ETV Bharat / politics

পাখির চোখ বিহার, তৃণমূল-বিজেপি বিরোধিতায় বঙ্গে কোন পথে বাম-লিবারেশনের বোঝাপড়া

উভয় পক্ষের কথাতেই একে অপরের হাত ধরার ইঙ্গিত মিলেছে ৷ তবে ছাব্বিশে কংগ্রেস কোন পথে হাঁটে, তা নিশ্চিত করতে সব দলেরই নজর বিহারের ফলাফলে ৷

ETV BHARAT
তৃণমূল-বিজেপি বিরোধিতায় কোন পথে বাম-লিবারেশনের বোঝাপড়া (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 13, 2025 at 8:14 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 13 নভেম্বর: শুক্রবার বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের ফলঘোষণা । যা নিয়ে বিহার তো বটেই, পড়শি বাংলাতেও তুঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপ । কারণ, বছর ঘুরলেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন । তাই বিহারের ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই রাজনীতির ক্ষেত্রে তৈরি হবে রণকৌশল ৷ আর এই আসন্ন নির্বাচনে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী বিজেপির বিরুদ্ধে সমস্ত শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে মরিয়া বামেরা । রাজ্য বামফ্রন্ট ছাড়াও সিপিআইএমএল লিবারেশনও বাংলায় বামপন্থার পুনর্জাগরণ চাইছে ।

সেই কারণেই আগামী 18-20 নভেম্বর নৈহাটিতে দলের 13তম সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে । এই সম্মেলনে সিপিআইএমএল লিবারেশন স্লোগান রেখেছে, 'বাংলায় চাই বামপন্থার পুনর্জাগরণ !' উল্লেখ্য, গতবছর নৈহাটির উপনির্বাচনে সিপিএম প্রথমবার লিবারশনের প্রার্থীকে সমর্থন করেছিল । যদিও নৈহাটিতে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে লিবারেশনের প্রার্থী দেবজ্যোতি মজুমদার তৃতীয় স্থান আধিকার করেছিলেন । এখানে বামেদের ভোটের হার কিছুটা বাড়লেও সিপিআইএমের সম্পূর্ণ ভোট লিবারেশন প্রার্থী পাননি । যা নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে লিবারেশন ও সিপিএমের মধ্যে । কিন্তু, নৈহাটির সমঝোতা ফলাফল আগামীতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও আশাবাদী উভয় পক্ষ ।

লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য পার্থ ঘোষ বলেন, "আমরা আগে যেখানে প্রার্থী দিতে পারতাম না, সেখানে বামফ্রন্ট প্রার্থীদের সমর্থন করতাম । প্রথমবার নৈহাটিতে লিবারেশনের প্রার্থীকে বামেরা সমর্থন করেছে । আমরা জিততে পারিনি সেটা বড় কথা নয়; এখানে ভোট পার্সেন্টেজ বেড়েছে । যদিও ফল আশানুরূপ নয় । আমরা কেন সিপিএমের সমস্ত ভোট পেলাম না, সেটা আলিমুদ্দিনকেও ভাবতে হবে, আমরাও ভাবছি ।"

এই বক্তব্যের অর্থ কী ? তাহলে কি বিজেপি-তৃণমূল বিরোধী বাকি শক্তিকে লিবারেশন একত্র করতে চাইছে না ? উত্তর - হ্যাঁ, চাইছে । তাঁদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, রাজ্য বামফ্রন্টের মতো তৃণমূল-বিজেপি বিরোধী 'সম্ভাব্য শক্তিকে' এককাট্টা করতে তারাও আগ্রহী । কিন্তু, চিন্তা বাড়িয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস । কারণ, রাজ্যে কংগ্রেসের বর্তমান সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বাংলার 294টি আসনেই প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে কথা বলেছেন ।

ETV BHARAT
কোন পথে যাবে কংগ্রেস (নিজস্ব চিত্র)

এরকম পরিস্থিতিতে বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বামেরা । কারণ, সে রাজ্যে বিজেপি, জেডিইউ-য়ের বিরূদ্ধে লালুর আরজেডি, কংগ্রেস, লিবারেশান, সিপিএম-সহ ইন্ডিয়া ব্লক এককাট্টা ছিল । ফলে, বিহারের অভিজ্ঞতা ও সেখানকার নির্বাচনী ফলাফল বাংলার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে । পরিস্থিতির কি বদল হবে ? বিহারের ফলাফলের পরও বঙ্গে বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী ঐক্য কি গুরুত্ব পাবে ? বামেরা কি পারবে কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসকের বিরুদ্ধে ঐক্যমত্য হতে ? এরকম একাধিক প্রশ্ন উঠে আসছে ।

এদিকে, এরই মধ্যে সিপিএমের মোদি-মমতার সেটিং তত্ত্বকে আজগুবি বলে উল্লেখ করে ধন্ধ বাড়িয়েছে লিবারেশন ৷ রাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে বোঝাপড়া রয়েছে । সেটিং আছে মমতা ও মোদির মধ্যে ! এই দাবি বরাবরই করে থাকেন বঙ্গের সিপিএম নেতারা । কিন্তু, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেই তত্ত্বকে 'আজগুবি' বলে দাবি করেছে সিপিআইএম লিবারেশন । তাদের রাজ্য মুখপত্র 'দেশব্রতী'র 6 নভেম্বরের সংখ্যায় 'বাংলায় চাই বামপন্থার পুনর্জাগরণ' শীর্ষক লেখায় এই দাবি করা হয়েছে । যা নিয়ে বামেদের অন্দরে চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে ।

লিবারেশনের মুখপত্রে ঠিক কী লেখা হয়েছে ?

