জনগণনা শেষ না-করেই কলকাতায় ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস? ডিলিমিটেশন ঘিরে প্রশ্ন কংগ্রেসের
144 থেকে প্রায় 200 ওয়ার্ড করার সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি। জনগণনা সম্পূর্ণ না-হলে প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, নাগরিক পরিষেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা৷

Published : August 4, 2026 at 7:15 PM IST
কলকাতা, 4 অগস্ট: কলকাতা পুরনিগমের ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়ে গেল প্রাথমিক পর্যায়েই । এখনও চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ না-হলেও, ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর সম্ভাব্য উদ্যোগকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন তুলে সরব হল পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস । দলের অভিযোগ, সঠিক জনগণনার তথ্য ছাড়া ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া এগোলে শুধু প্রশাসনিক ভারসাম্যই বিঘ্নিত হবে না, নাগরিক পরিষেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার কলকাতা পুরনিগমের কমিশনার তথা প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডের কাছে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার । সেখানে অবিলম্বে সর্বদল বৈঠক ডেকে রাজনৈতিক দলগুলির মতামত নেওয়ার পাশাপাশি জনগণনা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস না-করার আবেদন জানানো হয়েছে ।
এত বড় সিদ্ধান্ত, অথচ সর্বদল বৈঠক নেই
স্মারকলিপিতে কংগ্রেসের অভিযোগ, বর্তমানে কলকাতা পুরনিগমের 144টি ওয়ার্ড বাড়িয়ে প্রায় 200 করার উদ্যোগ নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চলছে । কিন্তু এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও সর্বদল বৈঠক ডাকা হয়নি বা রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি । প্রদেশ কংগ্রেসের মতে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি শহরের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নাগরিক পরিষেবা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত । ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব রাজনৈতিক দলের মতামত গ্রহণ করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ হওয়া উচিত ।
শুভঙ্কর সরকারের বক্তব্য, "কলকাতার প্রশাসনিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া উচিত নয় । সর্বদল বৈঠক হলে সব পক্ষের মতামত সামনে আসত এবং সিদ্ধান্ত আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হতো ।"
জনগণনার তথ্য ছাড়া ডিলিমিটেশন যুক্তিযুক্ত নয়
কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় আপত্তি জনগণনা নিয়ে । দলের দাবি, অতীতে কলকাতা পুরনিগমের ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা এবং এলাকার আয়তন- এই দুই বিষয়কে প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে । বর্তমানে জনগণনা এবং সেলফ এন্যুমারেশন (Self Enumeration)-এর কাজ চলছে । এই পরিস্থিতিতে প্রকৃত জনসংখ্যার তথ্য হাতে না-নিয়ে নতুন ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতে একাধিক প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কংগ্রেস ।
দলের বক্তব্য, কোথাও অতিরিক্ত জনসংখ্যা নিয়ে একটি ওয়ার্ড তৈরি হতে পারে, আবার কোথাও তুলনামূলক কম জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও একই পরিকাঠামো বজায় থাকতে পারে । এর ফলে কাউন্সিলরের কাজের চাপ থেকে শুরু করে পুরসভার পরিষেবা বণ্টন, সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে ।
শুভঙ্কর সরকারের কথায়, "সঠিক জনসংখ্যার তথ্য ছাড়া ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করলে প্রশাসনিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে । তার প্রভাব সরাসরি নাগরিক পরিষেবার উপর পড়বে ।"
খসড়া প্রকাশেও দেরি
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত খসড়া প্রকাশেও অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে । কংগ্রেসের দাবি, খসড়া প্রকাশের পর নাগরিকদের আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর সুযোগ থাকা উচিত । কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখনও স্পষ্ট নয় । ফলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে । রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়ার্ডের সীমানা পরিবর্তন মানেই ভোটারদের পুনর্বিন্যাস । তাই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ।
সেলফ এন্যুমারেশন নিয়ে উদ্বেগ
চলমান জনগণনা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনলাইন সেলফ এন্যুমারেশন চালু হলেও, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি বলেও অভিযোগ করেছে কংগ্রেস । বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত মানুষ কিংবা নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেকেই অনলাইনে তথ্য নথিভুক্ত করতে সমস্যায় পড়তে পারেন । এর ফলে বহু মানুষের তথ্য বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে । এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি বুথ, বরো অফিস এবং কলকাতা পুরনিগমের ওয়ার্ড অফিসে বিশেষ হেল্প ডেস্ক চালুর দাবি জানিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস । সেখানে প্রশিক্ষিত কর্মীরা সাধারণ মানুষকে তথ্য জমা দিতে সাহায্য করবেন বলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ।
প্রচার নয়, প্রশাসনকে মাঠে নামতে হবে
শুধু হোর্ডিং বা প্রচারসামগ্রী দিয়ে জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলেও দাবি কংগ্রেসের । স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, পুরনিগমের প্রশাসনিক পরিকাঠামো, স্থানীয় কর্মী এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে বাড়ি বাড়ি সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কারণ জনগণনার তথ্যের উপরই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস ?
ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস কোনও সাধারণ প্রশাসনিক অনুশীলন নয় । জনসংখ্যার পরিবর্তন, নতুন আবাসন, শহরের বিস্তার এবং নাগরিক পরিষেবার চাহিদা মাথায় রেখেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয় ।
এর উপর নির্ভর করে একজন কাউন্সিলরের প্রতিনিধিত্বের পরিধি, পুরসভার পরিষেবা বণ্টন, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতের পুরভোটের রাজনৈতিক সমীকরণও । তাই রাজনৈতিক দলগুলির মতে, এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং নির্ভুল জনসংখ্যার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।
এখন নজর পুরনিগমের সিদ্ধান্তে
প্রদেশ কংগ্রেসের এই স্মারকলিপির পর এখন নজর কলকাতা পুরনিগমের দিকে । সর্বদল বৈঠক ডাকা হবে কি না, জনগণনার চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশের আগে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া এগোবে কি না- তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক মহলে । কারণ, কলকাতার ওয়ার্ডের সীমানা বদল মানে শুধু মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নাগরিক পরিষেবার ভবিষ্যৎ, প্রশাসনিক ভারসাম্য এবং আগামী পুর নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণও ।

