ করেছেন ততদিন সিংহভাগ ম্যাচে গ্যালারিতে বসে নজর রেখেছেন পিটার।

টেনিস কিংবদন্তীর জীবনে বাবার ভূমিকার কথা জানা নেই শিলিগুড়ির মানবেন্দ্র ঘোষের। তবে নিজের অজান্তেই পিটার গ্রাফের সঙ্গে মিলে যায় তাঁর পথ। নিজে তারকা ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন। জেলা স্তরেও খেলেছেন। তবে বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন সফল হয়নি। অধরা স্বপ্ন মেয়ে রিচা ঘোষের মধ্যে পূরণ করতে চেয়েছিলেন। তা যে সফল হয়েছে সে কথা এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দলের রিচার সদর্প উপস্থিতির মাধ্যমে প্রমাণিত।

ক্রিকেটের অ-আ-ক-খ কীভাবে শেখালেন রিচাকে ? প্রশ্নটা শুনেই তিনি বলেন, "শুরুর দিনের কথা বলতে গেলে ইতিহাস লম্বা হয়ে যাবে। শুধু আমি নয় অনেকে মিলে রিচাকে তৈরি করেছেন। তাঁদের সকলের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ।"

হার না মানা বাবা-মেয়ের কাহিনি তুলে ধরল ইটিভি ভারত ৷ (ইটিভি ভারত)

সৌরভ বা ঝুলন যা করতে পারেননি তা করে দেখালেন রিচা। বাঙালি হিসেবে প্রথমবার ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জিতলেন। গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় দলের উইকেট রক্ষা করছেন। ব্যাট হাতে রান করছেন। মঞ্চ যত বড় হয় রিচা তত কার্যকরী হয়ে ওঠেন। বিশ্বকাপের মঞ্চেও স্বমহিমায় ধরা দিলেন বঙ্গতনয়া। উপহার দিলেন একের পর এক বিধ্বংসী ইনিংস।

সারা দেশের মত তিনিও রাত জেগেছেন। তবে রাত জাগার ক্লান্তি তাঁর নেই। মধ্যরাতে বিশ্বজয়ের পর সকাল পর্যন্ত দু'চোখের পাতা এক করতে পারেননি। আনন্দে ভেসে যাচ্ছে গোটা দেশ। গর্বিত বাবা জানালেন, এখনও নাকি রিচার সঙ্গেই কথা বলা হয়নি তাঁর। তাঁর কথায়, 'আসলে এটার থেকে বড় সাফল্য আর কিছু হয় না।' এইকই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, 'এই জয়ের যে আনন্দ তা ভাষায় বোঝানোর মতো ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু বাকি সবার মতো আনন্দে ভাসছি। ”

ভারতের জয়ে রিচার অবদান বিরাট। ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে 24 বলে 34 রান। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মাত্র 16 বলে 26 রানের ঝকঝকে ইনিংস। ছোট-মারকুটে ইনিংস দলের গোটা ইনিংসের অভিমুখ বদলে দিয়েছে ৷ একবার নয় টুর্নামেন্টে বারবার ঘটেছে একই ঘটনা। আর উইকেটের পেছনে রেখেছেন ভরসার হাত। রিচার দস্তানা বিশ্বস্ততার সমার্থক। আর সে কারণেই তৃপ্ত তাঁর বাবা।

Womens World Cup
বিশ্বজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হরমনপ্রীতরা (ছবি: বিসিসিআই)

"আমার মেয়ে অবশ্যই । তবে এখন দেশের মেয়ে । দেশের হয়ে সাফল্য যে কোনও কিছুর চেয়ে অনেক বড় ৷ তার তুলনা হয় না। তাই এই সাফল্য আনন্দের ভাগীদার সবাই ৷ " আবেগরুদ্ধ হয়ে পড়লেন রিচার বাবা।

অনেকেই জানেন না রিচা শুরুতে পেস বোলিং করতেন । ইনিংসের গোড়াপত্তনও করতেন । কলকাতায় খেলতে আসার পর রিচাকে মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করান শিবশঙ্কর পাল। উইকেটরক্ষার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন প্রাক্তন ক্রিকেটার মিঠু মুখোপাধ্যায়। বাবার হাতে ক্রিকেট শিক্ষা শুরু হলেও কলকাতায় পরিশালিত করার কাজটি হয়েছে মিঠুর হাতেই।

