14 ফেব্রুয়ারির পর তৃণমূল আর ভোটে লড়তে চাইবে না, মালদায় মন্তব্য শুভেন্দুর
কলিঙ্গ ও অঙ্গের পর বঙ্গে সাফাইয়ের পালা, মালদার জনসভায় তৃণমূলকে উৎখাতের ডাক শুভেন্দু অধিকারীর ৷

Published : January 2, 2026 at 7:59 PM IST
মালদা, 2 জানুয়ারি: 14 ফেব্রুয়ারির পর তৃণমূল আর ভোটে লড়তে চাইবে না ৷ এসআইআর-এর প্রথম ঝাঁকুনিতেই 58 লাখ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে ৷ আরও অবৈধ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে ৷ শুক্রবার চাঁচলের কলমবাগানে সভা করতে এসে মন্তব্য করলেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ৷
একইসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “তৃণমূলে থাকাকালীন এখানে সভা করে গিয়েছি ৷ তখন হেলিকপ্টার করে সভা করতে এসেছি ৷ মুখ্যমন্ত্রী আমাকে যা লিখে দিতেন, সেটাই আমাকে বলতে হতো ৷ তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমি এখানে এসে যেন চাঁচল আর গাজোল পুরসভা হবে, সেকথা বলি ৷ আমি বলেছিলাম ৷ কিন্তু, 15 বছরেও সেই পুরসভা হল না ৷ এই দেউলিয়া সরকার সেটা করতেও পারবে না ৷”
জানিয়ে দিলেন, বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে চাঁচলে রেল যোগাযোগ শুধু সময়ের অপেক্ষা৷ ধান থেকে শুরু করে মাখনা, বর্তমান সরকারি নায্যমূল্য থেকে অনেক বেশি দামে কৃষকদের কাছ থেকে কিনে নেবে বিজেপির সরকার ৷ তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা মালতিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক আবদুর রহিম বকসিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে গেলেন, এবারের ভোটে তাঁকে আর জিততে দেবেন না ৷ ওই কেন্দ্রে বিজেপি জিততে না-পারলেও রহিম বকসি হারবেন ৷ তার নীল নকশা তাঁর তৈরি হয়ে গিয়েছে বলে জানালেন শুভেন্দু ৷
পুলিশ ও প্রশাসনের অনুমতি না-পেয়ে শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের অনুমতিতে এদিন চাঁচলের কলমবাগানে সভা করেছেন বিরোধী দলনেতা ৷ সভার শুরুতেই সেকথা উল্লেখ করতে ছাড়েননি তিনি ৷ বললেন, "চাঁচল থেকে 50 কিলোমিটার দূরে বিহারে এবার সবাই সাফ হয়ে গিয়েছে ৷ এবার বাংলায় তৃণমূল সমূলে উৎপাটিত হবে ৷ অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের মধ্যে আগে কলিঙ্গ, পরে অঙ্গে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৷ ছাব্বিশ ডা. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নপূরণ হবে ৷ বঙ্গেও বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে ৷" জানিয়ে দিলেন, বিরোধী দলনেতা হয়েও তাঁকে 104 বার কলকাতা হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে কর্মসূচি করতে হয়েছে৷ এপ্রিলের পর তৃণমূল বিরোধী আসনে বসবে৷ সেদিন হিসাব হবে ৷
