রাজ্যপাট হাতছাড়া হতেই সদর দফতর ছাড়ার নোটিশ তৃণমূলকে, অস্বস্তিতে মমতার দল
2022 সালে কলকাতার মেট্রোপলিটনে এই অস্থায়ী তৃণমূল ভবন হিসেবে একটি বাড়ি ভাড়া নেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল৷ সেই বাড়িই এবার ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন মালিক৷

Published : May 23, 2026 at 9:31 PM IST
কলকাতা, 23 মে: 15 বছর পর অবশেষে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে বাংলায়। 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পরপরই আরও এক বড়সড় ধাক্কার সম্মুখীন হল ঘাসফুল শিবির। এবার খোদ দলের অস্থায়ী সদর কার্যালয় বা ‘তৃণমূল ভবন’ ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ পেল দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
ইএম বাইপাসের ধারে মেট্রোপলিটন এলাকায় ভাড়া নেওয়া যে বহুতল ভবনটি এতদিন ধরে তৃণমূলের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, সেই বাড়ির মালিক ইতিমধ্যেই জায়গা খালি করার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। ভোটের ফল প্রকাশের পর ওই ভবনের বাইরে ভাঙচুর হওয়ার কারণেই নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সূত্রের খবর, এই বিলাসবহুল বহুতলটির মালিক রাজ্যের অন্যতম নামী ডেকরেটার্স সংস্থা ‘মডার্ন ডেকরেটার্স’-এর কর্ণধার মন্টু সাহা। তিনি নিজেই তৃণমূল নেতৃত্বকে মৌখিকভাবে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন। কবে ওই বহুতল ছাড়তে হবে, সেই সময়সীমাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। মন্টুবাবু নিজে এই নোটিশ দেওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং দলের পক্ষ থেকে তাঁকে সুস্পষ্টভাবে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে আগামী দু’মাসের মধ্যেই ওই বহুতলটি সম্পূর্ণভাবে ফাঁকা করে দেওয়া হবে।
রাজ্যে সদ্য রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। আর তার পরেই ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূলকে কেন এমন বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে মন্টু সাহা জানিয়েছেন যে এর নেপথ্যে কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি, চাপ বা অন্য কোনও কারণ নেই। তিনি বলেন, ‘‘গত 4 মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই ওই বাড়ির বাইরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। বাড়িটার কোনও ক্ষতি হলে তো লোকসান আমারই হবে। এর মধ্যে অন্য কোনও বিষয় নেই।”
মূলত নিজের সম্পত্তির নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই তিনি তৃণমূলকে এই বাড়িটি ছাড়তে বলেছেন। পাশাপাশি তিনি এও নিশ্চিত করেছেন যে চুক্তি অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া বাবদ যাবতীয় পাওনা টাকা তৃণমূল নেতৃত্ব সবসময় মিটিয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত কোনও ক্ষোভ নেই। এই বিষয়ে তৃণমূলের তরফে কারও কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি৷
উল্লেখ্য, 2021 সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব তপসিয়ায় অবস্থিত দলের পুরনো এবং মূল কার্যালয়টি সংস্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরনো ভবনটি ভেঙে সেখানে কর্পোরেট ধাঁচের আধুনিক নতুন বহুতল তৈরির কাজ শুরু হয়। সেই কারণেই বিকল্প কার্যালয় হিসেবে 2022 সালে ইএম বাইপাসের মেট্রোপলিটন এলাকার এই বহুতলটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মাত্র দু’বছরের চুক্তিতে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হলেও, পরবর্তীতে তপসিয়ার মূল ভবনের কাজ শেষ না হওয়ায় আরও দু’বছরের জন্য সেই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়।
ফলে গত চার বছর ধরে এই মেট্রোপলিটন ভবনটিই ছিল তৃণমূলের সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এই অস্থায়ী তৃণমূল ভবনেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আলাদা সুসজ্জিত ঘরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। দলের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠক, নির্বাচনী রণনীতি নির্ধারণ এবং সাংবাদিক সম্মেলন এই বাড়ি থেকেই করা হতো। প্রতিদিন দলের প্রথম সারির নেতা, বিধায়ক ও মন্ত্রীরা এখানে আসতেন। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়টি মূলত পরিচালনা ও দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি এবং সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার।
2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। শাসনক্ষমতা হারানোর পর এমনিতেই ব্যাকফুটে রয়েছে তৃণমূল শিবির। তার ওপর দলের মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষ বা এই অস্থায়ী ভবনটি ছেড়ে দিতে হওয়ায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব। তপসিয়ার মূল ভবনের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার আগেই মেট্রোপলিটনের এই বাড়ি ছাড়তে হওয়ায় আগামিদিনে তৃণমূলের যাবতীয় কাজকর্ম কোথা থেকে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। দু'মাসের মধ্যে নতুন কোনও উপযুক্ত অস্থায়ী আস্তানা খুঁজে না পেলে ঘাসফুল শিবিরের সাংগঠনিক কাজে বড়সড় ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

