ভারত-মার্কিন সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা-বিল কি প্রভাব ফেলবে বাণিজ্য চুক্তিতে
এই বিলটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ, যা অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমাগত অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে চলেছে ।

Published : July 31, 2026 at 7:52 PM IST
নয়াদিল্লি, 31 জুলাই: ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে অনিশ্চিয়তার মেঘ জমতে শুরু করেছে ৷ রাশিয়ার কাছ থেকে যে সব দলগুলি অপরিশোধিত তেল কেনে, তাদের উপর 100 শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে চেয়ে একটি বিল পাশের উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৷ ভারতও রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনে ৷ এই বিলের প্রভাব ভারতের উপরও পড়তে পারে ৷ ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি যখন ধীরগতিতে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই এই বিল পাশের উদ্যোগের জেরে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ।
যে বিলটি নিয়ে আলোচনা চলছে, তার নাম - ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ 2026’ ৷ ইতিমধ্যে মার্কিন সেনেট বিলটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ৷ এবার এই বিল পাশ হয়ে গেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক পাঁচটি প্রধান দেশের উপর 100 শতাংশ শুল্ক লাগু করতে পারবেন ৷ এই পাঁচটি দেশ হল — ভারত, চিন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান ৷ এছাড়া বিলের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করতে পারবে ৷ আর রাশিয়া থেকে আমেরিকায় যে সামগ্রী আমদানি করা হয়, সেগুলির উপরও চাপাতে পারবে 500 শতাংশ শুল্ক ৷
এমন এক সময়ে এই পদক্ষেপ করা হল যখন আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা আবারও একটি জটিলতার মুখে পড়ল ৷ কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে যে শুল্ক-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারতকে বাড়তি সুবিধা দেবে কি না, তা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে ।
রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত এই মার্কিন বিল নিয়ে ভারত সরকার এখনও কোনও মন্তব্য করেনি ৷ দেশের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, কোনও অনুমান নিয়ে সরকার মন্তব্য করে না । এদিকে ইরান-মার্কিন সংঘাত এবং তার জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে থাকায় বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল সরবরাহে প্রভাব পড়েছে ৷ এই পরিস্থিতিতে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে ৷
2026 সালের মে মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি মোট আমদানির 40 শতাংশ ছাড়িয়ে যায় । যদি এই মার্কিন বিলটি আইনে পরিণত হয় এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কোনও সমাধান না হয়, সেক্ষেত্রে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, ‘‘রুশ তেলের ওপর আমাদের নির্ভরতা বেড়েছে, তাই এই 100 শতাংশ শুল্ক আমাদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে । আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানির দিকে ঝুঁকি, তবে পরিবহণ খরচ অনেক বেড়ে যাবে । তখন আমরা কীভাবে মূল্যবৃদ্ধি সামাল দেব ? এর ফলে এক ধরনের ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব (ক্যাসকেডিং এফেক্ট) তৈরি হবে ।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এটি কেবল একটি বিরক্তির কারণের চেয়েও বড় কিছু হতে চলেছে । ট্রাম্প এই বিলটি পাশের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন । ফলে ভারতীয় অর্থনীতিকে বড় ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে ।’’ যদিও মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে অনুমোদন পাওয়া থেকে শুরু করে নির্বাহী অনুমোদন পাওয়া পর্যন্ত এই বিলকে আইনে পরিণত হতে এখনও কয়েকটি ধাপ পার হতে হবে ।
তবে একজন মার্কিন সেনেটর জন থুন আশা প্রকাশ করেছেন যে বিলটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পাশ হবে । তিনি বলেন, ‘‘এই দেশ এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল । আমি আশা করি, আমরা এটি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারব এবং শেষ পর্যন্ত বিলটি পাশ করে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারব ৷ আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এটা সম্পন্ন হবে ৷"
মার্কিন প্রশাসন এখনও পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে শুল্ক আরোপ নিয়ে যে যে ঘোষণাগুলি করেছে, তার মধ্যে এই বিলের বিষয়টিই সর্বশেষ পদক্ষেপ ৷ এই বিল ভারতের স্বার্থকে প্রভাবিত করছে এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে ।
ট্রাম্প সম্প্রতি জেনেরিক ওষুধের ওপর পর্যায়ক্রমিক শুল্ক আরোপের একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন । এর আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র 2028 সালের অগস্ট থেকে 100 শতাংশ শুল্ক আরোপ শুরু করবে এবং 2029 সালের অগস্টে তা বাড়িয়ে 200 শতাংশ করা হবে, যাতে কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের জন্য পর্যাপ্ত সময় পায় ।
