ভিক্ষা চাই না ! নদিয়ার সভায় 'বঞ্চনা' নিয়ে কেন্দ্রকে কড়া বার্তা মমতার
রাজ্যের নিজস্ব তহবিলে তৈরি প্রায় 20 হাজার কিলোমিটার নতুন 'পথশ্রী' রাস্তার উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷

Published : December 11, 2025 at 2:07 PM IST
কৃষ্ণনগর, 11 ডিসেম্বর: সামনেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন । তার আগে উন্নয়ন ও কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগকে হাতিয়ার করেই প্রচারের সুর বেঁধে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । বৃহস্পতিবার নদিয়ার কৃষ্ণনগরে প্রশাসনিক সভা থেকে একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করার পাশাপাশি বঞ্চনার অভিযোগ তুলে ফের সুর চড়ালেন তিনি । 100 দিনের কাজের বকেয়া টাকা থেকে শুরু করে আবাস যোজনা - একাধিক ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে জানিয়ে দিলেন, রাজ্যের আর দিল্লির 'ভিক্ষে'-র প্রয়োজন নেই ।
এদিন রাজ্যের নিজস্ব তহবিলে তৈরি প্রায় 20 হাজার কিলোমিটার নতুন 'পথশ্রী' রাস্তার উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী ৷ তিনি বলেন, "কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের টাকা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা থেমে থাকিনি । আজ এই পবিত্র মাটি থেকে আমরা আরও 20 হাজার কিলোমিটার নতুন রাস্তার উদ্বোধন করলাম ।"

রাজ্যের উন্নয়নের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, গত সাড়ে 14 বছরে রাজ্য সরকার নিজস্ব উদ্যোগে 1 লক্ষ 83 হাজার 84 কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেছে । কেন্দ্রীয় সরকার টাকা বন্ধ করে দেওয়ার পরেও রাজ্য নিজের টাকায় 39 হাজার রাস্তা আগেই তৈরি করেছিল, এবার তার সঙ্গে যুক্ত হল আরও 20 হাজার কিলোমিটার পথ । শুধুমাত্র রাস্তা নয়, পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও যে রাজ্য পিছিয়ে নেই বলে দাবি মুখ্যমন্ত্রীর ৷ তিনি জানান, এই সময়ের মধ্যে রাজ্যে 361টি প্রধান ও মাঝারি সেতু এবং 20টি রেল ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে । এতে খরচ হয়েছে প্রায় 83 হাজার কোটি টাকা ।
রাস্তা উদ্বোধনের মঞ্চ থেকেই রাজনৈতিক বাণে কেন্দ্রকে বিদ্ধ করেন মুখ্যমন্ত্রী । তাঁর অভিযোগ, বাংলা গ্রামীণ আবাস যোজনা, 100 দিনের কাজ এবং গ্রামীণ রাস্তা তৈরিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল । আর সেটাই কেন্দ্রের চক্ষুশূলের কারণ । মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, "যে ভালো কাজ করে সে পায় শূন্য, আর ডাবল ইঞ্জিন সরকার বিজেপি হবে কোটি কোটি টাকাতে পুর্ণ । এই তো হচ্ছে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কাজ ।"
তিনি অভিযোগ করেন, গত চার বছর ধরে 100 দিনের কাজের টাকা এবং গ্রামীণ আবাস যোজনার টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র । অথচ রাজ্য নিজেদের কাজ করে গিয়েছে । কেন্দ্রের বঞ্চনার পালটা হিসেবে রাজ্য সরকার যে নিজস্ব উদ্যোগে 'কর্মশ্রী' প্রকল্প চালু করেছে, তার সাফল্যের খতিয়ানও এদিন পেশ করেন তিনি । জানান, কর্মশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই 78 লক্ষ 31 হাজার জব কার্ড হোল্ডারকে কাজ দেওয়া হয়েছে । 100 দিনের প্রকল্পে যেখানে গড়ে 30-40 দিনের কাজ মিলত, সেখানে কর্মশ্রীতে রাজ্য গড়ে 70 দিনের কাজ দিচ্ছে এবং আগামীদিনে তা বাড়িয়ে 75 দিন করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি । যার জন্য রাজ্যের কোষাগার থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় 20 হাজার 776 কোটি টাকা ।
