মমতার বাড়িতে তল্লাশি হলে মিলবে 100 কোটি ! বিস্ফোরক শুভেন্দু, 'ম্যাচ-ফিক্সিং' বলছে কংগ্রেস
মহম্মদ সেলিম বলেন, টলিউড বলিউডের পুরনো স্ক্রিপ্টের মতোই নাটক চলছে । এটা নির্বাচনের আগে মঞ্চ সাজানোর চেষ্টা ।

Published : January 8, 2026 at 5:15 PM IST
কলকাতা, 8 জানুয়ারি: আইপ্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সেক্টর ফাইভের অফিসে ইডি হানা চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সশরীরে সেখানে উপস্থিতি নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী । তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হলে 100 কোটি টাকা মিলবে ৷ এদিকে, ইডি হানা ও তার পরে মুখ্যমন্ত্রীর গতিবিধিকে ম্যাচ-ফিক্সিং তকমা দিয়ে কটাক্ষ করেছে কংগ্রেস ৷ তাদের দাবি, ভোটের আগেই এধরনের সক্রিয়তা চোখে পড়ে ৷ এই ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে সিপিএমও ৷
'নজিরবিহীন' ঘটনায় পালটা চ্যালেঞ্জ শুভেন্দুর
বৃহস্পতিবারের ঘটনায় শুভেন্দু অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনিক প্রধান হয়েও একটি সাংবিধানিক তদন্তকারী সংস্থার কাজে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করেছেন । তাঁর মতে, দেশের মধ্যে এমন ঘটনা নজিরবিহীন এবং এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় । বিরোধী দলনেতার দাবি, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু তদন্ত প্রভাবিত করতেই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন । এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আদালতের সাহায্য নেওয়া উচিত । সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে একজন মুখ্যমন্ত্রী যে এসব করতে পারেন, তা ভাবা যায় না ।"
এদিন মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতাদের বাড়িতে ইডি পাঠানোর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন । তার পালটা জবাবে শুভেন্দু অধিকারী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে আনেন । তিনি বলেন, "বিজেপির যে কোনও নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কিছুই পাওয়া যাবে না । কিন্তু পার্থর অতিবান্ধবী অর্পিতার বাড়িতে 51 কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছিল । আর যদি আপনার (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) বাড়িতে তল্লাশি হয়, তবে 100 কোটি টাকা মিলবে ৷" বিরোধী দলনেতার এই মন্তব্যে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে ।
নথি চুরির অভিযোগ নস্যাৎ
আইপ্যাকের দফতর থেকে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা এবং দলীয় নথি চুরির যে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রী করেছেন, তা-ও নস্যাৎ করে দিয়েছেন শুভেন্দু । তিনি যুক্তি দেন, আইপ্যাক কোনও রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি কর্পোরেট সংস্থা । তাই সেখানে ভোটার তালিকা বা রাজনৈতিক নথিপত্র থাকার কোনও কারণ নেই । তিনি আরও বলেন, সংস্থাটির কাগজপত্র এবং আইনি বিষয় সঠিক থাকলে ভয়ের কিছু নেই । তল্লাশি মানেই কাউকে গ্রেফতার করা নয়, শুধুমাত্র নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে ।
উল্লেখ্য, আইপ্যাকের কর্ণধারের বাড়িতে ও দফতরে ইডি হানা দেওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সংস্থা নির্বাচনের ঠিক আগে তৃণমূলের সমস্ত গোপনীয় তথ্য হাতিয়ে নিতে চাইছে । তিনি বলেন, "আমাদের পার্টির আইটি সেক্টরকে রেড করে সব কাগজ নিয়ে নেওয়া হয়েছে । হার্ড ডিস্ক, ক্যান্ডিডেট লিস্ট, ভবিষ্যতের স্ট্র্যাটেজি - সব ওরা লুট করতে চাইছে ৷" মমতা আরও বলেন, বিজেপি আসলে 'করতে লুঠ, বলতে ঝুট' নীতিতে চলছে এবং এজেন্সির মাধ্যমে ডাকাতি করছে ।
পুলিশি হেনস্তার অভিযোগ শুভেন্দুর
মমতার এই অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে এদিন নিজের উপর পুলিশি হেনস্তার অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু ৷ তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মাকেও রেহাই দেওয়া হয়নি । তাঁর কথায়, "সিআইডি আমার বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাকে হেনস্তা করেছে । নন্দীগ্রামে আমার বিধায়ক কার্যালয়ে কোনও সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি চালিয়ে তছনছ করা হয়েছে ৷" পুলিশ ও এজেন্সির ব্যবহার নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলে সরব হন তিনি ।
মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতারের দাবি অর্জুনের
এই নিয়ে বৃহস্পতিবার ভাটপাড়ায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেন ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ তথা বিজেপি নেতা অর্জুন সিং । তিনি বলেন, "যেভাবে উনি প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে ঢুকে ইডির আধিকারিকদের হাত থেকে ফাইল নিয়ে পালিয়েছেন, তা একপ্রকার অপরাধের সামিল । তথ্য লোপাট করার জন্য ওঁকে (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) গ্রেফতার করা উচিত । একজন সাধারণ মানুষও পুলিশের কাজে বাধা দিলে কিংবা কোনও অপরাধ করলে তাঁকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় । তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে তদন্তও শুরু করে পুলিশ ।"