মানবেন্দ্র বলছিলেন, "আমি আগেই বলছি কোনও একটি মানুষ রিচাকে তৈরি করেননি। অনেকের অবদান রয়েছে। ওর মধ্যে আমাকে ছাপিয়ে যাওয়ার একটা মানসিকতা ছিল। যা ছোটবেলায় প্রতিটি শিশুর মধ্য়েই কমবেশি থাকে। আমি হয়তো জোরে বলে শট মেরেছি। রিচা তার থেকেও জোরে শট মারার চেষ্টা করত। আমি একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে বল ছুঁড়েছি দেখে রিচা তার থেকেও দূরে বল ছোঁড়ার চেষ্টা করত। এভাবেই ওর মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে উঠেছে। সিএবি আমাদের সাহায্য করেছে। মিঠুদি থেকে শুরু করে ঝুলন সকলে সাহায্য করেছে ৷"

কী করে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছিল রিচাকে?

বাংলায় মেয়েদের ক্রিকেটকে সঠিক পরিকাঠামোর মধ্যে দিয়ে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর পেছনে উল্লেখযোগ্য অবদান অভিষেক ডালমিয়ার পাশাপাশি স্নেহাশিস ও সৌরভের। আরও একজন বাংলাজুড়ে প্রতিভাবানদের তুলে নিয়ে আসার ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন-তিনি বিশ্বরূপ দে। সিএবির প্রাক্তন যুগ্মসচিব মিঠু মুখোপাধ্যায়কে জেলায় ঘুরে ঘুরে প্রতিভাবান মহিলা ক্রিকেটার তুলে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেন বর্তমানে শাসক শিবিরের কাউন্সিলার বিশ্বরূপ। সঙ্গে জুড়ে দেন ঝুলনকেও। এভাবেই উত্তরবঙ্গ থেকে কল্যাণীতে আয়োজিত বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরে ছোট্ট রিচার যোগদান।

Womens World Cup
ট্রফি হাতে প্রশিক্ষক (ছবি: বিসিসিআই)

সে সমস্ত দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মিঠু বলেন, “রিচা তখন খুব ছোট। বাড়ি থেকে এত দূরে কোনও দিন থাকেনি। কেঁদে ফেলত মা-বাবাকে দেখতে না পেয়ে। সেই সময় কুড়কুড়ে চিপস খেতে ভালোবাসত। আর ভালোবাসত অনুশীলনে প্রচণ্ড খাটতে। শুরুতে পেস বোলিং করত। আবার উইকেটরক্ষার আগ্রহও ছিল । তখন উইকেটরক্ষায় ওকে উৎসাহিত করা হয়। একটা কথা বলতে পারি, প্রতিভা থাকলেই হয় না। যত্ন করতে হয়। রিচা সেটা করেছে। আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের গর্বিত সদস্য আমাদের রিচা। ভাবুন তো কী ভীষণ আত্মত্যাগ করেছে! ওই বয়সের ছোট্ট মেয়ে প্রিয় খাবার গুলো ছেড়ে দিয়েছে। মা-বাবার থেকে দূরে থেকেছে। গ্রুমিংয়ের শুরুটা আমার অধীনে হয়েছিল। বাকিটা নিজেই নিজেকে তৈরি করেছে রিচা ৷"

আজ থেকে 52 বছর আগে 1973 সালে মিঠুদের হাত ধরে বাংলায় মেয়েদের ক্রিকেট শুরু হয়েছিল। সেসময় আজকের মত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা কল্পনাও করা যেত না। এমনকী প্র্যাকটিসের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে বলও পাওয়া যেত না। ছিল না টাকার যোগানও। এখন পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে ৷ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলে সাপোর্ট স্টাফ সংখ্যা চমকে দেওয়ার মতো। নিরলসভাবে মেয়েদের ক্রিকেটকে তুলে নিয়ে আসার কাজ করে চলার ফল আজকের এই বিশ্ব জয়। মিঠু আরও বলেন, "ঝুলনরা ওই পরিকাঠার ফসল। ঝুলনরাও কম পরিশ্রম করেননি। অনেক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। অভাবের মধ্যে দিয়েও যেতে হয়েছে। তাই হরমনজ্যোতরা যখন ঝুলনদের কৃতিত্ব দেয়, আগের ক্রিকেটারদের কৃতিত্ব দেয় তখন তৃপ্তি বোধ হয় ৷"

