কাটমানির টাকা ফেরালেন তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য! 'দলের চাপে নিয়েছিলাম, নাম বললে খুন করবে'
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি কিছু পরিষেবা পেতে গেলে কিছু দিতে হতো, তৃণমূলের আমলে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল ৷

Published : June 2, 2026 at 4:50 PM IST
নামখানা, 2 জুন: দক্ষিণ 24 পরগনার নামখানায় সরকারি আবাস প্রকল্পে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল । প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে উপভোক্তাদের টাকা ফেরত দিলেন খোদ তৃণমূলের এক পঞ্চায়েত সদস্য । শুধু টাকা ফেরৎ দেওয়াই নয়, এই ঘটনায় নিজের দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিস্ফোরক মন্তব্যও করেন তিনি । আর সেই মন্তব্যকে ঘিরেই এলাকায় রাজনৈতিক তরজা তীব্র হয়েছে । ঘটনাটি ঘটেছে নামখানার শিবরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পাতিবুনিয়া এলাকায় । অভিযুক্ত তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য মাধবচন্দ্র লায়া শিবরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের 252 নম্বর বুথের সদস্য ।
অভিযোগ, সরকারি আবাস প্রকল্পের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে এলাকার বহু উপভোক্তার কাছ থেকে মাথাপিছু 5 হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল । দীর্ঘদিন ধরেই এই নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল । স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় 45 জন উপভোক্তার কাছ থেকে এই টাকা তোলা হয়েছিল । অভিযোগ, সরকারি ঘরের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়া হয় । অনেকেই অভিযোগ করলেও দীর্ঘদিন বিষয়টি চাপা ছিল । তবে সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা ভোটে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরই গ্রামে এই নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় ।
রবিবার পাতিবুনিয়ার একটি স্কুল মাঠে স্থানীয় গ্রামবাসী, বিজেপি নেতৃত্ব এবং এলাকার বহু মানুষের উপস্থিতিতে একটি সভার আয়োজন করা হয় । সেখানে উপস্থিত হন মাধবচন্দ্র লায়া । সভার মাঝেই তিনি প্রকাশ্যে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের হাতে একে একে টাকা ফেরত দেন । স্থানীয়দের দাবি, মোট 45 জন উপভোক্তার কাছ থেকে মাথাপিছু যে 5 হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল সেটি এদিনের সভায় ফেরৎ দেওয়া হয়েছে ।
এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমে যায় এলাকায় । প্রকাশ্যে এক জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এভাবে টাকা ফেরৎ দেওয়ার ঘটনা ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে । কেউ একে 'বদলের প্রভাব' বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন রাজনৈতিক 'চাপে'র ফলেই এই পদক্ষেপ ।

টাকা ফেরতের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে বিস্ফোরক দাবি করেন মাধবচন্দ্র লায়া । তিনি বলেন, "ঘরের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে আমি টাকা নিয়েছিলাম ঠিকই । কিন্তু দলের পক্ষ থেকে এই টাকা তোলার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল । আমি সেই টাকা পঞ্চায়েতের টেবিলে জমা দিয়েছিলাম । নিজের জন্য এক টাকাও নিইনি ।"
এরপর আরও বড় অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, এই কাটমানিকাণ্ডে স্থানীয় স্তরেই নয়, তৃণমূলের উচ্চপদস্থ নেতৃত্বও জড়িত । তাঁর কথায়,
"এই দুর্নীতির সঙ্গে শিবরামপুর পঞ্চায়েত ও তৃণমূলের উপরের নেতৃত্ব জড়িত । আমি যদি সব নাম প্রকাশ করি, তাহলে আমাকে এবং আমার বৃদ্ধ বাবাকে খুন করা হতে পারে ।"
মাধবচন্দ্রের এই মন্তব্য ঘিরে এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়েছে । তাঁর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । যদিও তাঁর এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনও প্রশাসনিকভাবে কিছু জানানো হয়নি এবং তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের তরফেও প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি ।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই সরব হয়েছে বিজেপি । মথুরাপুর বিজেপি সাংগঠনিক জেলার সম্পাদক বিপ্লব নায়েক বলেন, "ওই ব্যক্তি নিজের দোষ স্বীকার করেছে এবং মানুষের টাকা ফেরৎ দিচ্ছে । কিন্তু সে এটাও বলেছে যে নিজের জন্য নয়, উপরের নেতাদের জন্য টাকা তুলেছিল । আমরা চাই, গরিব মানুষের কাছ থেকে যারা এইভাবে টাকা নিয়েছে, তারা যেন সব ফেরৎ দেয় । প্রশাসনের নজরে বিষয়টি আনা হবে এবং প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাব ।"
গ্রামবাসীদের একাংশ জানিয়েছেন, সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অতীতে টাকা দেওয়াটা যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল । স্থানীয় বাসিন্দা শ্যামলী প্রধান বলেন, "আমাদের সরকারি ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে 5 হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল । তখন কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হতো । পরে পঞ্চায়েত সদস্য বাড়িতে এসে বলেন যে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হবে । সেই মতো সভায় গিয়ে আমরা টাকা ফেরৎ পেয়েছি ।"
যদিও এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি । প্রশাসনের তরফেও আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয় । তবে প্রকাশ্যে টাকা ফেরত দেওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগে দলের উচ্চস্তরের নাম উঠে আসায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে ।

