দিল্লি থেকে ফিরেই বাইপাসের তৃণমূল ভবন দখল ঋতব্রতদের, পাল্টা ঘুঁটি সাজাচ্ছে কালীঘাট
দিল্লি থেকে ফিরেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিমরা সটান চলে গেলেন ইএম বাইপাসের তৃণমূল ভবনে। দলের সদর দফতর হিসেবে ওই ভবনটি তাঁরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন।

Published : July 3, 2026 at 8:45 PM IST
কলকাতা, 3 জুলাই: ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে ক্ষমতা দখলের লড়াই এবার এক নাটকীয় মোড় নিল। দিল্লি থেকে ফিরেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ফিরহাদ হাকিমরা। সটান চলে গেলেন ইএম বাইপাসের তৃণমূল ভবনে। দলের সদর দফতর হিসেবে ওই ভবনটি তাঁরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন। শুক্রবার বিকেল থেকেই সেখানে শুরু হয়ে যায় ম্যারাথন বৈঠক। মূল ফটক বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে চলে দলের আগামী রূপরেখা তৈরির কাজ।
এর ঠিক আগে গতকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দুপুরে দিল্লির নির্বাচন সদনে যায় ঋতব্রত শিবিরের 10 জনের একটি প্রতিনিধি দল। ওই দলে ছিলেন 9 জন বিধায়ক এবং এক প্রাক্তন মন্ত্রী। সেখানে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তাঁরা নিজেদের দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে বেরিয়ে তাঁরা দাবি করেন, দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক, কাউন্সিলর ও জেলা পরিষদ সদস্য তাঁদের পাশেই আছেন। ফলে দলের নাম বা প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার কোনও আশঙ্কা তাঁরা দেখছেন না। সব শুনে আগামী সোমবারের মধ্যে তাঁদের লিখিত বয়ান জমা দিতে বলেছে নির্বাচন কমিশন।
তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই লড়াই নিছকই প্রতীক বা দলের নাম রক্ষার নয়। আসল লড়াই হল কোটি কোটি টাকার দলীয় তহবিলের রাশ নিজেদের হাতে রাখা। বিদ্রোহী শিবির চাইছে, ফান্ডের পুরো নিয়ন্ত্রণ দলের নতুন কোষাধ্যক্ষ আখরুজ্জামানের হাতেই থাকুক।
অন্যদিকে, এই বিদ্রোহ সামাল দিতে পাল্টা কোমর বাঁধছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাট শিবির। আগামী 6 জুলাই নির্বাচন কমিশনে সমস্ত আইনি ও সাংগঠনিক নথিপত্র জমা দিতে চলেছেন তাঁরা। মমতা-শিবিরের প্রধান হাতিয়ার হতে চলেছে খোদ নেত্রীর সই। তাঁদের যুক্তি, আজ যাঁরা নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সই করা প্রতীকেই ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছেন। পাশাপাশি, নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামের সর্বভারতীয় সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে মমতাকে দলের চেয়ারপার্সন বাছা হয়েছিল। সেখানে মেঘালয় সহ অন্যান্য রাজ্যের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সেই প্রমাণও কমিশনের টেবিলে পেশ করা হবে। একইসঙ্গে বিদ্রোহীদের দল থেকে বহিষ্কার করার তথ্যও তুলে ধরা হতে পারে।
গোটা টানাপোড়েনের নেপথ্যে বিজেপির হাত দেখছেন কুণাল ঘোষ। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, রাজনৈতিকভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভয় পায় বলেই বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে হাতিয়ার করে অন্যান্য রাজ্যের মতো বাংলাতেও এই নোংরা খেলা খেলছে। কিন্তু, সাধারণ কর্মীরা নেত্রীর সঙ্গেই আছেন। এসবের মাঝেই শুক্রবার বাইপাসের ধারে মেট্রোপলিটনের তৃণমূল ভবনের পার্টি অফিসে ঢুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন বিদ্রোহীরা। সেখানে ছিলেন জাভেদ খানও।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আখরুজ্জামান বলেন, "আমাদের নিজস্ব পার্টি অফিসে আমরা এসেছি। আজ থেকে আমরা কার্যপদ্ধতি শুরু করব।" ভবনটির মালিকানা প্রসঙ্গে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিদ্রোহী শিবিরের এক নেতা বলেন, "আমাদের মালিকের অনুমতি নিয়ে আমাদের আবেগ আমাদের পার্টি অফিস আমরা এখান থেকে পরিচালনা করেছিলাম আগামী দিনেও করব। বাকিটা বলবে মালিক।"
ভবন দখল নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা তো তৃণমূল কংগ্রেস। আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসেই তো আসব! এটা নিয়ে আবার প্রশ্ন কেন?" তিনি আরও বলেন, "এটা তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস, আমরা বিধানসভায় প্রিন্সিপাল অপজিশন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি, দলের বিধায়ক, দলের এক্স কাউন্সিলর, দলের বিভিন্ন পদাধিকারীকে নিয়ে আমরা 22 তারিখ মিটিং করেছি, সেখানে আমাদের নতুন ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটিও গঠন হয়ে গেছে যার চেয়ারপার্সন অরূপ রায়।" তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে তাঁর সুর ছিল কিছুটা নরম। তিনি বলেন, "আমাদের এডভাইসার হিসাবে, আমাদের মেন মাথা হিসাবে আমরা দিদিকে চাই, দিদি আমাদের ডাইরেকশন দিক আমরা থাকব।"
গত 22 জুনের বিশেষ অধিবেশনে অরূপ রায়কে চেয়ারপার্সন আর আখরুজ্জামানকে কোষাধ্যক্ষ ঘোষণা করে এই লড়াইয়ের সূত্রপাত করেছিল ঋতব্রত শিবির। এখন সোমবার নির্বাচন কমিশনে লিখিত বয়ান জমা পড়ার পর এই আসল-নকলের লড়াই কোন দিকে গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