অর্জুন আরও বলেন, "ইডির আধিকারিকদের হাত থেকে কীভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফাইল নিয়ে চলে গেলেন ? সেটা কীভাবে তাঁরা বসে বসে দেখলেন ? কেনই বা নিরাপত্তায় থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা তা আটকানোর সাহস দেখাল না ? সেটাই আমি বুঝে উঠতে পারছি না । মুখ্যমন্ত্রী আজকে যা করেছেন তা ভারতের সংবিধানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো । আসলে উনি ভারতবর্ষের সাংবিধানিক কাঠামোকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছেন । সেই প্রক্রিয়াও শুরু করে দিয়েছেন । কালকে এখানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে উনি নিজেকে ভারতের অভ্যন্তরে অন্য একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী ভাবতে শুরু করবেন ।"
শুধু ইডির ভূমিকা নিয়েই নয়, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ভূমিকা নিয়েও এদিন প্রশ্ন তুলেছেন ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ । পশ্চিমবঙ্গের যা পরিস্থিতি, তাতে অবিলম্বে এখানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়া উচিত বলেও মনে করেন অর্জুন সিং।
নির্বাচনের আগে মঞ্চ সাজানোর চেষ্টা: সেলিম
এদিকে, শুভেন্দুর সুরেই এদিন ইডি হানার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গতিবিধিকে কটাক্ষ করেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম । তিনি বলেন, "টলিউড বলিউডের পুরনো স্ক্রিপ্টের মতোই নাটক চলছে । নির্বাচনের আগে মঞ্চ সাজানোর চেষ্টা । কিন্তু সাধারণ মানুষের স্মৃতি অতটা খারাপ নয় । এর আগে এরকম একাধিক ঘটনা ঘটানো হয়েছে । রাজীব কুমারের ঘটনা থেকে শুরু করে আরজি করে পুলিশ পাঠিয়ে লাশ চালান করে দেওয়ার চেষ্টা - সব কিছুই করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । যে কোনও তদন্তকারী সংস্থা তল্লাশি চালালে সেখানে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না । কিন্তু আজকের ঘটনায় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সেখানে চলে গেলেন । ফাইল ল্যাপটপ তৃণমূলের গাড়িতে তোলা হল ।"
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরেই সেলিমের কটাক্ষ, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বলেছেন যে ল্যাপটপ ফাইলগুলোতে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা রয়েছে । তাহলে নেতা বা দলীয় নেতৃত্ব প্রার্থী ঠিক করেন না, তা-ই স্পষ্ট হল । কোম্পানিকে দিয়ে করানো হয় । শুধু তাই নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ফাইল এবং নথি নিয়ে বেরিয়ে এলেন, তা তৃণমূলেরই সম্পত্তি বা প্রার্থী তালিকা সে বিষয়টির প্রমাণ রয়েছে ? তল্লাশি চলাকালীন এভাবে কোনও নথিপত্র বের করে আনা যায় না । সরকারি কাজে বাধা দেওয়া যায় না । ইডির এখনই উচিত কেস ফাইল করা ।"
ম্যাচ-ফিক্সিং বলছে কংগ্রেস
তবে এই ঘটনাকে ম্যাচ ফিক্সিং বলে অভিযোগ করেছে কংগ্রেস ৷ এদিন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক গুলাম আহমেদ মীর জলপাইগুড়িতে বলেন, "ভোট এলেই ম্যাচ ফিক্সিং শুরু হয়ে যায় । IPAC অনেকদিন থেকে রাজ্যে আছে । জনতার নজর ফেরাতেই এটা করা হচ্ছে । ভোটের সময়ে ইডি সিবিআই পুলিশ অ্যাক্টিভ । সারা দেশে কে কোথায় কী করছে সেটা তো দেখা উচিত । আগে কেন কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হল না ! কেন মমতা কাউকে বাঁচাতে ফাইল নিয়ে পালাচ্ছেন ? ডাল মে কালা হ্যায় কেয়া ! এটা বাংলার জনতা জানতে চায়, এই ম্যাচ ফিক্সিং থেকে বাংলার জনতার বেরিয়ে আসা উচিত ।"

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার সরব হয়েছেন শাসকদলের দুর্নীতি নিয়ে ৷ তিনি বলেন, "তৃণমূলের দুর্নীতি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সর্বজনবিদিত । 2011 সাল থেকে তাদের বিধায়ক, সাংসদরা বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন । সারদা, নারদ এবং তারপর শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি । সাধারণ মানুষ যখন কষ্ট পাচ্ছিল, তখন এই সমস্ত ঘটনায় ইডি কোথায় ছিল ? রাজ্য সরকার রাজ্যের কোষাগার খালি করছিল, কিন্তু এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ছিল নীরব দর্শক । ইডি কেবল নির্বাচনের বছরে সক্রিয় হয় এবং তারপর পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় । এতে কোনও সন্দেহ নেই যে ইডি একটি রাজনৈতিক সংস্থা । যা বিজেপি দ্বারা বিরোধীদের হয়রানি করার জন্য পরিচালিত হয় । ইডি এর আগেও কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলোর অস্থিরতা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়েছে । তবে কংগ্রেস দল আইনিভাবে সেই লড়াইগুলো লড়েছে এবং জিতেছে ।"

