ETV Bharat / sports

'স্কুলশিক্ষায় বাধ্যতামূলক হোক 64 খোপের খেলা', ইটিভি ভারতে অকপট দিব্যেন্দু বড়ুয়া

দাবার বোর্ডেই তৈরি হয় আত্মবিশ্বাসের ভিত ৷ তাই স্কুলশিক্ষায় দাবা বাধ্যতামূলক করার ডাক দিব্যেন্দু বড়ুয়ার ৷ কথা বললেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পুলক যশের সঙ্গে ৷

DIBYENDU BARUA EXCLUSIVE
বর্ধমানে অনুষ্ঠিত দাবা চ্য়াম্পিয়নশিপে খুদেদের মাঝে দিব্যেন্দু বড়ুয়া (ETV Bharat)
author img

By ETV Bharat Sports Team

Published : August 29, 2026 at 5:02 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

বর্ধমান, 29 আগস্ট: নেহাতই শখের বশে বাড়িতে বাবার দাবা চর্চা দেখেই রপ্ত করে ফেলেছিলেন দাবার চাল ৷ বাবাও বুঝে গিয়েছিলেন 64 খোপের খেলায় ছেলের আগ্রহ রয়েছে পুরোদমে ৷ কিন্তু দাবায় ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বাবা ৷ তারপর আসে সেই ঐতিহাসিক 1972-এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ ৷ যেখানে বরিস স্প্যাস্কি'কে হারিয়ে বিশ্ব দাবায় রাশিয়ার (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) আধিপত্য থামিয়েছিলেন ববি ফিশার ৷ কলকাতার সংবাদমাধ্যমে সেই ম্য়াচের খবর দেখে ছেলে দিব্যেন্দু বড়ুয়া'কে দাবা চর্চায় নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়ে গিয়েছিলেন বাবা বিনয় বড়ুয়া ৷ জাতীয় ক্রীড়া দিবসে ইটিভি ভারত'কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কেরিয়ারের এমনই নানা বিষয় তুলে ধরলেন বাংলার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া ৷

একটি শিশু যখন প্রথম দাবার বোর্ডে বসে, তখন সে শুধুই সাদা-কালো ঘুঁটির চাল শেখে না ৷ একইসঙ্গে শেখে ধৈর্য্য, আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনা এবং গড়ে তোলে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার অভ্যাস ৷ জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শিশুর মনে তৈরি হয় আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভয় কাটিয়ে ওঠার সাহস এবং যুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা ৷ তাই আজ যখন শিশুদের মানসিক বিকাশ, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা অল্পেই ভেঙে পড়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে; তখন দাবা হতে পারে এক কার্যকর শিক্ষা ৷ আর সেই কারণেই বাংলার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া বলছেন, "প্রতিটি স্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকেই নিয়মিত দাবা শেখানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত ৷"

দিব্যেন্দু বড়ুয়া'র একান্ত সাক্ষাৎকার (ETV Bharat)

মাত্র সাড়ে পাঁচ-ছ'বছর বয়সে বাবার পাশে বসে দাবা শেখা দিব্যেন্দু বড়ুয়ার প্রথম প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের স্মৃতি এখনও টাটকা ৷ মাত্র ছ'বছর বয়সে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি টুর্নামেন্টে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন ৷ তখন সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, 'তাস, দাবা, পাশা- তিন সর্বনাশা ৷' অর্থাৎ, সকলে মনে করতেন দাবা শিশুদের জন্য নয় ৷ কিন্তু সেই সামাজিক ট্যাবু ভেঙে ছেলেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন তাঁর বাবা ৷

গ্র‍্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া জানান, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন বাবা ৷ প্রথম কয়েক বছর উল্লেখযোগ্য সাফল্য না-এলেও তিনি কখনও হতাশ হতে দেননি ৷ বরং কলকাতা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে টুর্নামেন্টে নিয়ে গিয়েছেন তাঁকে ৷ আজকের মতো তখনকার দিনে আধুনিক কোচিং, প্রযুক্তি কংবা স্পনসর না-থাকলেও উৎসাহ ছিল অগাধ ৷ দিব্যেন্দু বড়ুয়ার কথায়, "যদি বাবা অন্যদের কথা শুনে আমাকে দাবা খেলতে নিষেধ করতেন, তাহলে আজ আমি এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না ৷"

