ETV Bharat / politics

মালদায় এসে দলত্যাগী মৌসমকে নিয়ে কেন নীরব থাকলেন অভিষেক ?

মালদায় বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলের নয়া স্ট্র্যাটেজি - কংগ্রেসের পালে হাওয়া ? নাকি মৌসম নুরকে ধরতব্যের মধ্যে রাখছে না তৃণমূল !

ABHISHEK SILENCE ON MAUSAM
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : January 9, 2026 at 8:01 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 9 জানুয়ারি: মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিশানা করলেন মালদা উত্তরের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুকে ৷ রাজ্য রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটা খুবই স্বাভাবিক ৷ একই মঞ্চ থেকে তাঁর নিশানায় ছিলেন মালদা দক্ষিণের কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী ৷ ছাব্বিশের ভোটের মুখে তাঁর সেই অবস্থানও অস্বাভাবিক নয় ৷ এমনকি পাশের জেলা মুর্শিদাবাদের তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হুমায়ুন কবীরের উদ্দেশে তো কার্যত বিষোদগার করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷

নিজেদের ভোট ব্যাংক অক্ষুণ্ণ রাখতে সেটাও তাঁকে করতেই হতো ৷ কিন্তু, অদ্ভুতভাবে তৃণমূলের সেকেন্ড ইন-কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে একবারও শোনা গেল না, সদ্য দলত্যাগী মৌসম বেনজির নুরের নাম ৷ অথচ ঘাসফুলের নেতা-কর্মীদের অনেকেই ভেবেছিলেন, সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মৌসমকে তুলোধনা করে ছাড়বেন তাঁদের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ৷ বিশেষত, ভোটের মুখে মৌসমের দলত্যাগ যাতে মালদা জেলার ঘাসফুলের কর্মীদের মনোবলে কোনও চিড় না-ধরায়, তার জন্য তিনি কিছু বলবেন ৷ তেমন কিছু হয়নি ৷ তাতেই জেলা তৃণমূলের অনেকেই অবাক হচ্ছেন ৷ তবে, এনিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন জেলা নেতৃত্বের কেউই ৷

Abhishek Silence on Mausam
তৃণমূল থেকে কংগ্রেসে ফেরা প্রাক্তন সাংসদ মৌসম বেনজির নুর ৷ (ইটিভি ভারত)

রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, তবে কি মৌসমের দলবদলকে কোনও গুরুত্বই দিচ্ছে না তৃণমূল ? নাকি মালদার মতো জেলায় কংগ্রেসকে খানিকটা ছাড় দেওয়া হচ্ছে ? যদি সেটাই হয়, তবে কি বিজেপিকে রুখতে এটাও তৃণমূলের নয়া কৌশল ? চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বলছে, জেলার 12টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতেই পিছিয়ে রাজ্যের শাসকদল ৷ এমনকি সুজাপুর, মোথাবাড়ি, হরিশ্চন্দ্রপুর, মালতিপুরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাতেও এগিয়ে ছিল বিরোধীরা ৷ তাই ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে এই জেলা নিয়ে অনেকটাই ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন তৃণমূলের থিংক ট্যাংকের ৷

বৃহস্পতিবার জলঙ্গার সভায় অভিষেক দাবি করেছিলেন, রাজস্থানে কাজ করতে যাওয়া কালিয়াচকের আমিরকে তাঁরাই বাংলাদেশ থেকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছেন ৷ রাজস্থান পুলিশ বাংলাভাষী আমিরকে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে সে’দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল ৷ তাঁর এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন জেলা কংগ্রেসের সহ-সভাপতি মোত্তাকিন আলম ৷

তিনি বলছেন, "আমিরকে বাংলাদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সাংসদ ইশা খান চৌধুরী কতটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটা শুধু আমিরের পরিবারের সদস্যরাই নন, গোটা জেলার মানুষ জানে ৷ দিল্লিতে বিএসএফ-এর শীর্ষকর্তা থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ইশা খান চৌধুরী বাংলাদেশ থেকে আমিরকে দেশে ফিরিয়ে আনেন ৷ পরবর্তীতে চাঁচলের এক যুবককেও তিনি দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেন ৷ ভোটের মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সেই কৃতিত্ব নিতে চাইছেন ৷ তাতে কোনও লাভ হবে না ৷"

