সিঙ্গুরের সভায় কি প্রধানমন্ত্রী মোদি বঙ্গের শিল্প-সম্ভাবনায় দিশা দেখাবেন, অপেক্ষায় কৃষকরা
আগামী 18 জানুয়ারি সিঙ্গুরে সরকারি কর্মসূচি ও জনসভা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷

Published : January 7, 2026 at 9:18 PM IST
সিঙ্গুর (হুগলি), 7 জানুয়ারি: বছর কুড়ি আগে, 2006 সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার ও শাসক দল সিপিআইএম স্লোগান তুলেছিল - ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’৷ সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার তৈরির পর শিল্পায়নে নজর দিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ হুগলির সিঙ্গুরে রতন টাটার সংস্থাকে গাড়ি তৈরির কারখানার জন্য জমি দিয়ে বাংলার শিল্প-সম্ভাবনায় নতুন আশা তৈরি করেছিলেন সেই সময়ের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী৷
কিন্তু সেই শিল্প-সম্ভাবনা কুড়ি বছর পর সম্ভাবনাতেই আটকে৷ সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো গাড়ি তৈরি করার কথা ছিল৷ কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি৷ 2008 সাল নাগাদ রতন টাটা এখান থেকে প্রকল্প সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করেন৷ এর জন্য সিপিআইএম বরাবর দায়ী করে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী তথা বর্তমানে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ মমতার জমি-আন্দোলনের জন্যই রাজ্যে শিল্প-সম্ভাবনার অপমৃত্যু হয় বলেই গত দু’দশকে বহুবার অভিযোগ করেছেন মহম্মদ সেলিম-বিমান বসুরা৷ বিজেপির নেতাদের মুখেও একই সুর শোনা যায়৷ তাঁরা বরং একধাপ এগিয়ে বলেন যে বাংলায় বিজেপির সরকার তৈরি হলে আবার শিল্প-বিনিয়োগ ফিরবে৷
বিজেপির এই দাবি এবং সিঙ্গুরে টাটার কারখানা করতে না-পারার বিষয়টি ছাব্বিশের শুরুতে আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে৷ এর কারণ আগামী 18 জানুয়ারি সিঙ্গুরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ সেখানেই তাঁর একটি জনসভা করার কথা৷ ওই সভায় যে সিঙ্গুরে টাটার কারখানা তৈরির প্রসঙ্গ উঠবে, তা বলাই বাহুল্য৷ কারণ, সিঙ্গুর ছেড়ে রতন টাটা সেই সময় গিয়েছিলেন সানন্দে৷ সেখানেই তৈরি হয় ন্যানো গাড়ি তৈরির কারখানা৷ সানন্দ গুজরাতে৷ শোনা যায়, সিঙ্গুর ছাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হতেই গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই রতন টাটার সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ আর কারখানা সানন্দে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন৷
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেন, টাটাকে গুজরাতে নিয়ে যাওয়া যেমন মোদির রাজনৈতিক কেরিয়ারের একটি মাইল স্টোন, তেমনই সিঙ্গুর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত৷ 2004 ও 2006 সালের ভোটে সিপিআইএমের কাছে কার্যত নাস্তানাবুদ হয়েছিল তৃণমূল৷ সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে 2009 সালের লোকসভা নির্বাচনে ভালো ফল এবং 2011 সালের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে বাম-জমানার অবসান ঘটানোর পিছনে তৃণমূলের জমি-আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল৷ তাই সিঙ্গুরকে অনেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের মঞ্চ হিসেবে দেখে৷

সেই সিঙ্গুর থেকেই মমতার পতন শুরু হবে বলে দাবি বিজেপির৷ হুগলি সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি গৌতম চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মানুষের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। যেখান থেকে তৃণমূলের উত্থান হয়েছিল, সেখানেই তৃণমূলের পতন হবে। আগামিদিনে রাজ্যে বিজেপি আসবে৷ আর প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে মানুষের মধ্যে যথেষ্টই উন্মাদনা রয়েছে।’’
এর আগেও হুগলিতে সভা করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ এবার তাঁর সভা হতে চলেছে সিঙ্গুরের গোপালনগর ও সিংহেরভেড়ি মাঠে৷ ইতিমধ্যে বিজেপি নেতারা সভাস্থল পরিদর্শন করেছেন৷ এবার জনসভার পাশাপাশি সরকারি অনুষ্ঠানও রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর৷ সেখানে তিনি কী বলেন, সেদিকে যেমন তাকিয়ে বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা, তেমনই তাকিয়ে সিঙ্গুরের বাসিন্দারা৷