আদালতের নির্দেশের প্রসঙ্গ টেনে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগও আনেন মমতা । তিনি বলেন, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও কেন্দ্র এতদিন চুপ ছিল । এখন ডিসেম্বরের 11 তারিখ হঠাৎ চিঠি পাঠিয়ে কঠিন সব শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে । মুখ্যমন্ত্রীর আশঙ্কা, ফেব্রুয়ারি মাসেই বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা হয়ে যাবে । তার আগে হাতে মাত্র একটি মাস সময় । কেন্দ্রের চিঠির শর্ত অনুযায়ী, গ্রামসভায় 10 জনের বেশি কাজ পাবে না, টেন্ডার ডাকতে হবে - যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার । একটি টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই যেখানে তিন মাস সময় লাগে এবং মার্চ মাসে আর্থিক বছর শেষ হয়ে যায়, সেখানে এখন এই নির্দেশিকাকে 'চালাকির খেলা' বলে অভিহিত করেন তিনি ।
বক্তব্যের শেষে কেন্দ্রের প্রতি কড়া মনোভাব ব্যক্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর যখন কেন্দ্র টাকা দেয়নি, তখন আর তাদের দয়ার প্রয়োজন নেই । তাঁর কথায়, "তোমাদের ভিক্ষে আমরা চাই না । আমরা ভিক্ষে করে খাই না । এটা চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও নেতাজির দেশ । মনে রাখবেন, এটা হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের দেশ ।"
নদিয়ার ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চৈতন্যদেব শান্তির বাণী নিয়ে এই জেলাতেই পদার্পণ করেছিলেন, তাই বিভাজনের রাজনীতি এখানে চলবে না । নবদ্বীপকে হেরিটেজ টাউন ঘোষণার কথাও এদিন মনে করিয়ে দেন তিনি । পাশাপাশি ওয়াকফ সম্পত্তি এবং আধার কার্ড নিয়েও বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন । তাঁর সাফ কথা, আদিবাসীদের জমির মতোই ওয়াকফ সম্পত্তিও কেউ দখল করতে পারবে না । আধার কার্ড প্রসঙ্গে তাঁর কটাক্ষ, "ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে আধার চলবে, কিন্তু ভোট দিতে বা নাগরিকত্ব প্রমাণে চলবে না । এটা বিজেপির দালালি বা তাঁবেদারি করার জন্য দেশ নয় ।"
নদিয়া জেলার শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারেও এদিন জোর দেন মমতা । তিনি জানান, একসময় নদিয়াকে কেউ গুরুত্ব দিত না, কিন্তু বর্তমান সরকার আসার পর 95টি নতুন প্রকল্প তৈরি হয়েছে । কল্যাণীতে তৈরি হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, ইন্টিগ্রেটেড টেক্সটাইল পার্ক ও আইটি পার্ক । হরিণঘাটায় ফ্লিপকার্টের হাব তৈরি হচ্ছে, যেখানে প্রায় 10 হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে ।
এছাড়াও জেলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ও মাটির পুতুলের প্রসারেও সরকার উদ্যোগী । বিশেষ করে মসলিন শাড়ি এবং কৃষ্ণনগরের সরভাজা-সরপুরিয়ার জন্য 'সরতীর্থ' ও 'মসলিন তীর্থ' তৈরির কথা উল্লেখ করেন তিনি । এদিন সভামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মহুয়া মৈত্র, শঙ্কর সিং-সহ জেলার একাধিক বিধায়ক ও নেতা-নেত্রীরা । নিচুতলার কর্মীদের 'দলের সম্পদ' হিসেবে অভিহিত করে নির্বাচনের আগে তাঁদের মনোবল বাড়ানোর বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী ।

