উত্তর 24 পরগনায় একমাত্র সন্দেশখালি থেকেই কেন বিজেপির 'পরিবর্তন যাত্রা'র সূচনা ?
উত্তর 24 পরগনা জেলায় সন্দেশখালি থেকেই 2 মার্চ বিজেপির 'পরিবর্তন যাত্রা'-র কর্মসূচির সূচনা হবে ৷ যদিও তাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাইছে না শাসক শিবির ।

Published : February 26, 2026 at 9:00 PM IST
রাজু বিশ্বাস
সন্দেশখালি, 26 ফেব্রুয়ারি: ভোটের 'দামামা' বেজে গিয়েছে । যে কোনও সময় এ রাজ্যে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে যাবে । তার আগে বিধানসভা ভোটকে পাখির চোখ করে শাসক-বিরোধী উভয়ই যে যার মতো করে ভোটের রণকৌশল সাজাতে ব্যস্ত । তারই অঙ্গ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে 'পরিবর্তন যাত্রা'-র কর্মসূচি হাতে নিয়েছে পদ্ম শিবির । উদ্দেশ্য একটাই, ছাব্বিশের ভোট-যুদ্ধে নিজেদের পালে 'হাওয়া' টানা । সেই উদ্দেশ্যেই উত্তর ও দক্ষিণের ন'টি সাংগঠনিক বিভাগকে টার্গেট করে 'পরিবর্তন যাত্রা'-র মতো কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভোট ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতারা । তবে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বহু চর্চিত দক্ষিণের জেলা উত্তর 24 পরগনার সন্দেশখালি ।
পরিবর্তন যাত্রার সূচনা
যে সন্দেশখালি এক সময় 'শিরোনাম'-এ উঠে এসেছিল তৎকালীন তৃণমূলের দাপুটে নেতা শেখ শাহাজাহানের 'কীর্তি' এবং নারী আন্দোলনের মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে । যাকে হাতিয়ার করে চব্বিশের লোকসভা ভোটে সন্দেশখালি বিধানসভায় ভালো ফল করেছিল গেরুয়া শিবির । নারী আন্দোলনের 'আঁতুরঘর' সেই সন্দেশখালিকেই বিজেপি বেছে নিয়েছে 'পরিবর্তন যাত্রা'-র স্থান হিসেবে । 1 মার্চ রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় সূচনা হলেও উত্তর 24 পরগনায় জেলার একমাত্র সন্দেশখালি থেকে দলের ঘোষিত এই 'পরিবর্তন যাত্রা'-র উদ্বোধন হবে আগামী 2 মার্চ ৷ আর এই সূচনা হতে চলেছে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী তথা মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের হাত ধরে । আর এ নিয়েই অনেকে দু'য়ে দু'য়ে চার করতে শুরু করেছে ।
যদিও, সন্দেশখালিতে বিজেপির 'পরিবর্তন যাত্রা'-কে আমল দিতে নারাজ শাসক শিবির । পালটা তাঁদের দাবি, 'সন্দেশখালি-কাণ্ডে চক্রান্ত করে বিজেপি মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করেছিল । সেবারও সফল হয়নি । এক্ষেত্রেও তারা সফল হতে পারবে না ।' তবে, চব্বিশের লোকসভা ভোটে শাহজাহান-কাণ্ডকে হাতিয়ার করে বিজেপি বসিরহাট কেন্দ্রে বিশেষ ছাপ ফেলতে না-পারলেও বিধানসভা ভিত্তিক ফলাফলে সন্দেশখালি বিধানসভায় শাসক শিবিরের থেকে অনেকটাই এগিয়ে গেরুয়া শিবির । পরিসংখ্যানও বলছে তাই ।
লোকসভায় সন্দেশখালিতে বিজেপির ভোট
পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখলেই স্পষ্ট, গত লোকসভায় সন্দেশখালি বিধানসভায় রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলকে 8 হাজার 387 ভোটের ব্যবধানে পিছনে ফেলে লিড নিয়ে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি । অর্থাৎ, বিজেপি প্রার্থী তথা সন্দেশখালির নারী আন্দোলনের অন্যতম মুখ রেখা পাত্র যেখানে 95 হাজার 862টি ভোট পেয়েছেন । সেখানে তৃণমূলের জয়ী প্রার্থী শেখ নুরুল ইসলাম ভোট পেয়েছেন 87 হাজার 475টি । সাতটি বিধানসভার মধ্যে একমাত্র সন্দেশখালি বিধানসভাতেই বিজেপি প্রার্থীর থেকে কম ভোট পেয়েছেন তিনি । গত লোকসভা ভোটে সন্দেশখালিতে বিজেপি এগিয়ে থাকায় ছাব্বিশের ভোটে এই বিধানসভা কেন্দ্রকে যে তারা বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে, তা স্পষ্ট 'পরিবর্তন যাত্রা'-র কর্মসূচির স্থান হিসেবে নির্দিষ্ট ভাবে সেই কেন্দ্রকে বেছে নেওয়া থেকেই ৷

সন্দেশখালিতে আন্দোলন
প্রসঙ্গত, সন্দেশখালি কেন্দ্রে শাসকদলের পিছিয়ে থাকার নেপথ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এর প্রধান কারণই হল শাহজাহান-কাণ্ড । যা ঘিরে বছর দু'য়েক আগে তীব্র আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সন্দেশখালি । আন্দোলনের জেরে সেই সময় শাহজাহান ও তাঁর বাহিনীর একের পর এক কুকীর্তি সামনে আসতে শুরু করেছিল । সেই কুকর্মের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন গ্রামের মহিলারা । যা পরবর্তীতে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সন্দেশখালির আশপাশে । অগ্নিসংযোগ, শাহজাহান ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতাদের বাড়িতে হামলা, পুলিশকে ঘিরে বিক্ষোভের ঘটনা অজানা নয় কারোরই ।
সন্দেশখালি-কাণ্ড ঘিরে মহিলাদের তীব্র আন্দোলন নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে । সেই আন্দোলন থেকে উঠে আসা গ্রামের সাধারণ গৃহবধূ রেখা পাত্রকে প্রার্থী করে বিজেপি চব্বিশের ভোটে বাজিমাত করতে চেয়েছিল । কিন্তু,তা আর হয়ে ওঠেনি । সন্দেশখালি বিধানসভা থেকে বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র ভালো ভোট পেলেও বাকি কেন্দ্র-গুলিতে আশানুরূপ ভোট পাননি । ফলে, তিন লক্ষেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে তৃণমূল প্রার্থীর কাছে পরাজিত হতে হয় তাঁকে ।
বিজেপির প্রত্যাশা
এদিকে, বিজেপির 'পরিবর্তন যাত্রা'-র কর্মসূচি ঘিরে এখন সাজো সাজো রব সন্দেশখালিতে । কর্মসূচি সফল করতে রীতিমতো জোরকদমে চলছে তার প্রচার অভিযান । দলীয় সূত্রে খবর, আগামী 2 মার্চ সন্দেশখালি থেকে এই কর্মসূচির সূচনা হলেও সেই 'পরিবর্তন যাত্রা'-র রথ বসিরহাটের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকা ছুঁয়ে পরবর্তীতে পৌঁছবে বিজেপির উত্তর 24 পরগনা জেলার একাধিক সাংগঠনিক বিভাগে ।
বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার যুব মোর্চার সভাপতি পলাশ সরকার বলেন, "সন্দেশখালিতে সাধারণ মানুষের আন্দোলন স্তব্ধ করতে তৃণমূল পুলিশকে দিয়ে আন্দোলনকারীদের উপর দমনপীড়ন চালানোর চেষ্টা করেছিল । তৃণমূলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সেই সময় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দলের রাজ্য নেতৃত্ব । পাশে দাঁড়িয়ে সন্দেশখালির মানুষকে আগলে রেখেছিলেন তাঁরা । গত লোকসভা ভোটে সন্দেশখালিতে তারই সুফল পেয়েছে বিজেপি । সাধারণ মানুষ ভারতীয় জনতা পার্টিকে দু'হাত ধরে আশীর্বাদ করেছেন । মত দিয়েছেন বিজেপির পক্ষে ।"
তিনি আরও বলেন, "ছাব্বিশের নির্বাচনেও সন্দেশখালি বিধানসভা থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বিজেপি প্রার্থী । তৃণমূল কংগ্রেসের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে । ওঁদের এমন পরিস্থিতি হবে, সন্দেশখালিতে দলের ফ্ল্যাগ লাগানোর লোকও খুঁজে পাবে না । পরিবর্তন যাত্রা শুধু সন্দেশখালির পরিবর্তন যাত্রা নয়, এটা গোটা রাজ্যের । এর উদ্দেশ্যই হল, তৃণমূলকে সরিয়ে এ রাজ্যে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠা করা । সেই সঙ্গে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, নারীদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া-সহ একাধিক দাবিও রয়েছে এই কর্মসূচি আয়োজন করার নেপথ্যে ।"
তৃণমূলের কটাক্ষ
অন্যদিকে, সন্দেশখালিতে বিজেপির 'পরিবর্তন যাত্রা'-র কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ শাসক শিবির । এই নিয়ে স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক সুকুমার মাহাতো বলেন, "চব্বিশের ভোটে সন্দেশখালি নিয়ে মিথ্যে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল বিজেপি । সেই সময় যাঁরা আন্দোলন করেছিলেন তাঁদের বেশিরভাগই এখন তৃণমূলে । তাই, যতই শিবরাজ সিং চৌহান কিংবা শুভেন্দু অধিকারী আসুক । কোনও লাভ হবে না । সন্দেশখালিতে তৃণমূলকে হারানো অত সহজ নয় । এই কেন্দ্র থেকে ফের বিপুল ভোটে জয়ী হব আমরাই । এবারও সন্দেশখালির মানুষ উচিত শিক্ষা দেবে বিজেপিকে ।"
'পরিবর্তন যাত্রা' উদ্বোধন সূচি
উল্লেখ্য, 'পরিবর্তন যাত্রা'-র কর্মসূচি উপলক্ষে বিজেপি এবার নজিরবিহীন আয়োজন করতে চলেছে । 48 ঘণ্টা ধরে 'নেতার মেলা' বসতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে । আগামী 1 ও 2 মার্চ সেই উদ্ধোধন ঘিরে একসঙ্গে যত জন ওজনদার বিজেপি নেতা-মন্ত্রী এ রাজ্যে আসছেন, তেমন ছবি আগে কখনও দেখা গিয়েছে কি না, সন্দেহ !
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক বিভাগের সংখ্যা 10 । তার মধ্যে 9টি বিভাগেই পরিবর্তন যাত্রা হবে । একমাত্র কলকাতা মহানগর বিভাগে 'পরিবর্তন যাত্রা'-র কর্মসূচি হবে না । কারণ গোটা কর্মসূচির পরিসমাপ্তি পর্ব হিসেবে ব্রিগেড সমাবেশের আয়োজনের দায়িত্ব থাকছে কলকাতা মহানগর বিভাগের উপর । বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, 1 মার্চ 'পরিবর্তন যাত্রা'-র উদ্ধোধন হবে রাজ্যের পাঁচটি জায়গা থেকে । সেগুলি হল কোচবিহার, কৃষ্ণনগর, কুলটি, গড়বেতা এবং রায়দিঘি । 2 মার্চ উদ্বোধন হবে আরও চারটি জায়গা থেকে । সেগুলি হল ইসলামপুর, হাঁসন, সন্দেশখালি এবং আমতা ।

