বিজেপি নেতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের ঘরে বন্দি করে রাখার নিদান ঘিরে বিতর্ক, সমালোচনায় সরব তৃণমূল
তৃণমূলের ভোট আটকাতে এই নিদান দেন পশ্চিম মেদিনীপুরের এক বিজেপি নেতা৷ যা নিয়ে পাল্টা তোপ দেগেছে তৃণমূল৷

Published : January 5, 2026 at 5:40 PM IST
কলকাতা, 5 জানুয়ারি: লক্ষ্মীর ভাণ্ডার৷ 2021 সালের বিধানসভা ভোটের আগে এই প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটের ময়দানে নেমেছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷ নির্বাচনী ফলাফলে এই প্রতিশ্রুতির প্রভাব কিছুটা হলেও পড়েছিল৷ তৃতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কয়েকমাসের মধ্যেই এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তার পর সময় যত এগিয়েছে, ততই এই প্রকল্প ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন হয়েছে৷ পাঁচ বছর পর আরও একটা বিধানসভা নির্বাচন যখন শিয়রে, ঠিক সেই সময় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-কে কেন্দ্র করে৷
এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে গত শনিবার বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য কালীপদ সেনগুপ্তর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের কলাইকুণ্ডার মাঠে আয়োজিত বিজেপির ‘পরিবর্তন সংকল্প’ সভার মঞ্চ থেকে তিনি বলেন, ‘‘এই নির্বাচনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাওয়া মা-বোনেরা ভারতীয় জনতা পার্টিকে যেমন ভোট দেবেন, এমনও অনেক লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাওয়া মা-বোনেরা আছেন, যাঁরা জোড়াফুলে ভোট দিতে যাবেন৷ আমি সেই সমস্ত পরিবারের স্বামীদের বলছি, ওই মায়েদের ঘরে বন্দি রেখে দেবেন৷ ভোটটা দিতে হবে পদ্মফুলে, জোড়া ফুলে নয়৷’’
বিষয়টি সামনে আসতেই আসরে নেমে পড়ে তৃণমূল কংগ্রেস৷ ঘটনার 24 ঘণ্টার মধ্যেই রবিবার এই নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করা হয় শাসক দলের পক্ষ থেকে৷ সেখানে হাজির ছিলেন রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী তৃণমূলের শশী পাঁজা৷ তিনি দাবি করেন, বিজেপি সরাসরি মহিলাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের ডাক দিচ্ছে এবং গার্হস্থ্য হিংসায় উস্কানি দিচ্ছে।
শশী পাঁজা আরও বলেন, "এটি কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে না, এটি একটি ফতোয়া বা নিদান। বিজেপি যে মানসিকভাবে কতটা নারীবিদ্বেষী, এই মন্তব্যেই তা পরিষ্কার। তারা এতদিন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ করার হুমকি দিত, আর এখন তারা একধাপ এগিয়ে সরাসরি মহিলাদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার কথা বলছে। এটি মহিলাদের অপমান এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকারের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।"

উল্লেখ্য, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়ে বিজেপির অনেক নেতার মুখে এর আগে সমালোচনা শোনা গিয়েছে৷ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নামে রাজ্যের মহিলাদের সরকার ভিক্ষা দিচ্ছে বলেও কোনও কোনও নেতার মুখে শোনা গিয়েছে৷ আবার অনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে বিজেপি এই রাজ্যে ক্ষমতায় এলে মহিলাদের আরও বেশি ভাতা প্রতিমাসে দেওয়া হবে৷ কালীপদ সেনগুপ্ত যেদিন এই বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, সেইদিনই জলপাইগুড়িতে মিঠুন চক্রবর্তী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নেওয়ার পক্ষেই সওয়াল করেন৷
শনিবার জলপাইগুড়ির ধূপগুড়িতে গিয়েছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী৷ সেখানে বিজেপির সভায় যোগ দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ওটা আপনাদের টাকা৷ দিচ্ছে, আপনারা নিয়ে নিন৷’’ তিনি সেখানে বহরমপুরের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানান৷ যেখানে একজন টোটোওয়ালা তাঁকে জানিয়েছিলেন যে সামান্য ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলেই এক হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়৷ সেই পরিমাণ টাকাই তো লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে মেলে৷ এর পর মিঠুন আবার বলেন, ‘‘পয়সটা ছাড়বেন না৷ নেবেন৷ একশোবার নেবেন৷ ওটা আপনাদের পয়সা৷’’

যদিও বিজেপি নেতারা যতবারই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন, ততবারই পালটা তোপ দেগেছে তৃণমূল৷ ঠিক যেমন রবিবার সাংবাদিক বৈঠক করেন শশী পাঁজা৷ প্রতিবারই তৃণমূল দাবি করে যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্যই মহিলারা শাসক দলের পাশে আছে৷ রবিবার সেই একই কথা শোনা গিয়েছে শশী পাঁজার মুখে৷ তিনি বলেন, "বিজেপি বুঝে গিয়েছে যে মহিলারা তাদের সঙ্গে নেই। তাই এখন স্বামীদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে স্ত্রীদের ঘরে তালাবন্ধ করে রাখার জন্য। এটি শুধু অগণতান্ত্রিক নয়, এটি এক ধরনের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বা গার্হস্থ্য হিংসার শামিল। বাংলার সংস্কৃতিতে এই ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত কুরুচিকর।"
শশী পাঁজা আরও বলেন, "বিজেপি নেতারা আসলে ভয় পেয়েছেন। তারা বুঝতে পারছেন গণতান্ত্রিক পথে মহিলাদের আটকানো সম্ভব নয়, তাই এখন নিদান দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে ভোট আটকাতে চাইছেন। তবে বাংলার মহিলারা এই অপমানের জবাব ইভিএমের মাধ্যমে দেবেন।"

প্রসঙ্গত, ওই সভার মূলবক্তা ছিলেন সুকান্ত মজুমদার৷ তিনি সেই সভা থেকে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেন৷ পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিজেপিকে তৃণমূলের বাপ বলে উল্লেখ করেন৷ এই কথাটিকে মিস কোট করে অভিষেকের বাপ বলে যাতে উল্লেখ না করা হয়, সেই সাবধানীবাণীও শোনা যায় তাঁর মুখে৷ কিন্তু কালীপদর মন্তব্য নিয়ে তিনি কোনও কথা বলেননি৷ যদিও কালীপদ যখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, সেই সময় সুকান্ত মঞ্চে ছিলেন না৷

কিন্তু বিষয়টি নিয়ে হইচই হওয়ার পরও কেন বিজেপির কোনও নেতা কেন কোনও মন্তব্য করলেন না, সেই প্রশ্ন তুলে তৃণমূলের অভিযোগ, এই নীরবতাই প্রমাণ করে যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে এই ধরনের মন্তব্যে। যদিও বিজেপির ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তন্ময় দাস বলেন, ‘‘এই বক্তব্য দলের নয়, এই বক্তব্য ওঁর নিজস্ব। আমরা মেয়েদেরকে বন্দী করে নয়, বরং ছেলেদের সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটার যেখানে বার্তা দিচ্ছি সেখানে এই হেন বক্তব্যকে আমরা সমর্থন করি না। এই জন্য দল কালীপদ সেনগুপ্তকে শোকজের নির্দেশ দিয়েছে। এরপর আমরা পরবর্তীকালে দলীয় ব্যবস্থা নেব।’’