বর্তমান প্রজন্মের ভারতীয় দাবাড়ুদের উত্থান নিয়ে দিব্যেন্দু বড়ুয়া অত্যন্ত আশাবাদী ৷ তাঁর কথায়, "বিশ্বনাথন আনন্দ ভারতীয় দাবার প্রকৃত আইকন ৷ আনন্দের সাফল্যের পরই দেশে দাবার জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়েছে ৷ আজ ডি গুকেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, দিব্যা দেশমুখ বিশ্বকাপ জিতেছেন, আর প্রজ্ঞানন্দ, অর্জুন এরিগাইসির মতো তরুণরা বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন ৷ ভারত এখন দাবায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ৷" খুব শীঘ্রই দেশ শততম গ্র্যান্ডমাস্টারের মাইলফলক স্পর্শ করবে বলেও তাঁর বিশ্বাস ৷

1988 সালে বিশ্বনাথন আনন্দের তিন বছর পর অর্থাৎ, 1991 সালে বাংলার দাবার নতুন ইতিহাস লেখেন দিব্যেন্দু বড়ুয়া ৷ বাংলার প্রথম এবং ভারতের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টারের স্বীকৃতি পান তিনি ৷ কিন্তু গত তিন দশকে ভারতীয় দাবার মানচিত্র আমূল বদলে গিয়েছে, জানালেন দিব্যেন্দু ৷ বর্তমানে দেশে গ্র্যান্ডমাস্টারের সংখ্যা 99-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ, আর মাত্র একজন গ্র্যান্ডমাস্টার তৈরি হলেই ভারত স্পর্শ করবে শততম গ্র্যান্ডমাস্টারের ঐতিহাসিক মাইলফলক ৷ দিব্যেন্দু বড়ুয়ার মতে, এই সাফল্যই প্রমাণ করে বিশ্ব দাবায় ভারতের শক্তি ৷

DIBYENDU BARUA
বর্ধমানে দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের সূচনার গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া (ETV Bharat)

তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও এসেছে ৷ এখন ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক দাবা ইঞ্জিনের সাহায্যে খুব দ্রুত শেখা সম্ভব ৷ এতে খেলোয়াড়দের উন্নতি যেমন হচ্ছে, তেমনই স্বাধীনভাবে নতুন চাল বা কৌশল ভাবার প্রবণতা কিছুটা কমে যাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি ৷ তাই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েও নিজের চিন্তার স্বাধীনতাও বজায় রাখতে হবে, এমনই বার্তা দিলেন তিনি ৷ ইটিভি ভারত'কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কেরিয়ারের একটি আক্ষেপের কথাও অকপটে জানিয়েছেন দিব্যেন্দু বড়ুয়া ৷ 1988 সালে গ্রিসে অনুষ্ঠিত দাবা অলিম্পিয়াডে প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম পাওয়ার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েও শেষ রাউন্ডে একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল বাংলার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টারের ৷ সেই স্মৃতি আজও তাঁকে কষ্ট দেয় বলে জানালেন অল ইন্ডিয়া চেজ ফেডারেশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ৷

নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, "দাবাকে ভালোবেসে খেলতে হবে, হারকে ভয় পেলে চলবে না ৷" তাঁর সংযোজন, "জয় সবসময় ভালো খেলার প্রমাণ নয়। বরং পরাজয় একজন খেলোয়াড়কে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ করে দেয় ৷" বর্তমানে দাবা প্রশাসকের ভূমিকায় যুক্ত থাকলেও দিব্যেন্দু বড়ুয়া নিজেকে প্রথমে একজন দাবাড়ু হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। কারণ তাঁর কথায়, "মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান আমি সবকিছু পেয়েছি খেলার জন্যই ৷"

গবেষণায় প্রমাণিত যে নিয়মিত দাবা খেললে শিশুদের স্মৃতিশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়ে ৷ তাই শুধু বেসরকারি স্কুলগুলিই নয়, পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলিতেও প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রশিক্ষকের মাধ্যমে দাবা শেখানোর ব্যবস্থা হওয়া উচিত বলে মনে করেন দিব্যেন্দু বড়ুয়া ৷ এ বিষয়ে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ'য়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি ৷ একইভাবে কলেজ পর্যায়েও এই খেলার প্রসার প্রয়োজন বলে মত দিব্যেন্দু বড়ুয়া ৷ তিনি আরও বলেন, "শিশু থেকে প্রবীণ, সব বয়সের মানুষের জন্য দাবার উপকারিতা রয়েছে ৷ একদিকে যেমন এটি মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে ৷ অন্যদিকে মানুষকে ধৈর্য্য, আত্মবিশ্বাস এবং হারকে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি দেয় ৷"

আরও পড়ুন: