ETV Bharat / politics

আহত বাঘ আরও ভয়ঙ্কর ! কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে দিল্লি চলোর ডাক মমতার

আইপ্যাকে ইডি হানা ও ভোটার তালিকা নিয়ে আক্রমণাত্মক সুর মুখ্যমন্ত্রীর গলায় ৷ জানিয়ে দিলেন যে, তাঁর পরবর্তী গন্তব্য নির্বাচন কমিশন ।

ETV BHARAT
যাদবপুর থেকে হাজরা মিছিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (চিত্র: সোশাল মিডিয়া)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : January 9, 2026 at 7:49 PM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 9 জানুয়ারি: এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনে তথ্য যাচাইয়ের নামে সাধারণ মানুষের হয়রানি নিয়ে আগেই নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি জানিয়েছিলেন, দলের প্রতিনিধি দলের পর প্রয়োজন হলে খোদ নেত্রী অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দিল্লিতে গিয়ে কমিশনের মুখোমুখি হবেন । সেই হুঁশিয়ারিই এবার বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে । বৃহস্পতিবার আইপ্যাকের অফিসে ইডি হানার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই হাজরা মোড়ের প্রতিবাদ সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য নির্বাচন কমিশন ।

একদিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির 'অতিসক্রিয়তা' এবং অন্যদিকে ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ - এই দুই ইস্যুকে হাতিয়ার করে এবার সরাসরি দিল্লি দরবারের ডাক দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো । হাজরা মোড়ের সভায় দাঁড়িয়ে তিনি যে ভাষায় নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন, তা সাম্প্রতিক অতীতে নজিরবিহীন ।

ETV BHARAT
হাজরার সভায় মমতা (নিজস্ব চিত্র)

ইডি হানা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’

শুক্রবারের বারবেলায় হাজরা মোড়ের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মাইক্রোফোন হাতে নিলেন, তখন তাঁর গলায় ছিল যুদ্ধের সুর । আইপ্যাকের অফিসে ইডি হানাকে তিনি সরাসরি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘তথ্য চুরির ষড়যন্ত্র’ বলে অভিযোগ করেন । তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করতেই এই হানা ।

তিনি বলেন, “আইপ্যাককে আমরা অথরাইজ করেছি । ওরা আমাদের আইটি সেল দেখার কাজ করে । সেখানে ইডি 6টা থেকে ঢুকেছে, আমি পরে খবর পেয়েছি । ওরা আসলে ভোটার তালিকার ডেটা, বিএলএ-দের তালিকা এবং সাধারণ মানুষের দরখাস্ত চুরি করতে গিয়েছিল । সাড়ে 5 ঘণ্টা ধরে ওরা সব চুরি করেছে ।”

‘তথ্য চুরির ষড়যন্ত্র’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই চুরির মূল উদ্দেশ্য হল নির্বাচনের আগে তৃণমূলের পোলিং ম্যানেজমেন্টকে ভন্ডুল করে দেওয়া । তিনি জানান, নরেন্দ্র মোদি যখন 2014 সালে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন এই আইপ্যাকই তাঁর হয়ে কাজ করেছিল । তখন দোষ ছিল না, আর এখন তৃণমূলের হয়ে কাজ করলেই যত সমস্যা । মমতার কথায়, “চোরের মতো কেন এসেছো ? তুমি চুরি করে সব মানুষের এসআইআর-এর ডাটা তুলে নিয়ে যাচ্ছো ।”

এসআইআর-এ হেনস্তার অভিযোগ

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ আরও গুরুতর । তিনি অভিযোগ করেন, বেছে বেছে 54 লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে । এর মধ্যে বড় অংশই মহিলা, সংখ্যালঘু এবং নতুন ভোটার । এসআইআর সেন্টারে সাধারণ মানুষকে হেনস্তার যে অভিযোগ উঠেছে, সেবিষয়ে তিনি বলেন, “এসআইআর সেন্টারে সাধারণ মানুষকে ডেকে পাঠাচ্ছে, কিন্তু রিসিট দিচ্ছে না । 90 বছরের বৃদ্ধা, নাকে নল লাগানো অসুস্থ রোগী, অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের তিন তলায় উঠতে বাধ্য করা হচ্ছে । এটা কি ধরনের যাচাই ? এটা তো অত্যাচার !”

ETV BHARAT
কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে দিল্লি চলোর ডাক মমতার (নিজস্ব চিত্র)

তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি পরিকল্পনা করে একটি নির্দিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে এই নামগুলো বাদ দিয়েছে । বিশেষ করে মহিলাদের নাম বাদ দেওয়া নিয়ে তিনি ক্ষোভ উগরে দেন । মমতা বলেন, “মেয়েদের বিয়ে হলে পদবি পরিবর্তন হয়, ঠিকানা বদল হয় । এটা আমাদের পরম্পরা । কিন্তু সেই অজুহাতে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে । এমনকি নামের বানান ভুল বা প্রপার নাউনের সামান্য হেরফেরের কারণেও নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে । এটা কি গণতন্ত্র ?”

