হাইকোর্টের নির্দেশ না-মেনে মিছিলে হামলা! পুলিশের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার হুঁশিয়ারি মমতার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, মিছিলে হামলায় দলের আইটি সেলের চেয়ারপার্সন থেকে শুরু করে অসংখ্য মহিলা, প্রবীণ এবং তরুণ কর্মী মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন ।

Published : July 8, 2026 at 5:56 PM IST
কলকাতা, 8 জুলাই: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর আইনশৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি ঘটেছে এবং পুলিশ প্রশাসন শাসকদলের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে ৷ এমনই অভিযোগ তুলে বুধবার মিছিল শেষে সরব হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । এই 'নৈরাজ্যের পরিস্থিতি'তে আদালতের নির্দেশ অমান্য করারও অভিযোগ তুলেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ৷ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আইনি পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি ।
বুধবার তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের পূর্বনির্ধারিত মিছিল ঘিরে চরম বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তির সৃষ্টি হয় । অভিযোগ, কলকাতা হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশ এবং অনুমতি থাকা সত্ত্বেও ওই মিছিলে নির্লজ্জভাবে বাধা দান এবং পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা ধরা পড়ে ৷ আর এই অভিযোগে বর্তমান শাসকদল বিজেপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে এদিন তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ।

এদিন হাইকোর্টের বিশেষ অনুমতি নিয়েই তৃণমূলের ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে ওই মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল । পুলিশ প্রশাসনকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল যে, এই মিছিলের নির্দিষ্ট রুট হবে কালীঘাট থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত । কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, সংবিধানের 14, 19 এবং 21 নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে আয়োজিত এই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে ।

তিনি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান, এদিন ভোর থেকেই তাঁর বাসভবনের বাইরে মোটর বাইক নিয়ে জড়ো হতে শুরু করেন বহু বহিরাগত বিজেপি সমর্থক । সেখানে রীতিমতো হুমকি এবং ভীতিপ্রদর্শনের এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি করা হয় । তাঁর বাড়ির সামনে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের আধিকারিকরা মোতায়েন থাকলেও, তাঁরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোনও চেষ্টাই করেননি । উলটে কে বাড়িতে ঢুকছেন বা বেরোচ্ছেন, অলিখিতভাবে তার ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছিলেন তাঁরা ।

এমনকি, আদালত অনুমোদিত রুটে হ্যান্ড মাইক ব্যবহারের আইনি অনুমতি থাকলেও, পুলিশ জোর করে তৃণমূল কর্মীদের হাত থেকে সেই মাইক কেড়ে নেয় বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন মমতা । আরও অভিযোগ, হাইকোর্ট তৃণমূলের মিছিলে বিধিনিষেধ চাপালেও, বিজেপির একাধিক কর্মসূচিকে বিনা বাধায় সম্পন্ন হতে দেওয়া হয়েছে ।
তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগ, পুলিশ যখন বিরোধীদের কর্মসূচিতে বাধা দিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই শাসকদলের সমর্থকরা সকাল থেকে তারস্বরে ডিজে বাজিয়ে এবং বহিরাগত সমাজবিরোধীদের জড়ো করে গোটা এলাকায় ব্যাপক অশান্তি পাকায় । মিছিলে ঢুকে পড়ে তারা যেমন একদিকে উসকানিমূলক স্লোগান দেয়, তেমনই তৃণমূল কর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় । রাম মন্দিরের দুর্নীতি নিয়ে যখন দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে, তখন সেই রামের নাম করেই তারা এই তাণ্ডব চালিয়েছে বলে তোপ দাগেন মমতা ।

তাঁর দাবি, এই আকস্মিক হামলায় দলের আইটি সেলের চেয়ারপার্সন থেকে শুরু করে অসংখ্য মহিলা, প্রবীণ এবং তরুণ কর্মী মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন । পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছয় যে, আক্রান্ত কর্মীদের উদ্ধার করতে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের বাসভবন ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসতে হয় । রক্তমাখা অবস্থায় দলীয় কর্মীদের দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূল নেত্রী । সাধারণ মানুষের কাছে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "এই পরিবর্তনের জন্যই কি বাংলার মানুষ ভোট দিয়েছিলেন? পরিবর্তনের অর্থ তো হওয়া উচিত শান্তি, নিরাপত্তা, হিংসা কমে আসা এবং মহিলাদের ওপর অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া ।"

রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নারী নিরাপত্তা নিয়েও এদিন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী । উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, গত মাত্র দু'মাসের মধ্যে দুর্গাপুর, বর্ধমান, ভগবানপুর, পটাশপুর, কোচবিহার এবং মালদার মতো জায়গায় অন্তত 14 জন মহিলা ও নাবালিকা ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন বা খুনের শিকার হয়েছেন । পাশাপাশি, বনগাঁয় প্রায় 50 জন প্রতিবাদী আন্দোলনকারীকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে ।"
রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, "বর্তমান প্রশাসন রাজ্যের সাধারণ মানুষের কল্যাণের বদলে রাজনীতি করতেই বেশি আগ্রহী । রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিড-ডে মিল প্রকল্প থেকে ডিমের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে রাজ্যের অসংখ্য গরিব স্কুল পড়ুয়া তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছে ।"
গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরকে কোনওভাবেই ভয় দেখিয়ে, অত্যাচার করে বা পেশিশক্তি প্রদর্শন করে রোধ করা যাবে না বলে এদিন প্রশাসনকে বার্তা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে সরকার এখন সম্পূর্ণভাবে সমাজবিরোধী এবং পুলিশের একাংশের ওপর নির্ভর করছে বলে তিনি কটাক্ষ করেন ।
শুধু তাই নয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির আগাম গোপন খবর পুলিশের একাংশই সরাসরি বিজেপি কর্মীদের কাছে পাচার করে দিচ্ছে বলেও তাঁর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ । অবিলম্বে রাজ্যে আইনের শাসন এবং শান্তি ফেরানোর দাবি জানিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন । আদালতের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখানো পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে দলীয় স্তরে দ্রুত আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হবে বলেও এদিন চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ।