সিপিআইএম লিবারেশন রাজ্য কমিটির তরফে কার্তিক পাল প্রকাশিত 'দেশব্রতী'র 6 নভেম্বর সংখ্যায় রাজ্যে বামপন্থার পুনর্জাগরণ কোন দিশায় এগোবে, সেই নিয়ে লেখা রয়েছে ৷ সেখানে কার্তিক পাল নিজেই লিখেছেন, "ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মূল রাজনৈতিক অভিমুখকে নিবদ্ধ রেখে, রাজ্য সরকারের যাবতীয় অন্যায়, জনবিরোধী পদক্ষেপ ও পলিসির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে নিয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন সংগঠিত করার পথেই এগোতে হবে । তৃণমূল-বিজেপি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, বা মোদি-মমতার আজগুবি 'সেটিং তত্ত্ব' শেষ বিচারে রাজ্যে বিজেপির জমিকেই শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাবে । বহু রক্ত ঝরা পথে, গরিব ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে, কয়েক দশকের লাগাতার আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে পশ্চিমবাংলা গোটা দেশের কাছে বামপন্থীদের এক শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয় । রাজ্য বিধানসভায় আজ একজন বামপন্থী বিধায়ক না-থাকলেও এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, আজও রাজ্যে বামপন্থীরা এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সামাজিক শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে ।"

এ বিষয়ে সিপিএম রাজ্য কমিটির সদস্য তথা এসএফআই সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, "কার্তিকবাবু বর্ষিয়ান নেতা । তিনি তাঁদের মুখপত্রে কী লিখেছেন সে বিষয়ে আমি জানি না । না-জেনে মন্তব্য করা ঠিক হবে না । তবে, পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে সারদা-নারদা থেকে শুরু করে একের পর এক ঘটনায় তৃণমূল এবং বিজেপির গোপন বোঝাপড়ার ইঙ্গিত আছে । এমনকি, এখন বিজেপি সাংসদরাও বলতে শুরু করেছেন, তৃণমূল নেতারাও বলতে শুরু করেছেন । পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে এটা মাথায় রাখা উচিত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আরএসএস দুর্গা আখ্যা দিয়েছিল । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আরএসএসকে দেশপ্রেমিক সংগঠন বলে অভিহিত করেছিলেন ।"

তবে, লিবারেশনের বক্তব্য আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ঐক্যে খুব একটা চিড় ধরাতে পারবে না বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন সৃজন । তিনি বলেন, "তৃণমূল-বিজেপি সেটিং থাকুক বা না থাকুক, তারা যে বাংলার সর্বনাশ করছে, সেবিষয়ে আমরা একমত । এই কমন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ঐক্য সুদূরপ্রসারী হবে বলে আমরা বিশ্বাসী ।"

সৃজনের মতো বাংলায় বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধতার প্রশ্নে একমত সিপিআইএমএল লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য পার্থ ঘোষও । তিনি বলেন, "এ রাজ্যে তৃণমূল এবং বিজেপি বিরোধিতায় আমাদের কোনও মতপার্থক্য নেই । কিন্তু, এমন কিছু করা যাবে না যেটায় বিজেপির মাটি শক্ত হবে । তাদের তৈরি বাইনারির বাইরে গিয়ে আমাদের গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে । শহরের বস্তিবাসীর কাছে পৌঁছাতে হবে । তাঁদের অভাব অভিযোগ, আমাদের নিয়ে তাঁদের কী মতামত, তা শুনতে হবে । তাঁদের অবস্থা বুঝতে হবে, তাঁদের সঙ্গে রাত কাটাতে হবে । মানুষকে আপন করতে হবে ! ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় বক্তব্য দিয়ে বামপন্থার কোনও উদযাপন সম্ভব হবে না । আশা করি আমরা তো বটেই, সমস্ত বামপন্থী দল এটা বুঝবে । মানুষের কাছে যদি পৌঁছানো না-যায়, তবে আগামীতে বাংলায় বামপন্থীদের অন্ধকার কাটবে না ।"

উভয় পক্ষের কথাতেই আগামীতে একে অপরের হাত ধরার ইঙ্গিত মিলেছে ৷ এবার কংগ্রেস কোন পথে হাঁটে, তা নিশ্চিত করতে সব দলেরই এখন পাখির চোখ বিহারের ফলাফল ৷