এদিকে দিল্লিতে পুরনো দলে প্রত্যাবর্তনের পর শনিবার মালদায় ফিরছেন মৌসম নুর ৷ তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা ৷ আসছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভারপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক গোলাম আহমেদ মীর-সহ আরও অনেকে ৷ তবে, প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী আগামিকাল জেলায় আসছেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি ৷ তাঁকেও আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে ৷

এই জায়গায় জেলা তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা চেয়েছিলেন, তাঁদের অধিনায়ক গতকালের সভায় মৌসম নিয়েও কিছু বলুন ৷ তবে, সভামঞ্চে মৌসমের নাম উচ্চারণ না-করলেও বুধবার রাতে দুই দিনাজপুর সফর সেরে মালদায় রাত্রিবাস করার সময় সেখানে উপস্থিত দলীয় নেতা-কর্মীদের ডায়মন্ডহারবারের সাংসদ বলে দিয়েছেন, মৌসম নিয়ে কারও কিছু ভাবার প্রয়োজন নেই ৷ মৌসমের দলত্যাগ আসন্ন ভোটে দলের কোনও ক্ষতি করবে না ৷ এনিয়ে তাঁদের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে ৷

রাজ্য রাজনীতির অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মৌসমের রাজনীতির ভরকেন্দ্র শুধুমাত্র সুজাপুর ৷ যে কেন্দ্র থেকে তাঁর মা, মামা, প্রত্যেকেই জিতে এসেছেন ৷ রাজ্য রাজনীতির অলিন্দ তাঁর কাছে গৌণ ৷ যদিও গত বিধানসভা নির্বাচনে ওই কেন্দ্রে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী আবদুল গনি ৷ হেরে গিয়েছিলেন কোতওয়ালির খান চৌধুরী ভবনের সদস্য ইশা খান চৌধুরী ৷

এবার সুজাপুর কেন্দ্র ছিনিয়ে আনা শুধু মৌসমের কাছে নয়, জেলা কংগ্রেসের কাছেও বড় চ্যালেঞ্জ ৷ জেলার রাজনৈতিক মহল বলছে, বাংলায় এই মুহূর্তে কংগ্রেসের শেষ সলতে মালদা জেলা ৷ গত লোকসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে, হারিয়ে যাওয়া ভোট অল্প হলেও ফিরে আসতে শুরু করেছে কংগ্রেসের খাতায় ৷ একসময় হাতের মূল ভোট ব্যাংক ছিল মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর ৷ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির প্রয়াণের পর উত্তর দিনাজপুরে এখন কংগ্রেস ছন্নছাড়া ৷ অধীর পরাজিত হওয়ার পর মুর্শিদাবাদেও প্রায় একই পরিস্থিতি ৷ এই তিন জেলায় কংগ্রেসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে মালদা জেলাকে কেন্দ্র করেই সেই কাজ শুরু করতে হবে ৷

জেলা তৃণমূলের সহ-সভাপতি শুভময় বসু বলছেন, "মৌসম নুরের দলে থাকা কিংবা না-থাকা তৃণমূলের কাছে কোনও ফ্যাক্টর নয় ৷ তিনি অনেকদিন থেকেই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন ৷ দলীয় কর্মসূচিতেও সেভাবে তাঁকে পাওয়া যায়নি ৷ তাই তাঁকে নিয়ে আমরা কিছু ভাবছি না ৷ আসন্ন নির্বাচনে আমাদের লক্ষ্য জেলার 12টি কেন্দ্রেই জয় পাওয়া ৷ সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এগোচ্ছি ৷ আমরা তৃণমূলের সৈনিক ৷ দল যেভাবে নির্দেশ দেবে, সেভাবেই আমরা চলব ৷"