এদিন পুরোপুরি ভোটমুখী বক্তব্য পেশ করেছেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক ৷ বক্তব্যে মিশিয়ে দিয়েছেন হিন্দুত্বের ছোঁয়া ৷ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় নিজের বক্তব্যে বলেছেন, “এই রাজ্যে শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় কর্মসূচিতেও বাধা দেওয়া হয়৷ সোহরাবর্দি আর জিন্নার স্বপ্নে এই সরকার লালিতপালিত হচ্ছে ৷ মোথাবাড়িতে যারা অশান্তি করেছে, তারা রাষ্ট্রবাদী হতে পারে না৷ সেই অশান্তির পর তৎকালীন রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার-সহ আমাদের নেতৃত্বকে পুলিশ মোথাবাড়িতে ঢুকতে দেয়নি ৷ বিধ্বস্ত ধুলিয়ান, সামশেরগঞ্জেও আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি ৷ হাইকোর্টের অনুমতি পেয়ে আমি সেসব জায়গায় যাই৷ ময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাসের মতো এখানে হরগোবিন্দ দাসের যুবক ছেলেকে পশু কাটার অস্ত্র দিয়ে কাটা হয়েছে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী আর ফিরহাদ হাকিমরা ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে মানুষকে উসকানি দিয়েছিলেন বলেই এসব ঘটনা ঘটেছে৷ কিন্তু, সেই আইন এখন কার্যকর হয়ে গিয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গ বাঙালি হিন্দুদের হোমল্যান্ড৷ স্বামীজী আমাদের নিজ ধর্মে আস্থা রাখতে শিখিয়েছেন৷ অন্য ধর্মকেও সম্মান জানাতে বলেছেন৷ আমরা তাঁর কথামতো কাজ করি৷”
1998 সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত তৃণমূল মালদা জেলায় সেভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি৷ এদিন নিজের বক্তব্যে সেই বিষয়টিরও উল্লেখ করেছেন শুভেন্দু৷ বলেছেন, “2011 সাল থেকে তৃণমূল রাজ্যের ক্ষমতায় রয়েছে৷ আমি তৃণমূলে থাকাকালীন পাঁচ বছরের বেশি সময় মালদার দায়িত্বে ছিলাম৷ দেখেছি, মালদার মানুষ তৃণমূলকে ঘৃণা করে৷ এগারোর বিধানসভা নির্বাচনে শুধুমাত্র সাবিত্রী মিত্র আড়াইডাঙ্গা কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন ৷ চোদ্দর লোকসভা নির্বাচনে এই জেলার দু’টি আসন মিলিয়ে তৃণমূল মাত্র 14 শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ কোনও কেন্দ্রেই জামানত ছিল না৷ ষোলর বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলায় তৃণমূল শূন্য৷ চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনেও ওরা শূন্য৷ সেই ভোটে এই জেলার 12টি বিধানসভা কেন্দ্রের একটিতেও তাদের লিড নেই৷ এখানকার মানুষ জানেন, তৃণমূল মানেই চোর৷ তাই তাঁরা তৃণমূলকে পছন্দ করেন না ৷”
এদিন নিজের বক্তব্যে তৃণমূলকে বিভিন্নভাবে বিঁধেছেন শুভেন্দু ৷ তিনি বলেন, “তৃণমূলের নেতারা বলে, কেন্দ্রীয় সরকার আবাস যোজনার টাকা দেয়নি৷ 2004 থেকে 2014 সাল পর্যন্ত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ইন্দিরা আবাস যোজনায় পশ্চিমবঙ্গকে দিয়েছিল 4664 কোটি টাকা ৷ 2014 থেকে 2022 সাল পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি সরকার রাজ্যকে 40 লাখ বাড়ির জন্য দিয়েছে 30 হাজার কোটি টাকা ৷ এই টাকা লাভলি খাতুনের মতো বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানরা লুট করেছে ৷ স্বচ্ছ ভারত মিশনে 12 হাজার টাকা করে এই রাজ্যে 72 লাখ শৌচাগার নির্মাণের টাকা দেয় মোদিজির সরকার ৷ সেই টাকাও এরা খেয়ে নিয়েছে৷ মনরেগা প্রকল্পে 2004 সাল থেকে 2014 সাল পর্যন্ত রাজ্য পেয়েছে 14 হাজার