ETV Bharat / politics

মৌসমের কংগ্রেসে ঘর ওয়াপসি-তে বিধানসভা ভোটের আগে কি মালদায় চাপে তৃণমূল

তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে ফিরেছেন মৌসম নুর৷ এর ফলে মালদায় কি তৃণমূল কংগ্রেসের চাপ বাড়ল?

MAUSAM NOOR
মৌসম নুর৷ (ফাইল ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : January 4, 2026 at 9:53 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 4 জানুয়ারি: “মৌসম বদল রহা হ্যায়৷” কোতওয়ালির খান চৌধুরি পরিবারের সদস্য মৌসম নুরের ঘর ওয়াপসির পর এটাই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষনেতা তথা প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশের৷ একজনের প্রত্যাবর্তনেই কি দলের মৌসম বদলে যাবে? নাকি ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে আরও অনেক মৌসম পুরনো দলে ফিরে আসবেন৷ সেটাই এখন প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলের৷

মালদার রাজনৈতিক মহলের অনুমান, নির্বাচনের মুখে মৌসমের ঘাসফুল ছেড়ে দেওয়া রাজ্যের শাসকদলকে এই জেলায় কিছুটা সমস্যায় ফেলতে পারে৷ সমস্যা কিছুটা যে হবে, সেটা মেনে নিচ্ছেন তৃণমূলের মালদা জেলার একাধিক নেতাও৷ যদিও জেলার তৃণমূলের একাংশ মনে করছেন, মৌসম থাকাকালীন দলের তেমন উপকার হচ্ছিল না৷ বরং তিনি দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলেন৷ তার থেকে তাঁর না-থাকাটা দলের পক্ষে উপকারী হবে৷ তাঁর দলত্যাগ আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ে কোনও প্রভাব ফেলবে না৷

2019 সালের জানুয়ারি মাস৷ কিছুদিন পরেই লোকসভা নির্বাচন৷ মৌসমকে সামনে রেখেই নির্বাচনী ঘুঁটি সাজায় কংগ্রেস৷ কিন্তু সেই দাবার বোর্ডকে ছিন্নভিন্ন করে মৌসম চলে যান তৃণমূলে৷ ঘাসফুলের টিকিটে মালদা উত্তর কেন্দ্রে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন৷ কিন্তু আগের দু’টি লোকসভা নির্বাচনে সেখানকার ভোটাররা তাঁকে দু’হাতে আশীর্বাদ করলেও ঊনিশের ভোটে ঘাসফুলের মৌসমকে তাঁরা খালি হাতে ফিরিয়ে দেন৷ ভোটে হারের পর তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করে দিল্লি পাঠান৷ আগামী এপ্রিলে সাংসদ থাকার মেয়াদ শেষ হবে তাঁর৷ কিন্তু ততদিন অপেক্ষা করেননি তিনি৷ গতকাল, শনিবারই দিল্লিতে পুরনো ঘরে প্রত্যাবর্তন করেছেন মালদা জেলার রাজনীতির এই ‘গ্ল্যামার গার্ল’৷

একসময় মৌসম ছিলেন রাহুল গান্ধির যুব ব্রিগেডের অন্যতম মুখ৷ তাঁর দলত্যাগের পর ক্ষুব্ধ রাহুল বঙ্গের প্রদেশ নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহি চেয়েছিলেন, কেন মৌসমকে দলে ধরে রাখা গেল না৷ গতকাল সেই মৌসমের প্রত্যাবর্তনের পর এখনও পর্যন্ত রাহুল গান্ধির কোনও প্রতিক্রিয়া না-পাওয়া গেলেও জয়রাম রমেশ, শুভঙ্কর সরকারদের প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দিয়েছে, এখনও কংগ্রেসে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে৷ এবং সেটা ভালোভাবেই৷

গতকাল দিল্লিতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মৌসম জানিয়েছেন, তাঁর তৃণমূলে যোগদানের পর পরিবারের মধ্যে একটা অদৃশ্য গণ্ডির ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছিল৷ মালদার মানুষ চাইছিলেন, বরকত গনি খানের পরিবার ফের এক হোক৷ প্রয়াত মামার উত্তরাধিকার রক্ষার জন্যই তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ৷ সেই কারণেই তিনি কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন করলেন৷ তৃণমূল তাঁকে কাজ করার অনেক সুযোগ দিয়েছে৷ তার জন্য তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে কৃতজ্ঞ৷ তিনি তৃণমূল ছাড়লেও ঘাসফুলের কোনও ক্ষতি হবে না৷ তবে কংগ্রেস শক্তিশালী হবে৷

মৌসমের উপস্থিতিতে মালদা জেলায় দলের শক্তি যে এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গেল, তা নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই কংগ্রেসের মালদা জেলার সহ-সভাপতি মোত্তাকিন আলমের৷ ইটিভি ভারতকে তিনি বলেন, “মালদা জেলার রাজনীতি এখনও বরকত গনি খানের নামে চলে৷ মালদার মানুষ এখনও বরকতদার মতোই তাঁর উত্তরসূরীদের উপর বিশ্বাস করেন, ভরসা করেন৷ গত লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণ মালদার মানুষ তার প্রমাণ দিয়েছেন৷ আমরা নিশ্চিত, মানুষ মৌসমের উপরেও নিজেদের বিশ্বাস, ভরসা রাখবেন৷ কোনও কারণে তিনি তৃণমূলে চলে গিয়েছিলেন৷ নিজের ভুল বুঝে দলে ফিরে এসেছেন৷ কংগ্রেস একটি বড় পরিবার৷ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েই থাকে৷ পরে সবাই মিলে যান৷ ছাব্বিশের নির্বাচনে এই জেলায় ইশা খান চৌধুরীর সঙ্গে মৌসম নুরও বড় ফ্যাক্টর হতে চলেছেন৷”

