ঋদ্ধি অনুপ্রেরণা, যুব দলে সাড়া জাগিয়ে সিনিয়র টিমের অলিন্দে প্রবেশের লক্ষ্যে অভিপ্রায়
জাতীয় যুব দলের ক্য়াম্পে যোগ দেওয়ার আগে শনিবার দুর্গাপুরের বাড়িতে ফিরেছেন অভিপ্রায় ৷ তাঁর সঙ্গে কথা বললেন ইটিভি ভারতের সৌমেন বন্দ্যোপাধ্যায় ৷

Published : August 31, 2026 at 5:36 PM IST
দুর্গাপুর, 31 অগস্ট: অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একদিনের এবং মাল্টি-ডে সিরিজের জন্য ভারতের অনূর্ধ্ব-19 দল ঘোষিত হয়েছে সম্প্রতি ৷ সেখানে ওডিআই সিরিজের স্কোয়াডে একইসঙ্গে রাহুল দ্রাবিড়-পুত্র অন্বয় এবং বীরেন্দ্র সেহওয়াগ-পুত্র আর্যবীরের সুযোগ পাওয়া নিয়ে চর্চা বিস্তর ৷ দ্রাবিড়-পুত্র ভারতীয় দলের সেট-আপে থাকলেও আর্যবীরের এটাই মেডেন কল-আপ ৷ দুই তারকা-পুত্রের অনূর্ধ্ব-19 দলে সুযোগ পাওয়া নিয়ে চর্চার মধ্যে অনেকটাই ম্লান বাংলার অভিপ্রায় বিশ্বাসের খবর ৷ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে আসন্ন মাল্টি-ডে সিরিজের জন্য জাতীয় যুব দলে ডাক পেলেন দুর্গাপুরের অভিপ্রায় ৷
বাংলার শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর থেকে জাতীয় দলের আঙিনায় যাতায়াতের শুরু ৷ হোক না অনূর্ধ্ব-19 দল, ক্ষতি কি ? ছোটবেলা থেকে ছেলের ক্রিকেট নামক অধ্যাবসায়ের পিছনে যে সময় তিনি ব্যয় করেছেন, তার ফলাফল মেলায় গর্বিত মা অলোকা বিশ্বাস ৷ ছেলেকে পরবর্তীতে জাতীয় সিনিয়র দলে দেখার অভিপ্রায় তাঁর ৷ কিন্তু জার্নিটা সহজ ছিল না ৷ প্ল্যাটফর্মে ছেলেকে নিয়ে রাতের পর রাত অন্ধকারে কাটানো ৷ রাত জেগে ভোরের ট্রেন ধরে কলকাতা ময়দানে ম্যাচে অংশ নেওয়ার জন্য ছেলেকে পৌঁছে দেওয়া ৷ লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন মা ৷
মায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই ক্রিকেট ব্যাটকে হাতিয়ার করে এগিয়ে গিয়েছেন অভিপ্রায় ৷ অসম্ভব পরিশ্রম, পরিবারের সকলের কমবেশি আত্মত্যাগ, কোচবিহার ট্রফি, বিপিএল, জাতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য আজ অভিপ্রায়কে সুযোগ করে দিয়েছে জাতীয় যুব দলে ৷ আর জাতীয় যুব দলে প্রথম সুযোগ পাওয়ার পর মাত্র কয়েকঘণ্টার জন্য রবিবার দুর্গাপুরে নিজের বাড়িতে এসেছেন অভিপ্রায় ৷ আর স্টাম্পার-ব্য়াটার বাড়ি ফিরতেই দুর্গাপুরের কোকওভেন থানা এলাকার শ্যামপুর লাগোয়া সুকান্ত পল্লীর বাড়িতে আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশীদের লম্বা লাইন ৷
ছোটবেলায় দাদুর হাত ধরে স্থানীয় শ্রমিক নগর ময়দানের ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে থেকে অভিপ্রায়ের ক্রিকেটের হাতেখড়ি ৷ সেখান থেকে ভারতের অনূর্ধ্ব-19 দলের এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটারের স্বপ্ন ভারতীয় দলের হয়ে উইকেট রক্ষা করা এবং 22 গজে ব্যাট হাতে শাসন করা ৷ আর এই স্বপ্ন নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে রাজকোট ও আমেদাবাদে নামার অপেক্ষায় দুর্গাপুরের ছেলে ৷ এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান অভিপ্রায় বিশ্বাস ফের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীদের ৷ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, ঋদ্ধিমান সাহার পর আরও এক বাঙালি ক্রিকেটারের জাতীয় দলে সুযোগের স্বপ্ন ডালপালা মেলছে দামোদর নদ তীরবর্তী সুকান্ত পল্লী থেকে ৷ অভিপ্রায়ের বাবা পঙ্কজ কুমার বিশ্বাস পেশায় একজন চিকিৎসক এবং অলোকা বিশ্বাস গৃহবধূ ৷ দাদু অসিত কুমার বিশ্বাস বলেন, "আজ আমার দারুণ গর্বের দিন ৷ একদিন আমার নাতিকে যখন সবাই জিজ্ঞাসা করত ক্রিকেট খেলে কী হতে চাইছ ? আমার নাতি ছোটবেলা থেকেই বলত ভারতীয় দলের জার্সি পরে আমি ক্রিকেট খেলতে চাই ৷ অসম্ভব পরিশ্রম করেছে । আজ তার ফল সে পেয়েছে ৷ তবে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে ওকে ৷"