নিশানা ‘ভ্যানিশ কুমার’

বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে একাসনে বসিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কমিশন এখন বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে চলছে । নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যিনি কমিশনের দায়িত্বে এসেছেন, তিনি আগে অমিত শাহের দফতরের সেক্রেটারি ছিলেন । আমার তাতে আপত্তি নেই । কিন্তু তিনি যদি ‘ভ্যানিশ কুমার’ হয়ে ভোট ভ্যানিশ করে দেন, তবে আমরা চুপ থাকব না ।”

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশন তাঁকে আটকাতে পারবে না । তাঁর কথায়, “নির্বাচন কমিশন আমাকে কী করবে ? ঘেঁচু করবে । আমি আগেও বলেছি, সুস্থ বাঘের থেকেও আহত বাঘ আরও ভয়ঙ্কর । তুমি আমাকে একদিন আটকাবে, আমি 100 দিনের ফসল তুলে নেব ।” বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, তারা আসলে ‘জুমলা পার্টি’ এবং ‘ঝামেলার পার্টি’। যারা গান্ধিজি, নেতাজি, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিতে চায়, তারা আসলে বাংলাকেই চেনে না ।

'ডেস্টিনেশন নির্বাচন কমিশন'

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দেন যে, এই লড়াই আর শুধুমাত্র বাংলার মাটিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না । অভিষেকের দেখানো পথেই তিনি এবার দিল্লিতে কমিশনের সদর দফতরে গিয়ে জবাব চাইবেন । তিনি বলেন, “আমাদের পরবর্তী ডেস্টিনেশন নির্বাচন কমিশন । আমরা বসে বসে ললিপপ খাব না । তোমরা যদি ভাব আর্মি, বিএসএফ, সিআরপিএফ দিয়ে ভোট করাবে, তবে জেনে রাখো বাংলা তোমাদের সেই সুযোগ দেবে না ।”

তিনি দলীয় কর্মীদের নির্দেশ দেন, প্রতিটি ব্লকে ব্লকে এসআইআর সেন্টারে যাঁদের নাম ওঠেনি, তাঁদের নাম তোলার ব্যবস্থা করতে হবে । প্রয়োজনে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে । তিনি বলেন, “বিজেপি ভাবছে জোর করে বাংলা দখল করবে । কিন্তু বাংলা নামটা শুনলেই ওদের গায়ে জ্বালা ধরে । মনে রাখবেন, আঘাত করলে প্রত্যাঘাত কী করে করতে হয়, তা আমরা জানি ।”

'আঘাত করলেই আমার পুনর্জন্ম'

এদিনের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ব্যক্তিগত লড়াইয়ের কথাও তুলে ধরেন । হাজরা মোড়েই অতীতে সিপিএমের আমলে তাঁর উপর হওয়া প্রাণঘাতী হামলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আমার মাথায় যখন ডান্ডা মেরেছিল, তখন রক্ত গলগল করে বেরোচ্ছিল । আমার হাতের হাড় থেঁতলে গিয়েছিল । কিন্তু আমি দমে যাইনি । আমাকে আঘাত না করলে আমি যেন ঘুমিয়ে পড়ি । আঘাত করলেই আমার পুনর্জন্ম হয় ।”

পেনড্রাইভ-তথ্য ফাঁসের হুঁশিয়ারি

পেনড্রাইভ ভর্তি তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি । নাম না করে শুভেন্দু অধিকারী ও অমিত শাহের যোগসাজশে কয়লা ও অন্যান্য দুর্নীতির টাকা লেনদেনের অভিযোগও তোলেন । তিনি বলেন, “আমি সৌজন্যতা দেখাই, কিন্তু লক্ষ্মণরেখা পার হলে আমিও ছেড়ে কথা বলব না ।” মমতার কথায়, “শুনুন, আপনাদের এখনও ভাগ্য ভালো, আমি চেয়ারে আছি বলে ওই পেনড্রাইভগুলো এখনও বাইরে বের করে দিইনি । আমার কাছে সব পেনড্রাইভ করা আছে । বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু ভান্ডা ফাঁস করে দেব ।”

মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কয়লা বা দুর্নীতির টাকা আসলে ‘গদ্দার’দের হাত ঘুরে দিল্লিতে অমিত শাহের কাছে পৌঁছায় । এই প্রসঙ্গেই তিনি শুভেন্দু ও জগন্নাথের নাম করে বলেন, “জগন্নাথ ধামের জগন্নাথ নয়, বড় ডাকাত জগন্নাথ বিজেপির । জগন্নাথের থ্রু-তে টাকা যায় শুভেন্দু অধিকারীর কাছে, আর শুভেন্দুর থ্রু-তে টাকা যায় অমিত শাহের কাছে ।”

সব মিলিয়ে, হাজরা মোড়ের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিলেন । ইডি হানাকে তিনি হাতিয়ার করলেন দলের কর্মীদের চাঙ্গা করতে ৷ দিল্লি অভিযানের ডাক দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, লড়াইয়ের ময়দান এবার প্রসারিত হচ্ছে জাতীয় স্তরে । অভিষেকের শুরু করা লড়াইকে তিনি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন, যা আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে ।

আরও পড়ুন: