তাঁর এন্যুমারেশন ফর্ম টিভিতে ! কমিশনের বিরুদ্ধে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ কাকলির
এই ঘটনাকে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির মিলিত চক্রান্ত ও হেনস্তার কৌশল বলে তোপ দেগেছেন কাকলি ঘোষদস্তিদার ।

Published : December 28, 2025 at 2:37 PM IST
কলকাতা, 28 ডিসেম্বর: রাজ্যজুড়ে চলছে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া । আর এই প্রক্রিয়া চলাকালীনই খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না-থাকাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়ল । বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার খোদ লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের চিফ হুইপ তথা বারাসতের চারবারের সাংসদ ডা. কাকলি ঘোষদস্তিদার ।
খসড়া ভোটার তালিকায় সাংসদের পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম না-থাকায় তাঁদের শুনানিতে তলব করা হয়েছে । এই ঘটনাকে নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি বলে মানতে নারাজ সাংসদ । বরং একে তিনি নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির মিলিত চক্রান্ত ও হেনস্তার কৌশল বলে তোপ দেগেছেন । শনিবার নির্বাচন কমিশন এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর এই ক্ষোভের জবাব দিলেও ফের সোশাল মিডিয়াতেই সরব হন সাংসদ ৷ তাঁর অভিযোগ, তাঁর ও তাঁর মায়ের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেছে কমিশন ৷
ঘটনার সূত্রপাত ভোটার তালিকা যাচাইয়ের নোটিশকে কেন্দ্র করে । জানা গিয়েছে, কাকলি ঘোষদস্তিদারের দুই চিকিৎসক-পুত্র বিশ্বনাথ দস্তিদার ও বৈদ্যনাথ দস্তিদার, তাঁর নবতিপর মা ইরা মিত্র এবং ছোট বোন পিয়ালি মিত্রের নাম খসড়া তালিকায় না-থাকায় বা তথ্যে অসঙ্গতি থাকায়, তাঁদের শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছে । সাংসদের দুই ছেলে কলকাতার ভোটার হওয়ায় তাঁদের কলকাতায় এবং মা ও বোন মধ্যমগ্রামের দিগবেড়িয়া এলাকার ভোটার হওয়ায় তাঁদের বারাসত-2 নম্বর ব্লকের বিডিও অফিসে শুনানির জন্য হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন আগে কখনও হননি বলে দাবি করে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বর্ষীয়ান এই সাংসদ ।
বারাসতের সাংসদ বিষয়টিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করার এক পরিকল্পিত ছক হিসেবেই দেখছেন । তাঁর অভিযোগ, প্রায় 50 বছর ধরে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত । একজন চারবারের সাংসদের পরিবারের সদস্যদের যদি সামান্য ভোটার তালিকার নাম যাচাইয়ের জন্য এভাবে প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়তে হয় এবং নোটিশ পাঠিয়ে ডেকে পাঠানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের হয়রানি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা সহজেই অনুমেয় ।
কাকলির কথায়, "আমার ক্ষেত্রেই যদি এই ঘটনা ঘটে, তাহলে বাংলার সাধারণ মানুষ কী অবস্থার মধ্যে পড়ছেন, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয় ।" তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বদলে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছে এবং মানুষকে অহেতুক ব্যস্ত ও আতঙ্কিত করে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য ।
তবে শুধুমাত্র শুনানির নোটিশই নয়, সাংসদের ক্ষোভের আরও একটি বড় কারণ হল ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন । কাকলি ঘোষদস্তিদারের অভিযোগ, তাঁর এবং তাঁর মায়ের এন্যুমারেশন ফর্ম বা ভোটার তথ্য যাচাইয়ের ফর্ম সংবাদমাধ্যমের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং তা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়েছে ।
এক্স হ্যান্ডেলে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত এন্যুমারেশন ফর্ম টিভিতে দেখানো কি আইনসঙ্গত ? বিশেষ করে তাঁর 90 বছর বয়সি বৃদ্ধা মায়ের ফর্ম প্রকাশ্যে এনে তাঁকে অপমান করার অধিকার কার আছে, সেই প্রশ্নও তিনি প্রশাসনিক আধিকারিকদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছেন । সাংসদের যুক্তি অনুযায়ী, একবার ফর্ম জমা পড়ার পর তা নির্বাচন কমিশনের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় । সেই নথিপত্র কীভাবে সংবাদমাধ্যমের হাতে পৌঁছল এবং কেন তা জনসমক্ষে আনা হল, তা নিয়ে তিনি কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দিকে আঙুল তুলেছেন । একে তিনি চরম 'বিশ্বাসভঙ্গ' বলে অভিহিত করেছেন ।
রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে শাসক ও বিরোধী দলের তরজা নতুন কিছু নয় । তবে একজন হাই-প্রোফাইল সাংসদের পরিবারের সদস্যদের নাম নিয়ে এই জটিলতা এবং ব্যক্তিগত নথি ফাঁসের অভিযোগ বিষয়টিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে । কাকলি ঘোষদস্তিদার জানিয়েছেন, তিনি এই ঘটনাকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না । প্রশাসনিক স্তরে এই হয়রানি এবং গোপনীয়তা ভঙ্গের বিরুদ্ধে তিনি শেষ পর্যন্ত লড়বেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন । এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ করে এবং রাজনৈতিক এই উত্তাপ আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয় ।

