NRC-র ভয়ে চরম পদক্ষেপ খড়দার প্রৌঢ়র! বিজেপিকে তোপ মমতার
পানিহাটি থেকে দেহ উদ্ধার৷ মৃতের নাম প্রদীপ কর৷ মৃতের বাড়িতে যান চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, নির্মল ঘোষরা৷ তৃণমূলের বিরুদ্ধে পালটা সরব বিজেপি৷

Published : October 28, 2025 at 5:57 PM IST
পানিহাটি ও কলকাতা, 28 অক্টোবর: নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মোতাবেক মঙ্গলবার থেকেই পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)। আর সেদিনই এনআরসি আতঙ্কে প্রৌঢ়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হল উত্তর 24 পরগনার পানিহাটি থেকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রদীপ কর নামে ওই প্রৌঢ়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে তাঁর ঘর থেকে। মৃতদেহের পাশে পড়ে ছিল একটি নোটও। যেখানে তাঁর মৃত্যুর জন্য এনআরসিকে-ই দায়ী করেছেন তিনি। ইতিমধ্যে পুলিশ ওই নোটটি বাজেয়াপ্ত করেছে। সেই সঙ্গে প্রৌঢ়ের ঝুলন্ত দেহটি উদ্ধার করে, তা ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে হাসপাতালে। গোটা ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে খড়দা থানার পুলিশ।
এই ঘটনাটি নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তাঁর দাবি, এনআরসি আতঙ্কে ওই ব্যক্তি নিজেই নিজের জীবন শেষ করেছেন৷ মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টটি সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন তৃণমূলের অন্য নেতারা৷ পাশাপাশি ওই ব্যক্তির বাড়িতে এদিন হাজির হন রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষ৷
প্রৌঢ়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর 57-র প্রদীপ কর আগরপাড়ার মহাজাতি নগরের বাসিন্দা (যেটি পানিহাটি পুরসভার 9 নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত)। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। পরিবার বলতে ছিল তাঁর এক ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রী। তাঁদের সঙ্গেই মহাজাতি নগরের ফ্ল্যাটে থাকতেন প্রৌঢ়। সোদপুরে তাঁর একটি চাদরের দোকান রয়েছে।

পরিবারের দাবি, বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি এনআরসি আতঙ্কে ভুগছিলেন। দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্ক গ্রাস করেছিল তাঁর মনে। এই নিয়ে মাঝে মধ্যেই আলোচনা করতেন পরিচিতদের সঙ্গে। তারই মধ্যে মঙ্গলবার ঘটে গেল এই মর্মান্তিক ঘটনা। তাও আবার এসআইআর চালুর আবহে। এনআরসি-র আতঙ্কেই ওই প্রৌঢ় চরম পদক্ষেপ করেছেন বলে দাবি পরিবারের লোকজনের। সূত্রের খবর, তাঁর নিথর দেহের পাশ থেকে মিলেছে একটি ডায়েরি। তাতেই এনআরসি সম্পর্কিত নানা বিষয় লেখা রয়েছে। ডায়েরির খাতার একদম নিচে লেখা, ‘‘এনআরসি আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী।’’

ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা জয়দীপ ভৌমিক বলেন, "দরজা ভাঙতেই দেখা যায় ও গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। পুলিশ তদন্তে নেমে দেখে পাশে একটা খাতা ওল্টানো রয়েছে। সেই খাতায় দেখা যায় এনআরসি নিয়ে নানা কথা লেখা। নিচে বড় করে লেখা রয়েছে আমার মৃত্যুর জন্য এনআরসি দায়ী। উনি এনআরসি নিয়ে মাঝে মধ্যেই আলোচনা করতেন কী হবে না হবে! সেই আতঙ্কই ওকে এই দিকে ঠেলে দিল।"

ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার মুরলীধর শর্মা বলেন, "ওই প্রৌঢ়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছ এনআরসি নিয়ে যে সমস্ত আলোচনা চলছে, তা নিয়ে উনি কয়েক দিন ধরেই মানসিক চাপে ছিলেন। ওর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আমরা সেটাই জানতে পেরেছি। সোমবার এসআইআর ঘোষণা হতেই উনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তা দেখে পরিবারের লোকেরা মনে করেছিল হয়তো ওঁর শরীর খারাপ করছে। পরবর্তীতে ওঁর কোনও সাড়া শব্দ না-পাওয়ায় সন্দেহ হয় ভাইয়ের স্ত্রীর। এরপর দরজা ভেঙে ওঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। একটি নোটও উদ্ধার হয়েছে। সেটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।"
বিজেপিকে তোপ মুখ্যমন্ত্রীর
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্রে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে যায়। এদিন দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ সোশাল মিডিয়া সাইট এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ এই নিয়ে পোস্টটি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ইংরেজি ভাষায় লেখা রয়েছে পোস্টের বিষয়বস্তু৷ সেখানে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘পানিহাটি পুরসভার 9 নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রদীপ কর নিজেই নিজের জীবন শেষ করেছেন৷ মৃত্যুর একটি চিরকুটে লিখে গিয়েছেন ‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী এনআরসি’৷ বিজেপির ভয় ও বিভাজনের রাজনীতির এর চেয়ে বড় অভিযোগ আর কী হতে পারে?’’
এর পর ওই পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘বছরের পর বছর ধরে বিজেপি কীভাবে এনআরসি-র হুমকি দিয়ে, মিথ্যা প্রচার করে, আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়ে এবং ভোটের জন্য নিরাপত্তাহীনতার অস্ত্র ব্যবহার করে নিরীহ নাগরিকদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে, তা কল্পনা করলে আমার হৃদয় কাঁপতে থাকে। তারা সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে একটি দমনমূলক আইন-শাসনে পরিণত করেছে, যেখানে মানুষকে তাদের নিজস্ব অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।’’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘‘এই মর্মান্তিক মৃত্যু বিজেপির বিষাক্ত প্রচারের প্রত্যক্ষ পরিণতি। যারা দিল্লিতে বসে জাতীয়তাবাদের প্রচার করে, তারা সাধারণ ভারতীয়দের এতটাই হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছে যে তাঁরা তাঁদের নিজের দেশেই মারা যাচ্ছে, এই ভয়ে যে তাঁদের 'বিদেশি' ঘোষণা করা হবে।’’
ওই পোস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও লিখেছেন, ‘‘আমি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি যে এই নির্মম খেলাটি চিরতরে বন্ধ করুক। বাংলা কখনও এনআরসি অনুমোদন করবে না এবং কাউকে আমাদের জনগণের মর্যাদা বা স্বত্ত্ব কেড়ে নিতে দেবে না। আমাদের ভূমি মা, মাটি, মানুষের৷ এটা যারা ঘৃণা ছড়ায়, তাদের জন্য নয়৷ দিল্লির জমিদাররা এই কথাটি স্পষ্টভাবে শুনে নিন: বাংলা প্রতিরোধ করবে, বাংলা রক্ষা করবে এবং বাংলা জয়ী হবে।’’
মৃতের বাড়িতে চন্দ্রিমা-নির্মল
অন্যদিকে, প্রৌঢ়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর মহাজাতি নগরের ফ্ল্যাটে যান রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষ, স্থানীয় পুরসভার চেয়ারম্যান সোমনাথ দে-সহ আরও অনেকে। তদন্ত করতে ঘটনাস্থলে আসেন ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার মুরলীধর শর্মাও। তৃণমূলের প্রতিনিধিদল সেখানে গিয়ে কথা বলেন নিহতের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে। পাশে থাকার বার্তা দেন।

নিহতের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বলেছেন আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কাউকে আমরা এনআরসির নামে এই ধরনের কাজ করতে দেব না। তাঁদের ভোটার লিস্টে নাম রয়েছে। ভোটও দিচ্ছেন। কেউ যদি ওপার বাংলা থেকে এদেশে এসেও থাকে, তার জন্য নির্দিষ্ট আইন আছে। সেই আইন লঙ্ঘন করার এক্তিয়ার কারও নেই। এই ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলন আরও তীব্র হবে। নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলনের মাধ্যমে উঠে এসেছেন। তিনি সব সময় অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করে এসেছেন। কখনও পিছুপা হননি।"
মমতা-তৃণমূলকে বিজেপির পালটা তোপ
অন্যদিকে সোশাল মিডিয়ায় এই নিয়ে তোপ দেগেছেন বিজেপি নেতা অমিত মালব্য৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রদীপ করের মর্মান্তিক মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা উচিত৷ মৃত্যুর কারণ কেবল আইন এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলি দ্বারাই নির্ধারণ করা যেতে পারে, রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নয়।’’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ দেগে তিনি আরও লেখেন, ‘‘আসুন আমরাও সঠিক তথ্য সংগ্রহ করি৷ দেশের কোথাও কোনও এনআরসি নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মিথ্যা বলছেন এবং রাজনৈতিক লাভের জন্য মানুষের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন।’’

বিজেপির আইটি সেলের প্রধান তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে আরও লিখেছেন, ‘‘ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র হিন্দু শরণার্থীদের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি নয়, তৃণমূল কংগ্রেসই ভয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। একই ভয় লুটপাট, আক্রমণ এবং কণ্ঠস্বর দমন করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, যেমনটি সন্দেশখালিতে এবং মালদা ও মুর্শিদাবাদের হিংসার সময় দেখা গিয়েছিল।’’
অমিত মালব্য আরও লেখেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন যে একটি সঠিক স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) তাঁর প্রশাসনের পচন উন্মোচিত করবে এবং তাঁর রাজনৈতিক পতনের সূচনা করবে। এসআইআর নিশ্চিত করবে যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা, যাঁরা তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করে, তাঁদের চিহ্নিত করা হবে এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই কারণেই তিনি আবারও মিথ্যা এবং নাটকের আশ্রয় নিচ্ছেন।’’
পোস্টের শেষে বিজেপির এই নেতা লিখেছেন, ‘‘সত্য এবং জবাবদিহিতার জয় হবে - ভয় দেখানোর নয়।’’
| আত্মহত্যা কোনও সমাধান নয়: যদি আপনার মধ্যে কখনও আত্মহত্যার চিন্তা মাথাচাড়া দেয় বা আপনার কোনও বন্ধু বা পরিচিত এই সমস্যায় জর্জরিত হন, তাহলে ভেঙে পড়বেন না। জানবেন, এমন কেউ আছে যে আপনার যন্ত্রণা, আপনার হতাশা ভাগ করে নিতে সদা-প্রস্তুত। আপনার পাশে দাঁড়াতে তৎপর। সাহায্য পেতে দিনের যে কোনও সময়ে 044-24640050 এই নম্বরে কল করুন স্নেহা ফাউন্ডেশনে। টাটা ইন্সটিটিউট অফ সোশাল সায়েন্সের হেল্পলাইন নম্বরেও (9152987821) কল করতে পারেন। এখানে ফোন করতে হবে সোমবার থেকে শনিবার সকাল 8টা থেকে রাত 10টার মধ্যে। |