অভিপ্রায়ের মা অলোকা দেবী ইটিভি ভারত'কে বলেন, "আমি ছেলের সাফল্যের জন্য দিনরাত এক করেছিলাম ৷ ছেলের জন্য সমস্ত সময় আমি দিয়েছিলাম ৷ তাই ছেলের এই সাফল্যে আমি সত্যিই গর্বিত ৷ আমার আজ মনে পড়ছে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে প্রবল গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন সবাই এসি ঘরে ঢুকে যেত আমি তখন ছেলের জন্য গাছের নীচে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম ৷ মাত্র ছ'বছর বয়সে ওকে আমি দুর্গাপুরে ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে ভর্তি করি ৷ তার একবছর পরেই আমি ওকে কলকাতায় টোয়েন্টি-টু ইয়ার্ডস কোচিং ক্যাম্পে ভর্তি করি ৷ এরপর আমার ও আমার ছেলের লড়াই শুরু হয় ৷ কখনও রাতের ট্রেন ধরে, কখনও ভোররাতে, আবার কখনও প্ল্যাটফর্মে রাত কাটিয়ে আমরা দু'জনে যাতায়াত করেছি ৷ কত রাত জেগেছি দু'জনে ৷ কিন্তু ও যখন অনূর্ধ্ব-19 ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়ে আমায় ফোনে জানাল, আমার সব ধকল মুহূর্তের মধ্যেই যেন মুছে গেল ৷"
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট এবং বাংলার ঋদ্ধিমান সাহা'কে আইডল মেনে এগিয়ে যাওয়া অভিপ্রায়ের ৷ মিডল-অর্ডারে ব্যাট করতে ভালোবাসেন বলেও জানালেন অভিপ্রায় ৷ বেঙ্গালুরুতে উইকেটরক্ষার বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে শনিবার গভীর রাতেই বাড়ি ফিরেছে অভিপ্রায় ৷ কারণ অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য ক্যাম্পে যোগদানের ডাক চলে আসতে পারে যে কোনও মুহূর্তে ৷ তার আগে ইটিভি ভারত'কে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তৎপর অভিপ্রায় বলেন, "শ্রমিক নগর ক্রিকেট অ্য়াকাডেমি থেকে শুরু করেছিলাম ক্রিকেটের যাত্রা ৷ সেখানে একবছর খেলার পর কলকাতায় ৷ টোয়েন্টি-টুইয়ার্ডসে এরপর আমার প্র্যাকটিস শুরু হয় ৷ ব্যাটিং ভালোলাগে বিরাট কোহলির ৷ তবে ধোনির থেকেও উইকেটরক্ষক হিসেবে আমার ঋদ্ধিমান সাহাকে বেশি ভালোলাগে ৷"
জাতীয় যুব দলে ডাক পাওয়ার খবর কার থেকে প্রথম পাওয়া ? অভিপ্রায়ের সংযোজন, "সৌরাশিস লাহিড়ি স্যর আমায় প্রথম জানায় আমি অনূর্ধ্ব-19 ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েছি ৷ তারপর আমি বাড়িতে এই খুশির খবর জানাই ৷ আমার দাদু, আমার বাবা, আমার মা, আমার দিদা সবাই মিলে আমাকে সহযোগিতা করেছে ৷ তারা সকলে আমার জীবনে প্রতিষ্ঠালাভের এক একজন পিলার ৷ এদের সকলের প্রচেষ্টাতেই আমি আজ সাফল্য পেয়েছি ৷" তবে খেলাধুলার জন্য পড়াশোনায় ঘাটতির কথাও স্বীকার করে নিলেন অনূর্ধ্ব-19 ক্রিকেটার ৷ একটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র অভিপ্রায় বিশ্বাস ৷ সামনে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ ৷ সুতরাং, মাইন্ড সেট জরুরি ৷ একইসঙ্গে নিবিড় মনোযোগ-সহ অনুশীলন প্রয়োজন ৷ তবে পাখির চোখ যে সিনিয়র ভারতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি, সেটা স্পষ্ট করলেন অভিপ্রায় ৷

