গেরুয়া গড়ে ভাঙন ধরিয়ে শালতোড়ার মাটি থেকেই বাঁকুড়াতে ‘12-0’ করার চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
শনিবার বাঁকুড়ার শালতোড়ায় ‘রণ সংকল্প সভা’ করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়৷

Published : January 10, 2026 at 6:08 PM IST
কলকাতা, 10 জানুয়ারি: জঙ্গলমহলের রুক্ষ মাটিতে গত কয়েক বছরে বারবার ফুটেছে পদ্মফুল। ঊনিশের লোকসভা থেকে একুশের বিধানসভা - বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার মতো জেলাগুলিতে তৃণমূলের দাপটের মাঝেও বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক ছিল রীতিমতো ঈর্ষণীয়। কিন্তু 2026-এর বিধানসভা নির্বাচনে সেই সমীকরণ বদলাতে চান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷
শনিবার বাঁকুড়ার শালতোড়ায় ‘রণ সংকল্প সভা’ থেকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের আবেদন, আর আধা-আধি নয়, এবার বাঁকুড়া ও বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলার 12টি বিধানসভাই চাই তৃণমূলের ঝুলিতে। বিজেপির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত শালতোড়ায় দাঁড়িয়ে গেরুয়া শিবিরেও ভাঙন ধরালেন তিনি৷ তাঁর উপস্থিতিতেই তৃণমূলে যোগ দিলেন দুই হেভিওয়েট স্থানীয় বিজেপি নেতা৷

বিজেপিতে ভাঙন ও তৃণমূলের ‘মিশন 12’
শনিবারের জনসভায় অভিষেকের উপস্থিতিতেই তৃণমূলে যোগ দেন শালতোড়া ব্লকের প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি কালীপদ রায় এবং বাঁকুড়া পুরসভার নির্দল কাউন্সিলর দিলীপ আগরওয়াল। রাজনৈতিক মহলের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে সাংগঠনিক স্তরে এই রদবদল বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের মনোবল ভাঙতে পারে। এই যোগদান পর্ব সেরে অভিষেক সরাসরি ভোটের পাটিগণিতে আসেন। বিগত নির্বাচনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন৷

তিনি বলেন, ‘‘2021-এ আপনারা বাঁকুড়ার 12টার মধ্যে চারটিতে আমাদের জিতিয়েছিলেন, আটটিতে বিজেপি জিতেছিল। 2024-এর লোকসভায় সেই ব্যবধান কমে 6-6 হয়েছে। এবার আমাদের লক্ষ্য 12-0।’’ বাঁকুড়ার মানুষ যাতে তৃণমূলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন, তার জন্য অভিষেক এদিন ‘অধিকার’ এবং ‘বঞ্চনা’র তত্ত্বকে হাতিয়ার করেন। তাঁর বার্তা, বিজেপি জিতলে তারা বাংলার মানুষের অধিকার কাড়বে, আর তৃণমূল জিতলে সেই অধিকার ঘরে পৌঁছে দেবে।
কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি: পাথর শিল্পে 25 হাজার চাকরির কথা
শালতোড়া ও মেজিয়া এলাকার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হল পাথর শিল্প ও ক্রাশার। কিন্তু আইনি জটিলতা ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিধিনিষেধের জেরে দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্প ধুঁকছে। এদিন সেই ক্ষততেই প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। সভামঞ্চ থেকে তিনি এক বড় ঘোষণা করেন, যা বাঁকুড়ার ভোটবাক্সে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে।

অভিষেক বলেন, ‘‘শালতোড়ায় সরকারি 133 হেক্টর জমি এবং 18টি মাইন রয়েছে। আইনি জট এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কাজ আটকে ছিল। আমি গত দু’মাস ধরে এর ওপর কাজ করেছি। কথা দিচ্ছি, আগামী 31 মার্চের মধ্যে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনে এই 18টি মাইন ও ক্রাশার চালু করা হবে।’’
তাঁর দাবি, এই পদক্ষেপের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এলাকার প্রায় 25 হাজার মানুষ নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি, বাঁকুড়ার দীর্ঘদিনের জলের সমস্যা মেটাতে তাৎক্ষণিক 150টি টিউবওয়েল বসানোর নির্দেশও দেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রুক্ষ জঙ্গলমহলে ‘জল’ এবং ‘কাজ’ - এই দু’টি প্রতিশ্রুতিই তৃণমূলের গেমচেঞ্জার হতে পারে।
বিজেপিকে ‘রিপোর্ট কার্ড’ নিয়ে খোলা চ্যালেঞ্জ
বক্তৃতার ছত্রে ছত্রে এদিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি সাংসদ ও বিধায়কদের তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার 15 বছর এবং নরেন্দ্র মোদির সরকার 12 বছর ক্ষমতায়। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, বাঁকুড়ার যেকোনও মাঠে বিজেপি নেতারা তাঁদের 12 বছরের রিপোর্ট কার্ড নিয়ে আসুন। আমি মমতার সরকারের খতিয়ান নিয়ে যাব। তর্কে ভোকাট্টা করে মাঠের বাইরে যদি পাঠাতে না পারি, তবে মানুষের সামনে মুখ দেখাব না।’’

অভিষেক অভিযোগ করেন, বাঁকুড়া জেলার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকার আটকে রেখেছে। আবাস যোজনা থেকে 100 দিনের কাজ - সব ক্ষেত্রেই বাংলার মানুষকে ‘ভাতে মারার’ চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে তিনি তোপ দাগেন।
সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সংঘাত
উন্নয়নের পাশাপাশি এদিন বাঙালি আবেগ ও সংস্কৃতিকেও হাতিয়ার করেন অভিষেক। সম্প্রতি রাজ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে বিজেপিকে ‘বাঙালি বিরোধী’ ও ‘সংস্কৃতি বিরোধী’ বলে দাগিয়ে দেন তিনি। খাবারের স্বাধীনতা থেকে পোশাক-আশাক - বিজেপি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ করেন অভিষেক।

তাঁর কথায়, ‘‘আমরা কী খাব, কী পরব - সবই কি দিল্লি ঠিক করে দেবে? চিকেন প্যাটিস খাওয়ার অপরাধে গরিব ছেলেকে মারা হচ্ছে! গীতাপাঠের আসরে হিংসা ছড়ানো হচ্ছে। যারা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙে, রবীন্দ্রনাথের নাম জানে না, তারা আবার বাংলার সংস্কৃতির পাঠ দেবে?’’ গীতাপাঠের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘‘গীতার 700 শ্লোকের একটাও এরা জানে না। জানলে বুঝত, শ্রীকৃষ্ণ সব জীবের মধ্যেই বিরাজমান। মানুষকে পিটিয়ে মারা কখনও হিন্দুধর্ম হতে পারে না।’’