কারণ, সিঙ্গুর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ এখন হতাশ। অনিছুচ্ছুক কৃষকদের মাসে 16 কিলো চাল ও 2 হাজার টাকায় খুশি থাকতে হচ্ছে এখন। কেউ বলছেন জমির জন্য আন্দোলন করেও চাষযোগ্য জমি ফেরত পাননি। কেউ বলছেন আন্দোলন করতে গিয়ে শিল্প এল না রাজ্যে। সিঙ্গুরের ইচ্ছুক চাষি কৃষ্ণ সাহানা বলেন, ‘‘আমরা চাইছি এখানে কারখানা হোক। প্রধানমন্ত্রী এলে কিছু একটা করবেন। আমাদের চাওয়া একটাই দেশ ও দশের কল্যাণের জন্য তিনি কিছু করুন।’’
গোপালনগরের বাসিন্দা সমর বেরা বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী আসছেন৷ তাঁর কাছে আমাদের একটাই প্রত্যাশা যেন কর্মসংস্থান বা শিল্প আনতে পারেন। আমরা ভেবেছিলাম সিঙ্গুরে শিল্প হলে ভালো হবে। চায়ের দোকান করেও আমাদের পেট চালাতে পারতাম। আমরা চাই শিল্প হোক।’’ স্থানীয় বাসিন্দা সমরেশ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমরাও শিল্প চাই। কিন্তু মোদি এলে বা বিজেপি রাজ্য ক্ষমতায়া এলে যে শিল্প হবে, এমনটা নয়। বিজেপির সংগঠন কোথায়। প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় যেতে পারে৷ কিন্তু ভোট দেবে মমতাকে।’’ টাটা প্রোজেক্টের জায়গায় পাঁচ কাঠা জমি আছে অনিচ্ছুক কৃষক অভিজিৎ মালিকের। তিনি বলেন, ‘‘জমি থাকলেও সেই জমিতে এখন চাষ হচ্ছে না। মোদি আসছে, আমরাও চাইছি কিছু একটা করে দিক। কিন্তু আদৌ কি কিছু করবে?

আর তৃণমূল পুুরোটাই ভোটের গিমিক বলে মনে করছে৷ রাজ্যের মন্ত্রী তথা সিঙ্গুরের বিধায়ক বেচারাম মান্না বলেন, ‘‘2014 সাল থেকে শুনছি। একাধিক বিজেপি নেতা এর আগেও এসেছিলেন সিঙ্গুরে। ওদের পায়ের নিচে মাটি নেই৷ তাই উন্নয়ন দেখতে পাচ্ছে না। আর উন্নয়ন হয়েছে কি না, সিঙ্গুরের মানুষ বলবে।’’
সিঙ্গুর ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি আনন্দমোহন ঘোষ বলেন, ‘‘ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী, তিনি যেকোনও জায়গায় আসতে পারেন, যেকোনও জায়গায় সভা করতে পারেন। ভোটের সময়ই বিজেপি নেতাদের দেখা যায়। অনেক নেতাই আগেই বলেছেন সিঙ্গুরে কারখানা করব। বিজেপি নেতারা বলেছিলেন, গরিব মানুষের অ্যাকাউন্টে 15 লক্ষ করে টাকা দেবেন, বছরে দু’কোটি চাকরি দেবেন। সবকা সাথ সবকা বিকাশ৷ কোনোটাই হয়নি। এটা ভোটের আগে একটা গিমিক। আমরা কখনোই বলিনি শিল্প চাই না। জোর করে জমি অধিগ্রহণের জন্যই আমাদের আন্দোলন ছিল। অধিকাংশ জমিতে চাষ হচ্ছে। কিন্ত কিছু কৃষক ও ব্যবসায়ী চাষ না-করলে কী করা যাবে।’’

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সিঙ্গুরে জাতীয় সড়কের পাশে 997 একর জমি টাটা গোষ্ঠীকে লিজ দিয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার৷ কিন্তু চাষিদের থেকে জোর করে জমি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু হয়৷ কিছুদিনের মধ্য়েই সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়৷ পরে তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধির মধ্যস্থতায় রাজভবনে বৈঠক হয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে৷ এর পর 400 একর জমি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেয় সরকার৷ কিন্তু শেষপর্যন্ত 400 একরে কারখানা করতে কারখানা গড়তে চায়নি টাটারা৷ তারা এখান থেকে চলে যান৷
2011 সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার৷ এর পর আদালতে গড়ায় গোটা বিষয়টি৷ শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়৷ তার পর সিঙ্গুরে কিছু জমিতে চাষ হলেও বেশিরভাগ জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে রয়েছে। চাষযোগ্য জমি অনেকে ফেরত পাননি বলেও অভিযোগ রয়েছে৷ এই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ৷ আগামী 18 জানুয়ারি সিঙ্গুর থেকে শিল্প নিয়ে কোনও বিশেষ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী মোদি করেন কি না, সেটাই এখন দেখার৷

