খুনের মামলার আসামি অমিত শাহ! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিশানা কুণাল ঘোষের
মঙ্গলবার কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করে দুর্নীতি ও নেতাদের জেলযাত্রা নিয়ে সরব হন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ৷ তার পরই পাল্টা জবাব দিয়েছেন কুণাল ঘোষ৷

Published : December 30, 2025 at 2:36 PM IST
কলকাতা, 30 ডিসেম্বর: কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বঙ্গ সফর ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠল রাজ্য রাজনীতি। মঙ্গলবার কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করে শাহ সরাসরি রাজ্যের শাসক দল এবং তৃণমূল নেতাদের নাম করে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার পরেই নজিরবিহীন ভাষায় পাল্টা আক্রমণ শানালেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তথা মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। অমিত শাহের অতীত প্রসঙ্গ টেনে কুণাল ঘোষ বলেন, “খুনের মামলার আসামি অমিত শাহ। যখন উনি জেলে ছিলেন, তখন খুনের মামলার আসামি। তার কাছ থেকে জেলের কথা শুনব?”
এদিন শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন অমিত শাহ। সাংবাদিক বৈঠকে অনুপ্রবেশ থেকে দুর্নীতি, একাধিক ইস্যুতে তিনি তোপ দাগেন। শাহ অভিযোগ করেন, “অনুপ্রবেশ ছাড়াও দুর্নীতিতে বাংলার মানুষ অতিষ্ঠ। রোজ ভ্যালি চিটফান্ড কেলেঙ্কারি, সারদা কেলেঙ্কারি, এসএসসি (SSC) দুর্নীতি, পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি, গরু পাচার, রেশন দুর্নীতি, পিডিএস দুর্নীতি, মনরেগা দুর্নীতি, পিএম আবাস দুর্নীতি - এত এত কেলেঙ্কারি যে আমি পুরো তালিকা পড়লে প্রেস কনফারেন্সের সময় তাতেই চলে যাবে।”
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে শাহ বলেন, “এখন কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর জবাব দিতে পারবেন যে আপনার মন্ত্রীদের বাড়ি থেকে 27 কোটি টাকা নগদ পাওয়া যায়! টাকা গুনতে গুনতে মেশিন গরম হয়ে বন্ধ হয়ে যায়! বাংলার মতো গরিব রাজ্যে 27 কোটি, 20 কোটি, 15 কোটি নগদ পাওয়া যাচ্ছে - আপনার কোনও দায়বদ্ধতা নেই?” তৃণমূলের একাধিক নেতা ও মন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে শাহ বলেন, “পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জেলে, অনুব্রত মণ্ডল জেলে... ফিরহাদ হাকিম - তাঁকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে, শোভন চট্টোপাধ্যায় অভিযুক্ত।”
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কুণাল ঘোষের জেলে থাকার প্রসঙ্গও তোলেন। তৃণমূল নেতাদের জেল খাটা প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “আপনারা চোখ বন্ধ করে বসে আছেন দুর্নীতির জন্য। কিন্তু বাংলার জনতা চোখ বন্ধ করে বসে নেই।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আক্রমণের পরেই পাল্টা জবাব দেন কুণাল ঘোষ। অমিত শাহের সফরকে ‘ব্যর্থ হতে চলা বঙ্গ সফর’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “শুনলাম খুব আক্রমণ করেছেন এবং আমার নামও উচ্চারণ করেছেন। আমি প্রথমেই বলি, এরা খুনের মামলার আসামি হয়ে জেলে ছিল। তার কাছ থেকে জেলের কথা শুনব?”
আইনি প্রক্রিয়া ও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে কুণাল ঘোষ বলেন, “মামলা কীভাবে এগিয়েছে, সেগুলো সারা দেশের লোক জানেন। তো সময় দিন না, তারপর দেখতে পাবেন। আর মানুষও জানেন, যাঁরা তদন্তকারী অফিসার তাঁরা জানেন, যাঁরা বিচারক ... যে আমি আদৌ অপরাধী না নিরাপরাধ, আমার একাধিক মামলা শেষ হতেও শুরু করেছে। ফলে এইসব কুৎসা গায়ে লাগছে না, যুক্তি দিয়ে কথা বলুন।”

