প্রধানমন্ত্রী পারলে কমিশন পারবে না কেন? পরিযায়ীদের 'ভার্চুয়াল শুনানি'র দাবি অভিষেকের
দলের প্রায় এক লক্ষ বিএলএ এবং পদাধিকারীদের সঙ্গে মেগা ভার্চুয়াল বৈঠকে কড়া বার্তা দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ।

Published : December 28, 2025 at 8:05 PM IST
কলকাতা, 28 ডিসেম্বর: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি বাংলায় সশরীরে উপস্থিত না-থেকেও ভার্চুয়াল সভা করতে পারেন, তবে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কেন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে 'ভার্চুয়াল শুনানি' বা 'ভার্চুয়াল হিয়ারিং'-এর ব্যবস্থা করা যাবে না ? রবিবার দলের প্রায় এক লক্ষ বিএলএ (BLA) এবং পদাধিকারীদের সঙ্গে মেগা ভার্চুয়াল বৈঠকে এই প্রশ্নই তুললেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় । সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য অহেতুক চাপ দেওয়া আসলে তাঁদের ভোটাধিকার হরণের একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত ।
রবিবার বিএলএ-2, ব্লক, টাউন এবং ওয়ার্ড ইলেকট্রোরাল রোল সুপারভাইজারদের নিয়ে একটি বিশেষ ভার্চুয়াল কনফারেন্স করেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক । সেখানেই তিনি জানিয়ে দেন, এখন সম্পূর্ণ 'যুদ্ধকালীন' পরিস্থিতি । বিজেপিকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়া যাবে না । অভিষেকের কড়া নির্দেশ, প্রতিটি শুনানিতে বিএলএ-2-দের উপস্থিত থাকতেই হবে । যদি কোথাও তাঁদের আটকানো হয় বা কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়, তবে দল তৎক্ষণাৎ আইনি ব্যবস্থা নেবে । তিনি কর্মীদের আশ্বস্ত করে বলেন, "আমাদের লড়াই আইনি পথেও চলবে । প্রধানমন্ত্রী যদি প্রযুক্তির ব্যবহার করে মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেন, তবে কমিশন কেন সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুনানির কাজ সহজ করবে না ?"
পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে এদিন একযোগে সুর চড়ান অভিষেক । তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী পরিবারের সদস্য, বাবা-মা বা স্ত্রী ফর্ম জমা দিতে পারেন বা শুনানিতে অংশ নিতে পারেন । কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় বিএলও বা আধিকারিকরা মৌখিকভাবে দাবি করছেন যে, সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে সশরীরে হাজির থাকতেই হবে । এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক চক্রান্ত দেখছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ ।
তাঁর কথায়, দিল্লি ও হরিয়ানাতেও বিজেপি ঠিক এই একই কৌশল নিয়েছিল মানুষকে ভোট থেকে দূরে রাখতে । তিনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, "কোথায় লিখিত নির্দেশ আছে যে সশরীরে আসতেই হবে, সেই নোটিশ আমাদের দেখান । মুখের কথায় কাজ হবে না । প্রয়োজনে আমরা এই ইস্যু নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হব ।"
শুধু পরিযায়ী শ্রমিক নয়, বয়স্ক নাগরিকদের হয়রানি নিয়েও এদিন সরব হন অভিষেক । তাঁর যুক্তি, নির্বাচন কমিশন যদি আশি-ঊর্ধ্ব বা অসুস্থ নাগরিকদের জন্য বাড়ি থেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে, তবে ভোটার তালিকার শুনানির জন্য কেন কমিশন আধিকারিকরা বাড়িতে যেতে পারবেন না ? কেন বয়স্ক মানুষকে এই রোদে বা ভিড়ে বিডিও অফিসে গিয়ে লাইন দিতে হবে ? তিনি জানান, এই হয়রানির প্রতিবাদে সোমবারই তৃণমূলের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হবে । পাশাপাশি, আগামী 31 ডিসেম্বর তিনি নিজেও কমিশনে যাবেন 1 কোটি 36 লক্ষ নামের তথাকথিত 'যৌক্তিক অসঙ্গতি' বা লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলতে ।
বিজেপির তোলা এক কোটি বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা ভোটারের অভিযোগকে এদিন 'ফাঁকা আওয়াজ' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অভিষেক । তাঁর দাবি, কমিশন নিজেই বিজেপির এই দাবির বেলুন ফুটো করে দিয়েছে, কারণ গেরুয়া শিবিরের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনও তালিকাই নেই । তারা শুধুই হাওয়ায় কথা বলছে । কর্মীদের প্রতি তাঁর নির্দেশ, শুনানির দিন প্রয়োজনে নিজেদের উদ্যোগে টোটো বা গাড়ির ব্যবস্থা করে মানুষকে সেন্টারে নিয়ে যেতে হবে । নিশ্চিত করতে হবে যাতে একজন প্রকৃত ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ না যায় ।
তিনি বলেন, "বিজেপির খেলার মাঠ, আম্পায়ার, ব্যাট, বল সব থাকতে পারে, কিন্তু তৃণমূলের মতো পরিশ্রমী কর্মী ওদের নেই । বুথ কর্মীরাই দলের আসল সম্পদ ।" বৈঠকের শেষে কর্মীদের চাঙ্গা করতে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এই বছর কোনও পিকনিক হবে না । নির্বাচনের পর হবে 'জয় যাত্রা'। দিদি চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী হলে তিনি নিজে কর্মীদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন অভিষেক । তাঁর কথায়, "যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা ।"
রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলাকালীন এক বিএলও (BLO)-র অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে হাতিয়ার করে রবিবার জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং ভারতীয় জনতা পার্টিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানান ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ । রবিবার এই বৈঠকের আগে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে করা পোস্টে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ তোলেন যে, নির্বাচন কমিশনের অমানবিক চাপের মুখেই প্রাণ দিতে হয়েছে সরকারি কর্মীকে ।
তিনি লেখেন, "মৃত্যুর মিছিল ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে । নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত আরও এক বিএলও আত্মঘাতী হয়েছেন । হঠকারী, বিশৃঙ্খল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অমানবিক চাপের কারণেই এই ঘটনা ।" অভিষেকের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বর্তমানে যে প্রক্রিয়া চলছে, তা আদতে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং এর নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই 'ত্রুটিপূর্ণ' প্রক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং ক্লান্তিতে ইতিমধ্যেই রাজ্যে 50 জনেরও বেশি মানুষের প্রাণ গিয়েছে । তাঁর কথায়, "বিজেপির নির্বাচনী লাভের জন্য পরিকল্পিত এই ভোটার ছাঁটাই অভিযানের জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও হতাশা তৈরি হয়েছে, যার বলি হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে ।"
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিষেক । তাঁর অভিযোগ, কমিশনের নিরপেক্ষতা এখন প্রশ্নের মুখে । তিনি পোস্টে লেখেন, "যে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরস্থির ও পদ্ধতিগত হওয়া উচিত ছিল, তা এখন বুলডোজার দিয়ে চালানোর মতো করে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে । একটি নমনীয় এবং সহযোগী নির্বাচন কমিশন এক বিশেষ দলের রাজনৈতিক অঙ্ক এবং 'এক ব্যক্তির' অহংবোধকে সন্তুষ্ট করতে নিজেদের মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে ফেলেছে ।"

