ETV Bharat / sports

পদকের আলোর নীচে আঁধার, পরিকাঠামোর অভাবে কলিঙ্গতে বেড়ে উঠছে বাংলার সাঁতারের আগামী

পরিকাঠামোগত অভাব তাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছে পড়শি রাজ্যে ৷ তবু 2036 অলিম্পিকে পদকের লক্ষ্য স্থির বারাসতের সানিথি'র ৷ শুনলেন সঞ্জয় অধিকারী ৷

BENGAL SWIMMER SANITHI MUKHERJEE
সাঁতারু সানিথি মুখোপাধ্যায় (ETV Bharat)
author img

By ETV Bharat Sports Team

Published : September 1, 2026 at 10:55 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

বারাসত, 1 সেপ্টেম্বর: সবে পা দিয়েছে চোদ্দয় ৷ কিন্তু এই বয়সেই নিজের লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছে বারাসতের সানিথি মুখোপাধ্যায় ৷ সানিথি'কে যারা চেনেন না, তাদের জানিয়ে রাখা ভালো সম্প্রতি সাব-জুনিয়র ন্যাশনাল অ্যাকুয়াটিক চ‌্যাম্পিয়নশিপে বাংলাকে গর্বিত করেছে বছর চোদ্দর কিশোরী ৷ বাংলার ঘরে যে ছ'টি সোনা এসেছে তার মধ্যে চারটিই বারাসতের ডাকবাংলো মোড়ের শিক্ষক পরিবারের সন্তানের ঝুলিতে ৷ চারটি সোনার পাশাপাশি একটি ব্রোঞ্জও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে ৷

সানিথি সোনা এনেছে 50 মিটার বাটারফ্লাই, 100 মিটার বাটারফ্লাই, 200 মিটার বাটারফ্লাই এবং 200 মিটার ফ্রি-স্টাইলে ৷ একটি ব্রোঞ্জ 200 মিটার ব্যক্তিগত মেডলিতে ৷ তবে বারাসতের কিশোরীর সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে ট্যুইস্ট ৷ বাংলার ভূমি কন্যা হলেও সানিথির সাঁতার-চর্চা ভুবনেশ্বরে ৷ সুইমিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া'র (SFI) অধীনে ৷ তাতে কী ? সোনাজয়ের পরেও সানিথি যেন এই বঙ্গেরই নেক্সট-ডোর গার্ল ৷ ইটিভি ভারত'কে ভাবলেশহীন সানিথি বলে, "সাফল্য নিয়ে বেশি ভাবতে চাই না ৷ আরও পদক জেতাই লক্ষ‌্য ৷"

সাঁতারু সানিথি মুখোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন (ETV Bharat)

সানিথির সাঁতার শেখার নেপথ্যেও রয়েছে একটি চমকপ্রদ কাহিনী ৷ বাবা-মায়ের আতঙ্ক মুক্তির কারণে সাঁতার শুরু বারাসত-কন্যার ৷ বাবা সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় সরকারি স্কুলের শিক্ষক ৷ স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে একসময় মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে ছিলেন তিনি ৷ তাঁর বাসস্থান ছিল ভাগীরথীর খুব কাছে ৷ সেখানকার বিভিন্ন ওয়াটার রাইডে ছোটবেলা থেকে মেয়ের আকর্ষণ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন মা-বাবা ৷ একইসঙ্গে নিজেদের সাঁতার না-জানার ভয়ও মেয়েকে ঘিরে উঁকি দিয়েছিল তাঁদের মনে ৷ দু'য়ের মিশেলে ছোট্ট সানিথি'কে সাঁতারে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেম মা-বাবা ৷ বারাসতে ফিরে সানিথি'কে ইন্দ্রনীল দাসের কোচিংয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয় ৷ সেখানে খুব অল্প সময়েই নজর কেড়েছিল সানিথি ৷ কিন্তু তারপরেও এখন বাংলা নয়, বরং কলিঙ্গরাজ্যে নিজেকে অনুশীলনে ডুবিয়ে রাখে বাংলার সাঁতারের ভবিষ্যৎ ৷