দুর্নীতির অভিযোগ উড়িয়ে দিতে গিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে দলবদল এবং ‘ওয়াশিং মেশিন’ তত্ত্ব তুলে ধরেন কুণাল। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, “যাঁদের দিকে আঙুল তুলেছেন দুর্নীতিগ্রস্ত বলে, ভিডিয়ো দেখিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে, আজকের যিনি বিরোধী দলনেতা, যাঁকে পাশে বসিয়ে আপনি সাংবাদিক বৈঠক করছেন, তাঁকেও ক্যামেরার সামনে টাকা নিতে দেখা গিয়েছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘একই ঘটনা অন্য রাজ্যেও ঘটেছে। মহারাষ্ট্র, সারা দেশে, অসম, যাঁদের আপনারা দলে নিয়েছেন তাঁদের এগেনস্টে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি রয়েছে। তাঁদেরকেই ওয়াশিং মেশিন বিজেপিতে নিয়ে, তাঁদেরকেই পদ দিয়ে আবার বড় বড় কথা বলছেন? যাঁদের ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে টাকা নিচ্ছে, তাঁদের নিয়ে বসে আছেন, আপনি আবার অন্যদের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন?”
পাশাপাশি, অনুপ্রবেশ ইস্যুতে অমিত শাহের তোলা অভিযোগের জবাবে কুণাল ঘোষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “অনুপ্রবেশ? আপনি মশাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার বিএসএফ। অনুপ্রবেশ হলে আপনি ব্যর্থ।” ত্রিপুরা প্রসঙ্গ টেনে তাঁর সংযোজন, “ত্রিপুরায় অনুপ্রবেশ নেই? মিথ্যা কথা বলছেন। কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে, বাংলাদেশি ধরা পড়েছে। ত্রিপুরাতেও আছে অনুপ্রবেশ।”
সবশেষে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে এবং অমিত শাহকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তৃণমূল মুখপাত্র বলেন, “আমি কুণাল ঘোষ, জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি। জেল খুনের মামলায় জেল খাটা মামলার আসামি, জেলে ছিলেন খুনের মামলায়, ঘটনাচক্রে আজকে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। কথা বলবেন, ভেবেচিন্তে কথা বলবেন।”

অমিত শাহের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূলের নেত্রী শশী পাঁজা৷ এদিন রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি এবং নারী সুরক্ষা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তারই পালটা জবাব দিয়েছেন রাজ্যের নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী৷
তিনি বলেন, ‘‘অমিত শাহ প্রেস কনফারেন্সে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করেছেন। আপনারা কি জানেন, 2011 থেকে 2025 - মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় এগিয়েছে। এই মুহূর্তে রাজ্যের জিডিপি (জিএসডিপি) দেশের থেকে বেশি।" শিল্প দফতরের মন্ত্রী হিসেবে তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন, "মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে 13.8 লক্ষ কোটি টাকা নিবেশ (বিনিয়োগ) হয়েছে এখানে?” তিনি জানান, রেল ওয়াগন, সিমেন্ট, পেন্টস, আয়রন অ্যান্ড স্টিল এবং রিলায়েন্সের মতো বড় বড় সংস্থা এ রাজ্যে বিনিয়োগ করেছে।
শশী পাঁজা আরও দাবি করেন, “এমএসএমই (MSME)-র ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সারা ভারতবর্ষে। কিছু বলবেন? এটা বললেন না কেন?” তাঁর মতে, কেন্দ্র বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে রাখলেও লগ্নিকারীরা বাংলার মাটিকেই বেছে নিচ্ছেন। এর থেকেই প্রমাণ হয় বাংলা দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।
নারী সুরক্ষা ইস্যুতে রাজ্য সরকারকে সবথেকে বেশি আক্রমণ করেন অমিত শাহ। এর জবাবে শশী পাঁজা বলেন, “নারী সুরক্ষা নিয়ে যেন ভারতীয় জনতা পার্টি চেষ্টাই না করে বলতে।” তিনি রাজ্যের উৎসবের দিনগুলোর উদাহরণ টেনে জানান, কলকাতা তথা বাংলায় মহিলারা দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে বড়দিন - এমনকি আসন্ন বর্ষবরণের রাতেও নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “মানুষ, কোটি কোটি মানুষ এবং মহিলারা নির্বিঘ্নে ঘুরলেন। কোনও ঘটনা শুনলেন কি? কোনোরকম নির্যাতন শুনলেন কি? শুনবেন না।”

পাশাপাশি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলির নারী সুরক্ষার রেকর্ড নিয়ে পাল্টা তোপ দাগেন শশী। তিনি বলেন, “ভারতীয় জনতা পার্টি কী করে? আপনারা কুলদীপ সিং সেঙ্গারকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন, যিনি ধর্ষণ করেছেন। আপনি বিলকিস বানুর যে ধর্ষণ করেছে, তাদেরকে 'সংস্কারি' বলবেন, মালা পরাবেন।” অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগিরদের ওপর হওয়া যৌন হেনস্তার ঘটনায় বিজেপি কেন নীরব ছিল, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। শশী পাঁজা স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলায় নারী নির্যাতনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় এবং বিধানসভায় পাস হওয়া ‘অপরাজিতা বিল’ আটকে রাখার জন্য তিনি সরাসরি বিজেপিকেই দায়ী করেন।
অমিত শাহ তাঁর বক্তব্যে আয়ুষ্মান ভারত এবং পিএম কিষাণ সম্মান নিধি নিয়ে রাজ্যকে বিঁধেছেন। যদিও শশী পাঁজার বক্তব্যে এর সরাসরি উত্তর না-থাকলেও, তিনি সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রের বঞ্চনার অভিযোগ তুলে বলেন, “আপনারা তো টাকা দেন না, বাংলার প্রাপ্য টাকা দেন না।” তাঁর মতে, সত্যকে এড়িয়ে বা চাপা দেওয়া যায় না এবং অমিত শাহ বারবার বাংলায় এসে বাংলাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছেন।