এর ফলে ভারতের ওষুধ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ৷ কারণ, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম জেনেরিক ওষুধ সরবরাহকারী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জেনেরিক ওষুধের চাহিদার প্রায় 40 শতাংশই এখান থেকে মেটানো হয় ।
এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘ট্রেড অ্যাক্ট’-এর 301 নম্বর ধারার আওতায় ভারতের ওপর 10 শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে । জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ৷ ভারত ছাড়াও আরও 59টি দেশের উপর এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ৷
এখন প্রশ্ন হল, 2025 সালে ঘোষণা হওয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রথম ধাপটির কী হবে ? শুল্কের বিষয়টি এই প্রথম ধাপ চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে ৷ কারণ, ভারতে আশঙ্কা রয়েছে যে অন্য দেশগুলো হয়তো আরও ভালো শুল্ক সুবিধা পেয়ে যাবে ৷ যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রফতানি পণ্য তার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাবে ।
চুক্তির কাঠামো আগেই ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত করা হয়েছিল ৷ তবে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ফের বলেন, ‘‘ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তিটি তখনই কার্যকর হবে, যখন আমেরিকা এটা নিশ্চিত করবে আমাদের প্রতিবেশী দেশ, আসিয়ান (ASEAN) অঞ্চল এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় আমরা তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছি ৷’’
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তাঁর শুল্ক-সংক্রান্ত নীতি মিত্র, অংশীদার ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর প্রতি তাঁর বিদেশনীতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে । এই শুল্ক নীতির মাধ্যমে তিনি মার্কিন উৎপাদন ক্ষেত্রকে চাঙ্গা করা, বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনের জন্য নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন ৷ এটা তাঁর সমর্থকদের কাছে করা অন্যতম প্রধান একটি প্রতিশ্রুতি ।
বিশ্বজিৎ ধর উল্লেখ করেন যে, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (BTA) মার্কিন পণ্য ও কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বিশাল বাজারের দরজা খুলে দেবে । এর অর্থ হল, ট্রাম্পের জন্য ভারতের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি অত্যন্ত লাভজনক হবে ৷ তাই তিনি এই বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবেন ।
বিশ্বজিৎ ধর বলেন, "ট্রাম্পের পুরো বাণিজ্য নীতিই ভারত ও চিনের মতো বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভরশীল । চিন এখন তার বাণিজ্যে বৈচিত্র্য এনেছে এবং তাদের ক্ষেত্রে মার্কিন বাজারের উপর বড় কোনও নির্ভরতা নেই । এখন একমাত্র বড় দেশ হিসেবে ভারতই অবশিষ্ট রয়েছে এবং সেটিই তার কাছে বড় এক প্রাপ্তি বা 'বড় পুরস্কার' হতে পারে ।" তিনি আরও বলেন, "তাঁকে এটা প্রমাণ করতে হবে যে তিনি ভারতের কাছ থেকে কিছু ছাড় আদায় করতে পেরেছেন । আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে চলেছে ৷ তিনি ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন ।"
দীর্ঘ সময় ধরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, উভয় দলের সমর্থন পেয়ে এসেছে ৷ কারণ, চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লিকে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ-বলয় বা ‘বুলওয়ার্ক’ হিসেবে বিবেচনা করত ওয়াশিংটন ।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদে মিস্টার ট্রাম্প অনেক বেশি ‘লেনদেন-ভিত্তিক’ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিতে বাণিজ্যকে ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন । বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেসচিব মার্কো রুবিও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নিলেও এবং ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিজের বন্ধু হিসেবে অভিহিত করলেও, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনও কিছু টানাপড়েন রয়ে গিয়েছে ।
থিংক-ট্যাঙ্ক 'অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন'-এর বিশিষ্ট ফেলো মনোজ জোশি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে । তিনি বলেন, "দুই দেশের সম্পর্ক এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে এবং তা মূলত লেনদেন-ভিত্তিক মানসিকতা দ্বারা পরিচালিত । শুল্ক ও অভিবাসন সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কিছু নীতির ক্ষেত্রে যে তারা মিত্রদেশগুলোর জন্যও কোনও ছাড় দেবে না, তা যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দিয়েছে । তবে রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্যের কারণে ভারত যদি কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে, তবে টানাপোড়েন বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে ।"