রিচাকে তুলে নিয়ে আসার জন্য বাবা মানবেন্দ্র ঘোষের অবদানের কথা উঠে এল মিঠুর মুখে। তিনি বলেন, "খেলাই তাঁর কাছে সবকিছু। মেয়েকে তৈরি করার কাজে সবসময় ব্যস্ত থেকেছেন । বলা ভালো পড়ে থেকেছেন । যখন যেখানে রিচা খেলতে গিয়েছে সেখানেই পাশে থেকেছেন বাবা মানবেন্দ্র। একটা স্বপ্ন সফল করার যৌথ প্রচেষ্টায় মেয়ে এবং বাবা। ওঁর আত্মত্যাগ ভোলা যাবে না।" মেয়ের সাফল্যের আড়ালে নিজের অবদানের কথা মনে করিয়ে দিতে রিচার বাবার উত্তর, "আমি বাবার কর্তব্য করেছি মাত্র।"

রিচাকে শিলিগুড়িতে একটি টুর্নামেন্টে বল করেছিলেন প্রাক্তন মহিলা ক্রিকেটার এবং বর্তমানে আম্পায়ার বিউটি চক্রবর্তী। সেই ম্যাচের কথা বলতে গিয়ে বিউটি বলেন, "আমি লেগস্পিন করতাম। তখন সবে খেলতে এসেছে রিচা। কিন্তু ভয়ডরহীনভাবে বড় বড় ছক্কা মেরেছিল। তখনই বুঝেছিলাম ওর মধ্যে মশলা রয়েছে। সারা রাত এই বিশ্বজয়ের আনন্দ করেছি। ওরা মাঠে জিতেছে । মনে হচ্ছে আমরাও জিতেছি। কৃতিত্ব ঝুলনদির মত প্রাক্তনীদেরও। ওরা প্রাক্তনদের কৃতিত্ব দিল দেখে খুব ভালো লাগছে। ঝুলনদির মতো মানুষও আবেগ তাড়িত হয়ে পড়লেন। আমাদেরও চোখে জল এসেছে। রিচার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। ”

Womens World Cup
ঝুলনের সঙ্গে জয়ের আনন্দ ভাগ করে নিলেন হরমনপ্রীতছবি: বিসিসিআই (ছবি: বিসিসিআই)

খেলার আগে রিচার সঙ্গে কথা বললেও কাপ জয়ের পরে কথা হয়নি মানবেন্দ্র ঘোষের। শিলিগুড়ি আনন্দ করেছে শুনে তিনি আপ্লুত। এই আনন্দ ওরা করছে রিচার সাফল্যে। ফিরলে অবশ্যই আরও বেশি করে উৎসব হবে। ইতিমধ্যে রিচা বিগ ব্যাশে খেলে এসেছেন। কোনও কি এমন জায়গা রয়েছে যেখানে এখনও উন্নতির প্রয়োজন। মানবেন্দ্র বলছেন, "ও সেজেগুজে বসে রয়েছে। পরিণত হয়ে গিয়েছে । যে কোনও ক্রিকেটের জন্য তৈরি।"

সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেটার মানেই আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলা এক সংযমে পরিপূর্ণ জীবন। তবে এবার সংঘমের বাঁধ খানিকটা হলেও ভাঙবে ৷ মেয়ে ঘরে ফিরলে মা ফ্রাইড রাইস রাঁধবেন। “আসলে কি নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়। সেটা দরকারও। তবে অন্তত দু'দিন অনিয়ম করাব। আর যা চাইবে তাই দেব। ঠিক ছোটবেলার মতো। সব আবদার মেটানোর চেষ্টা করব ৷" আবেগ তাড়িত শোনায় বিশ্বজয়ীর গর্বিত বাবার গলা। আগামীর পথ চলা নিয়ে কী বলবেন? মিঠু বলছেন, রিচা এখনও মাটির কাছাকাছি। সিনিয়রদের সম্মান দিতে ভালোবাসে। মানবেন্দ্র বলছেন, "রিচাকে বলব পা মাটিতে রেখে চলতে। আনন্দের উৎসবের মধ্যেও আগামীর পথ ঠিক করে ফেলেছেন শিলিগুড়ির রিচা এবং মানবেন্দ্র ঘোষ।