খাড়গের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে 'ইন্ডিয়া'র বৈঠকে গরহাজির ! সংসদে কি একলা চলো নীতি তৃণমূলের
সংসদে শীতকালীন অধিবেশনে বিজেপি-বিরোধিতায় তৃণমূল কংগ্রেসের কী কৌশল হতে চলেছে তা নিয়ে জোর চর্চা রাজনৈতিক মহলে ৷

Published : November 30, 2025 at 3:30 PM IST
কলকাতা, 30 নভেম্বর: সোমবার থেকে শুরু হতে চলেছে সংসদের বহু প্রতীক্ষিত শীতকালীন অধিবেশন । তার আগে কৌশল ঠিক করতে বিরোধী ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠক ডাকা হয়েছে ৷ তবে সেই বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেস গরহাজির থাকবে বলেই খবর ৷ বিজেপি-বিরোধিতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কি আপাতত 'একলা চলো' নীতিতেই এগোবে ? এই নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে ৷
প্রতিবার সংসদীয় অধিবেশন শুরুর আগে বিরোধী দলগুলির মধ্যে কৌশল নির্ধারণের জন্য বৈঠক ডাকা একটি প্রথাগত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে । সেই রীতি মেনেই এবারও কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক দলগুলিকে নিয়ে একটি সমন্বয় বৈঠকের ডাক দিয়েছেন । জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছেও সেই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে ।
কিন্তু দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে জোর জল্পনা, কংগ্রেস সভাপতির ডাকা এই বৈঠকের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস । শুধু তাই নয়, ঘাসফুল শিবিরের দেখানো পথে হেঁটে সমাজবাদী পার্টি (সপা)-সহ আরও বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দল এই বৈঠক এড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর । অধিবেশন শুরুর ঠিক আগে বিরোধী শিবিরের এই অভ্যন্তরীণ ফাটল জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে ।
সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে সাধারণত বিরোধী দলগুলি এক ছাতার তলায় এসে শাসকদলের বিরুদ্ধে রণকৌশল ঠিক করে । কোন কোন ইস্যুতে সরকারকে কোণঠাসা করা হবে, তা ঠিক করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয় । কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন । তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব সূত্রে খবর, তারা ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের বিরোধী নন, কিন্তু জোটের বর্তমান পরিচালন পদ্ধতি এবং বিশেষ করে কংগ্রেসের ‘নেতৃত্ব সুলভ’ আচরণ নিয়ে তাদের তীব্র আপত্তি রয়েছে ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই সিদ্ধান্তের পিছনে মূল কারণ হল সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে কংগ্রেসের শোচনীয় ফলাফল । সদ্য সমাপ্ত বিহার বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ফলাফল কার্যত বিপর্যয় ডেকে এনেছে । তথাকথিত ‘হাত’ শিবিরের এই ভরাডুবির পর তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে শরিক দলগুলি ।
তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, একের পর এক রাজ্যে কংগ্রেস সাইনবোর্ডে পরিণত হচ্ছে, অথচ জোটে তাদের ‘দাদাগিরি’ বা কর্তৃত্ব ফলানোর মানসিকতার কোনও পরিবর্তন হয়নি । শতাব্দী প্রাচীন দলটি নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ঢাকতে না-পারলেও, শরিক দলগুলোর ওপর আসন সমঝোতা নিয়ে অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করে চলেছে । এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের নির্দেশে বা তাদের নেতৃত্বে সংসদীয় কৌশল ঠিক করতে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ।
তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের এক শীর্ষ নেতা এই নিয়ে বলেন, "এই নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । তবে বারংবার জাতীয় ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ব্যর্থতা মানুষের মধ্যে বিরোধী শক্তির নেতৃত্বে কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে । আর সেই জায়গা থেকেই পরবর্তী পদক্ষেপ ধীরে সুস্থে নিতে চাইছে দল ।"
তৃণমূলের বর্তমানে অবস্থান, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা আপোষহীন, কিন্তু সেই লড়াই কংগ্রেসের নেতৃত্বে লড়া হবে না। বিশেষত যখন কংগ্রেস নিজেই নির্বাচনী ময়দানে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ । তবে খাড়গের ডাকা বৈঠক এড়িয়ে গেলেও সংসদীয় শিষ্টাচার মেনে স্পিকার বা সরকারের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে তৃণমূলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গিয়েছে ।
কংগ্রেসের ছায়া থেকে বেরিয়ে সংসদে নিজস্ব ইস্যু এবং কৌশলে বিজেপি সরকারকে চেপে ধরতে চাইছে তৃণমূল । ইতিমধ্যেই দলের সাংসদদের নিয়ে রণকৌশল চূড়ান্ত করা হয়েছে । জানা গিয়েছে, এবারের শীতকালীন অধিবেশনে বাংলার প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনাকেই প্রধান হাতিয়ার করবে ঘাসফুল শিবির । বিশেষ করে 100 দিনের কাজের বকেয়া টাকা এবং আবাস যোজনার অর্থ আটকে রাখা নিয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়াবেন তৃণমূল সাংসদরা ।
পাশাপাশি, রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাও সংসদের ফ্লোরে জোরালোভাবে উত্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে । ভোট চুরির অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতিসক্রিয়তা নিয়েও সরব হবে তারা । অর্থাৎ, রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলেও, বিজেপি বিরোধিতায় যে তারা এক ইঞ্চিও জমি ছাড়বে না, তা স্পষ্ট । বরং কংগ্রেসের দুর্বল কাঁধে ভর না-দিয়ে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের দাবিদাওয়া এবং রাজ্যের ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে সংসদে স্বতন্ত্র এবং আগ্রাসী ভূমিকা নিতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস । বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়া নয়, বরং কংগ্রেসের খবরদারি উপেক্ষা করে নিজেদের শক্তিতে বিজেপিকে মোকাবিলা করাই এখন তৃণমূলের লক্ষ্য ।
এখন দেখার বিষয়, সোমবার অধিবেশন শুরু হলে বিরোধী বেঞ্চে এই বিভাজন শাসকদলকে বাড়তি সুবিধা দেয়, নাকি তৃণমূলের একক ঝাঁঝালো আক্রমণ সরকারকে বেশি বিপাকে ফেলে ।

