তৃণমূলের দুই কাউন্সিলরের বিবাদ! বারাসতে বন্ধ হয়ে গেল হকারদের সীমানা নির্ধারণের কাজ
বারাসত পুরসভায় তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগে বন্ধ হল ফেন্সিং দেওয়ার কাজ ৷ বিতর্কের মুখে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ অস্বীকার চেয়ারম্যানের ৷

Published : January 6, 2026 at 9:03 PM IST
বারাসত (উত্তর 24 পরগনা), 6 জানুয়ারি: বারাসত পুরসভার দুই কাউন্সিলরের বিবাদ ৷ আর তার জেরে পুরবোর্ডে সিদ্ধান্তের পরেও হকারদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ফেন্সিংয়ের কাজ করতে পারল না বারাসত পুরসভার পূর্ত বিভাগ ৷ যে ফেন্সিং হওয়ার কথা বারাসত উড়ালপুলের নিচে ৷ অভিযোগ, তৃণমূল কাউন্সিলর তথা পুর-পারিষদ (পূর্ত বিভাগ) অরুণ ভৌমিককে ফেন্সিংয়ের কাজ করতে বাধা দেন হকারদের একাংশ ৷ ফলে কাজ ফেলে রেখে চলে যান কর্মীরা ৷
গোটা ঘটনায় নাম জড়িয়েছে তৃণমূলেরই অপর কাউন্সিলর দেবব্রত পালের ৷ যদিও, তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ৷ তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক কারণে তাঁর নাম জড়ানো হচ্ছে ৷ আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসকদলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ তুলেছে বারাসত সাংগঠনিক জেলা বিজেপি ৷ যদিও, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ মানতে রাজি হননি বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান সুনীল মুখোপাধ্যায় ৷
বারাসত 12 নম্বর রেলগেট সংলগ্ন উড়ালপুলের নিচে দু-দিকের রাস্তা খুবই সংকীর্ণ ৷ তার উপর যত্রতত্র হকারদের দাপটে সেখানে সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতে পারেন না-বলে অভিযোগ ৷ জরুরি ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বৃদ্ধি পায় ৷ দিন-দিন হকারদের দাপটে শহরবাসীর নাজেহাল দশা দেখে কয়েকমাস আগে উড়ালপুলের নিচে ব্যবসায়ীদের একত্রিত করার উদ্যোগ নেয় পুর কর্তৃপক্ষ ৷
তৎকালীন চেয়ারম্যান অশনী মুখোপাধ্যায় হকারদের জন্য উড়ালপুলের নিচে নির্দিষ্ট জায়গায়ও চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন ৷ সেই জায়গাতেই ফেন্সিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৃণমূল পরিচালিত তৎকালীন পুরবোর্ড ৷ পুর-চেয়ারম্যান বদল হওয়ার পরেও নতুন পুরবোর্ডের সমস্ত কাউন্সিলরদের সম্মতিতে সেই সিদ্ধান্তে পুনরায় সিলমোহর দেওয়া হয় ৷
পুরবোর্ডের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সোমবার পুর আধিকারিকদের নিয়ে 12 নম্বর রেলগেট সংলগ্ন বারাসত উড়ালপুলের নিচে গিয়েছিলেন পূর্ত বিভাগের পুর-পারিষদ অরুণ ভৌমিক ৷ সঙ্গে ছিলেন ফেন্সিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার লোকজনও ৷ অভিযোগ, হকারদের সঙ্গে কথা বলে পুর আধিকারিকরা যখন সবে মাপজোক শুরু করেছেন, তখনই হকারদের একাংশ এসে কাজে বাধা দেয় বলে অভিযোগ ৷ এই নিয়ে পুর-পারিষদ অরুণ ভৌমিকের সঙ্গে তাঁদের তর্কাতর্কিও হয় ৷
হকারদের দাবি, দোকানের সামনের অংশে ফেন্সিং দেওয়া হলে, উড়ালপুলের নিচের রাস্তায় যানজট আরও বাড়বে ৷ তাঁদের ব্যবসা করতেও সমস্যা হবে ৷ পাল্টা পুরসভার যুক্তি, ফেন্সিংয়ের জন্য আগে থেকেই নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা রয়েছে ৷ চিহ্নিত করা সেই জায়গাতেই ফেন্সিং দেওয়া হবে ৷ তাতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধা হবে ৷ পাশাপাশি, ব্যবসায়ীরাও সুষ্ঠুভাবে পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন ৷ এতে কারও কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয় ৷