কোটি টাকা ৷ 2014 থেকে 2022 সাল পর্যন্ত পেয়েছে 54 হাজার কোটি টাকা ৷ সেই টাকা 1 কোটি 25 লাখ ভুয়ো জবকার্ডধারীরা লুটে নিয়ে গিয়েছে ৷ বিহারের বাসিন্দা থেকে শুরু করে বাংলাদেশিরাও এখান থেকে টাকা নিয়ে গিয়েছে৷ বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসলে 100 দিন নয়, বছরে 200 দিন কাজ দেওয়া হবে৷ প্রধানমন্ত্রী সূর্যঘর যোজনায় দেওয়া হবে তিন লাখি বাড়ি৷ বিহারের মতো এখানেও প্রতি ঘরে নলবাহিত জল পাওয়া যাবে৷ বিজেপি ক্ষমতায় আসলে চাঁচল পুরসভা হবেই ৷ উত্তরবঙ্গে এইমস হবে৷ মালদার পরিযায়ী শ্রমিকরা জেলায় কাজ পাবেন৷ প্রতি বছর এসএসসি হবে৷ ওএমআর কপি সবাই বাড়ি নিয়ে যাবেন৷ এসব আমাদের অঙ্গীকার৷”
তৃণমূলের জেলা সভাপতি আবদুর রহিম বকসির উদ্দেশ্যে শুভেন্দুর কটাক্ষ, “ওর মুখে এখন বড় বড় কথা৷ ও নাকি আমার হাত-পা ভেঙে দেবে৷ আরএসপি করত ৷ আইসিডিএস-এর চাকরি বিক্রি করত৷ তৃণমূলে থাকাকালীন আমি যখন মালদার অবজারভার ছিলাম, ও আমার গাড়ির দরজা খুলত৷ ওকে কেউ দলে নিতে চায়নি৷ সবাই বলেছিল চোর৷ কিন্তু, দেড় বছর ধরে আমার গাড়ির দরজা খুলত আর বন্ধ করত৷ তাই বাম হাতে ওকে পতাকা ধরিয়েছিলাম৷ আমি লক্ষ্মণ শেঠ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোটে হারানো লোক৷ মালতিপুরে কে জিতবে জানি না৷ ওখানে হিন্দুদের সংখ্যা কম৷ কিন্তু, রহিমকে আমি জিততে দেব না৷ কথা দিয়ে গেলাম৷ তজমুল আগে ভালো ছিল৷ এখন বদলে গিয়েছে৷ আসলে চোরের দলে গিয়ে সবাই বদলে যায়৷ আমরা আগে সেটা বুঝে পালিয়ে গিয়েছি৷”
এদিন শুভেন্দু কি দলীয় নেতা-কর্মীদের ভোটে রিগিং করার উসকানিও দিয়ে গেলেন ? তিনি বলেছেন, “ওরা যদি মুসলিম বুথে 100টির মধ্যে 99টা ভোট ফেলে, তবে আপনি সনাতনি-আদিবাসী বুথে কেন 100টির মধ্যে 99টি ভোট ফেলতে পারবেন না ?”
তাঁর সংযোজন, “উত্তর মালদা আর নন্দীগ্রামকে দেখে রাজ্যের সনাতনিরা একটি এগিয়ে এলে বিজেপি এবার রাজ্যে 220টি আসন পাবে৷ গত লোকসভা নির্বাচনে মালদা উত্তর কেন্দ্রে 85 শতাংশ সনাতনি-আদিবাসী বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন৷ নন্দীগ্রামে সেই হার 65 শতাংশ৷ রাজ্যের সনাতনিরা এটা দেখে এগিয়ে আসলে ভালো৷ তবে 14 ফেব্রুয়ারির পর তৃণমূল বলবে, ভোটে লড়ব না৷ চব্বিশের ভোটে তৃণমূল আর বিজেপির ভোটের ব্যবধান ছিল 40 লাখ৷ এসআইআর-এর প্রথম ঝাঁকুনিতেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে 58 লাখ৷ আরও অবৈধ ও ভুয়ো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে৷”
উত্তর মালদায় তৃণমূলের বহিরাগত প্রার্থী নিয়েও এদিন ঘাসফুলকে খোঁচা দিতে ছাড়েননি শুভেন্দু৷ বলেন, “ওরা উত্তর মালদায় স্থানীয় প্রার্থী পায় না৷ তাই চাঁচল কেন্দ্রে ইংরেজবাজার থেকে নীহাররঞ্জন ঘোষকে নিয়ে আসতে হয়৷ লোকসভা নির্বাচনে প্রসূন ব্যানার্জির মতো একজনকে প্রার্থী করে৷ প্রসূন একটা ডাকাত, লম্পট, চরিত্রহীন৷ ইয়াসিনকে নিয়ে ও ভোট লুট করতে গিয়েছিল৷ কেন্দ্রীয় বাহিনী রুখে দেয়৷ ও এখনও সরকারি কোষাগার থেকে মাসে এক লাখ 20 হাজার টাকা মাইনে তোলে৷ ওই আবার উত্তর মালদায় তৃণমূলের দলীয় পদে বসে রয়েছে৷ বিচিত্র এই রাজ্য ৷”