একথা ভুললে চলবে না, মালদা জেলায় তৃণমূলের রমরমা কিন্তু এই মৌসমের হাত ধরেই এসেছে৷ দলের জেলা সভানেত্রী থাকাকালীন তাঁর নেতৃত্বেই একুশের বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিল তৃণমূল৷ তার আগে শুধুমাত্র একবার তৎকালীন আড়াইডাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্রে জোড়া ফুলের প্রার্থী হিসাবে জিতেছিলেন সাবিত্রী মিত্র৷ বাকি সবটাই ছিল তৃণমূলের অস্বস্তি৷ মৌসমের নেতৃত্বে ভোটে লড়ে একুশের নির্বাচনে তৃণমূল জেলার আটটি কেন্দ্রে জয়লাভ করে৷

রবিবার সেটাই বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা৷ তাঁর কথায়, “এখনও গ্রামেগঞ্জে যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে মৌসমের৷ একথা অস্বীকার করা যাবে না৷ তাঁর উপস্থিতিই অনেক জায়গায় ভোটারদের মন বদলে দিতে পারে৷ বর্তমান জেলা সভাপতি আবদুর রহিম বকসি, মৌসমের তৈরি করা ভিতের উপরেই দল পরিচালনা করছেন৷ তবে রাজ্যসভার সাংসদ থাকলেও কিছুদিন ধরে মৌসম নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন৷ গ্রামগঞ্জের মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ কমেছে তাঁর৷ তাই কংগ্রেসে ফিরলেও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে তিনি কতটা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে৷ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কংগ্রেস ছেড়ে বেশ কয়েক বছর তৃণমূলে থাকার পর পুরনো দলে ফিরলেও মানুষ আর তাঁর উপর আগের মতো বিশ্বাস রাখতে পারবেন তো? সময় এর উত্তর দেবে৷ তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তাঁর দলত্যাগ কিছুটা হলেও আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়াল৷”

যদিও তৃণমূলের জেলা মুখপাত্র আশিস কুণ্ডুর দাবি, মৌসমের দলত্যাগে আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের কোনও ক্ষতি হবে না৷ তিনি বলেন, “মৌসমের মা রুবি নুর প্রয়াত হওয়ার পর সুজাপুর কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমূল কোনও প্রার্থী দেয়নি৷ রুবি নুরকে সম্মান জানাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন৷ আজ মৌসম সেসব ভুলে গিয়েছেন৷ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি প্রয়াত হওয়ার পর মালদা উত্তর কেন্দ্রে মৌসমকে প্রার্থী করে তাঁর দল৷ কংগ্রেসকে সম্মান জানাতে ওই নির্বাচনেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও প্রার্থী দেননি৷ শুভেন্দু অধিকারীর হাতে তামাক খেয়ে আজ তিনি কংগ্রেসে যোগ দিলেন৷’’

আশিস কুণ্ডু আরও বলেন, ‘‘এসআইআর-এর নামে বিজেপি যখন বাংলার মানুষের ভোটাধিকার হরণ করতে চাইছে, তখন সাংসদ মৌসমের মুখ থেকে এই নিয়ে একটি কথাও শোনা যায়নি৷ রাজ্যসভার সাংসদের মেয়াদ যখন শেষ হতে যাচ্ছে, তখন তিনি অন্য দলে পালিয়ে গেলেন৷ হয়তো সোনিয়াজিকে ভুল বুঝিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে আবার রাজ্যসভার সাংসদ হতেই তিনি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন৷ এর আগে শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরেই রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন এই মৌসম৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভুল বুঝিয়ে ছ’বছর তিনি সাংসদের সুবিধে ভোগ করলেন৷ এরা আসলে সুবিধাবাদী৷’’

তৃণমূলের এই নেতার আরও বক্তব্য, ‘‘আমরা কখনও দেখিনি, তৃণমূলের জন্য মৌসম লড়াই-আন্দোলন সংগঠিত করেছেন৷ আঠারোর পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই জেলার প্রতিটি প্রান্তে যখন তৃণমূলের পতাকা উঠেছিল, মৌসম বুঝেছিলেন তাঁর কংগ্রেসের খাওয়া শেষ৷ তাই তিনি শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে তৃণমূলে চলে আসেন৷ ঊনিশে তৃণমূলে ঢুকেই তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হলেন৷ বরকত গনি খান চৌধুরীকে সম্মান জানাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে উজার করে দিয়েছিলেন৷ আজ তিনি বরকতদার উত্তরাধিকারের কথা বলছেন? বরকতদা বলেছিলেন, সিপিআইএম-এর মতো জগদ্দল পাথরকে সরাতে পারবে এই মমতাই৷ সিপিআইএমকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করতে পারবে৷ সেই সিপিআইএম-এর সঙ্গে হাত মেলানো দল কংগ্রেসে গিয়ে তিনি এখন বরকতদার উত্তরাধিকারের কথা বলছেন? এঁরা শুধু নিতেই এসেছেন৷”

আরও পড়ুন -

  1. মালদায় 'মৌসম' বদল ! ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে নূর