ঘটনার খবর পেয়ে উড়ালপুলের নিচে কাজের জায়গায় হাজির হন পুরসভার 10 নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর দেবব্রত পাল ৷ অভিযোগ, তিনিও হকারদের সুরে সুর মিলিয়ে সেখানে আপাতত ফেন্সিংয়ের কাজ বন্ধ রাখতে বলেন পুর আধিকারিকদের ৷ এই বিষয়ে যা কথা বলার, তা পুরসভায় গিয়ে তিনি বলবেন বলেও পুর-পারিষদ অরুণ ভৌমিককে স্পষ্ট জানিয়ে দেন ৷ দলীয় কাউন্সিলরের এই আচরণে অরুণ ভৌমিক অপমানিত বোধ করেন বলে অভিযোগ করেছেন ৷ তাই ক্ষুদ্ধ হয়ে তিনি সেখান থেকে খালি হাতে ফিরে আসেন ৷
এই বিষয়ে পুরসভার পূর্ত বিভাগের পুর-পারিষদ অরুণ ভৌমিক বলেন, "আগের ও বর্তমান, দুই পুরবোর্ডেই সকলের সম্মতিতে এই ফেন্সিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৷ পুরবোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনেই আমি সেখানে গিয়েছিলাম কাজের তদারকি করতে ৷ সেই হকারদের যে সুর দেখলাম, তাতে আমার ভালো লাগেনি ৷ মানুষের স্বার্থেই কাজ করতে গিয়ে আমাকে অসম্মানিত হতে হল ৷ পুরবোর্ডের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা গেল না ৷ চেয়ারম্যান সুনীল মুখোপাধ্যায়কে বিষয়টি জানিয়েছি ৷ বাকিটা ওঁর ব্যাপার ৷ কীভাবে, কী হবে, না-হবে সেটা উনিই ভালো বলতে পারবেন ৷"
তৃণমূল কাউন্সিলর দেবব্রত পাল অবশ্য যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ৷ তাঁর কথায়, "যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যে ৷ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এসব কথা বলছে ৷ বরং, উড়ালপুলের নিচে হকারদের সুসংহতভাবে পুনর্বাসন দেওয়ার ক্ষেত্রে আমারও যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে ৷ সেখানে এখন ব্যবসায়ীরা সুন্দরভাবে নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন ৷ পুরবোর্ডে এ-ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল 12 নম্বর রেলগেট সংলগ্ন এলাকার মতো জেলা সদর বারাসতের অন্যান্য জায়গাতেও পদ্ধতি মেনে হকারদের একত্রিত করে পুনর্বাসন দেওয়া হবে ৷ স্বভাবতই যে প্রশ্নগুলো তোলা হচ্ছে, তা রাজনৈতিক কারণেই করা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় ৷"
এই নিয়ে তৃণমূলকে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি গেরুয়া শিবির ৷ বিষয়টি নিয়ে বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য তাপস মিত্র বলেন, "বারাসতে তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দল চরমে পৌঁছেছে ৷ তা আমরা পুরসভার চেয়ারম্যান বদলের সময়েও দেখেছি ৷ এক্ষেত্রেও দেখছি ৷ পুরবোর্ডের একটা সিদ্ধান্ত, সেটাই কার্যকর করতে পারছে না তৃণমূলের দুই কাউন্সিলর ৷ এক জন, আরেক জনকে বাধা দিচ্ছেন ৷ ভাবুন এঁরা নাকি মানুষের উন্নয়নের কাজ করবে !"
যদিও এর নেপথ্যে কোনও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেই বলে পাল্টা জবাব দিয়েছেন বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান সুনীল মুখোপাধ্যায় ৷ তিনি বলেন, "তেমন কোনও ঘটনা ঘটেনি ৷ এ নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে ৷ আমি নিজে গিয়ে হকারদের সঙ্গে কথা বলব ৷ সেই মতো পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে ৷ পুরবোর্ডে সিদ্ধান্ত হলেও কিছু-কিছু পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই সিদ্ধান্ত বদলও করতে হয় ৷"