সানিথি বলছে, "বাংলার পরিকাঠামোর অভাবই ভুবনেশ্বরে চলে যেতে বাধ্য করেছে ৷ কারণ ভালো সাঁতারু হওয়ার জন্য সারাবছর অনুশীলন জরুরি ৷ ভুবনেশ্বরে আমি এবং মা থাকি ৷ সাঁতার অনুশীলনের পরে মায়ের কাছেই পড়াশোনা ৷ 2036 অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জন করতে চাই ৷ সেভাবেই লক্ষ্য সাজাচ্ছি ৷ সেখানে পোডিয়াম ফিনিশ করাই আমার বুলস-আই ৷ সাফল্যের আত্মতুষ্টি নিয়ে আমি বসে থাকি না ৷ নতুন লক্ষ্য চাঁদমারি করে এগিয়ে যেতে চাই ৷"

2022 সালে পেশাদার সাঁতারের জন‌্য প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল সানিথি'র। পরের বছরেই ওড়িশায় সাব-জুনিয়র বিভাগে তিনটি সোনা-সহ সেরা সাঁতারুর সম্মানপ্রাপ্তি ৷ তারপর থেকে সাফল্য এখন সানিথি'র পায়ে পায়ে হাঁটে ৷ শিক্ষক পরিবারে পড়াশোনার অগ্রাধিকার সবসময় ৷ বাবা সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় এবং মা সায়নী মুখোপাধ্যায় প্রথমে পড়াশোনার দিকেই মেয়েকে ঠেলতে চেয়েছিলেন ৷ কিন্তু সাঁতারে ধারাবাহিক সাফল্য তাঁদের ভাবনায় বদল ঘটিয়েছে ৷ বয়সভিত্তিক সাঁতারে নিয়মিত সাফল্যের পাশাপাশি বয়সভিত্তিক আর্ন্তজাতিক প্রতিযোগিতাতেও পদকের আলো সানিথির উপর ৷ এমনকী জাতীয় আসরে অলিম্পিয়ান সাঁতারুদের সঙ্গেও টক্কর দিয়ে সে নজর কেড়েছে ইতিমধ্যে ৷ ক্রিশ মার্টিনের পরামর্শে এবং এসএফআই সচিবের ব্যবস্থাপনায় ভুবনেশ্বরে সাঁতার শিক্ষার শুরু লিয়ঁ মার্শান্ডের অনুরাগীর ৷ সবমিলিয়ে সাঁতারের উন্নত পরিকাঠামো পাওয়ার লক্ষ্যেই সানিথি'র পড়শি রাজ্যে যাওয়া ৷

বাবা সঞ্জয় মুখোপাধ‌্যায় বলেন, "আমার বেতনের সিংহভাগটাই চলে যায় ওর পিছনে ৷ কোনও কোনও মাসে ধারও করতে হয় ৷ এক-একটি সাঁতারের পোশাকের দামই প্রায় 55-60 হাজার টাকা ৷ ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ ঋণ হয়ে গিয়েছে ৷ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি ৷" একই সুর মা সায়নীর গলায় ৷ বলছেন, "আমাদের আত্মত্যাগটা বড় কথা নয় ৷ মেয়ে লক্ষ্যপূরণে এগিয়ে যাক সেটাই চাই ৷" সাফল্যের আলোর মধ্যেও মুখোপাধ্যায় পরিবারের আক্ষেপ, "সানিথি যে সাফল্য পেয়েছে কিংবা বিদেশে নজর কেড়েছে তা হয়তো রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী জানেনও না ৷ পুষ্পস্তবক দেওয়া দূরে থাক, রাজ্য সাঁতার সংস্থা একটা ফোন পর্যন্ত করেনি ৷" বাংলা সাঁতারের ভবিষ্যত সানিথি'কে আগলে রাখতে একটু নজর ঘোরাক রাজ্য সরকার এবং রাজ্য সাঁতার সংস্থা ৷ পরোক্ষে অভিভাবকদের চাওয়া-পাওয়া এটুকুই ৷

আরও পড়ুন: