নয়া কৌশল, কুর্দুস-বালোচদের কাজে লাগিয়ে ইরান-বিভাজনের পরিকল্পনা আমেরিকা-ইজরায়েলের
আইএসআইএসের সঙ্গে লড়তে কুর্দুসদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ৷ এবার তাদেরই যুদ্ধে কাজে লাগাতে চায় আমেরিকা-ইজরায়েল ৷

By Bilal Bhat
Published : March 8, 2026 at 3:14 PM IST
সামরিক সংঘাতের মধ্যে ইরানকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে ইজরায়েল ও আমেরিকা ৷ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ভিতর সক্রিয় বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী বর্তমান প্রশাসনের অবসান ঘটাতে চায় ৷ তার জন্য এতদিন ধরে যথাযথ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল ৷ তাদের মদত দেওয়ার কৌশল নিয়েছে আমেরিকা ও ইজরায়েল ৷ এই সমস্ত বাহিনীর অন্যতম ইরানের কুর্দুসরা ৷ সিরিয়ায় আইএসআইএসের সঙ্গে লড়ার জন্য দুনিয়ার অন্যতম সেরা ও সাহসী এই যোদ্ধাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয় আমেরিকা ৷ ইরান প্রশাসনকে দেশের ভিতর ও বাইরে চাপে ফেলতে প্রস্তুত কুর্দুসরা ৷
আমেরিকা ভেবেছিল সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লা আলী খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে ৷ এরপর দেশে সক্রিয় জনগোষ্ঠীগুলি সমর্থন করবে আমেরিকাকে ৷ কার্যক্ষেত্রে উল্টোটাই হয়েছে ৷ এতদিন পর্যন্ত ইরানের যে প্রশাসনকে মানুষ পছন্দ করত না এখন তারাই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে ৷ এমন একটা সময় আমেরিকা আর ইজরায়েল চাইছে কুর্দুসের মতো বাহিনীকে আসরে নামিয়ে চলতি লড়াইকে এক সম্পূর্ণ অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে ৷

ইরানের জনসংখ্যার 10 শতাংশ কুর্দুস বাহিনীর সদস্য ৷ সে দেশের ইসলামিক শাসনের অবসান ঘটাতে অনেকদিন ধরেই তারা সচেষ্ট ৷ জমি বরাবর আক্রমণ (Ground Offensive) চালিয়ে নিয়ে যেতে এই বাহিনীর চেয়ে ভালো এবং দক্ষ আর খুব একটা কেউ নেই ৷ এর আগে আইআরজিসি-র সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করেছে কুর্দুসরা ৷ এদের ঘাতক বাহিনী সীমান্ত পেরিয়ে জমি ধরে আক্রমণ চালিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম ৷ আমেরিকার হয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি ওয়ার বা নকল যুদ্ধ লড়ে চলেছে এই বাহিনী ৷ এবার তারা দেশে ফিরতে চায় ৷
বাশার আল আসদের পতনের পর সিরিয়ায় তাদের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয় ৷ এখন নিজেদের অপাঙেতয় ভাবার যথেষ্ট কারণ তাদের কাছে আছে বলে মনে করেন অনেকে ৷ তারা নিদজেদের উপেক্ষিতও ভাবে ৷ ইরান এবং তুরস্ক দু'তরফ থেকেই চাপ অনুভব করে কুর্দুসরা ৷ পাশাপাশি বালোচকেও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চায় ইজরায়েল ও আমেরিকা ৷ বালোচরা পাকিস্তানের থেকে স্বাধীনতা পেতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ৷ তাদের নৈতিকভাবে সমর্থন করে ভারত ৷ যুদ্ধে বালোচ অংশ নেওয়ার আগেই পদক্ষেপ করে রেখেছে পাকিস্তান ৷ গতবছর তাদের সঙ্গে সৌদি আরবের মধ্য়ে হওয়া চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে ইসলামাবাদ ৷ ইরানকে তাদের বার্তা ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালানো যাবে না ৷
বালোচ বা কুর্দুসরা যদি ইরানের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ শুরু করে তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হবে ৷ সংঘাত হবে আরও তীব্র ৷ বিষয়টি অনেকটা হয়ে উঠছে আমেরিকা-আফগানিস্তান যুদ্ধের মতো ৷ আফগান যুদ্ধেও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল আমেরিকা ৷ 'হাজারাস' গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছিল ওয়াশিংটন ৷ 20 বছর ধরে সংঘর্ষে লিপ্ত থেকেছে দু'পক্ষ ৷ আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর অস্বস্তি রেখে শান্তি সমঝোতা করেছে এই দুই বাহিনী ৷ আফগানিস্তান ছাড়ার সময় বহু মারণ অস্ত্র রেখে গিয়েছিল আমেরিকা ৷ তালিবান 20 বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী ৷ তাদের বেশিরভাগ নেতাই ছিল আমেরিকার হিটলিস্টে ৷ সেই গোষ্ঠীর সঙ্গেই শেষমেশ সমঝোতা করেছিল আমেরিকা ৷ যে তালিবানকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বলে মনে করত দোহা চুক্তিতে সই করে তাদের উপরই আফগানিস্তান পরিচালনের ভার ছেড়েছিল আমেরিকা ৷ তালিবানে নাম লেখানো জঙ্গিরা আবার 'পাস্তুন' গোষ্ঠীর অংশ ৷

একইভাবে ইরান প্রশাসনের যোদ্ধারা দেশের দুটি ধর্মীয় কেন্দ্র-হউস-ই-কোম এবং হউস-ই-মাসাদের অংশ ৷ প্রশাসনের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক খুবই গভীর ৷ এই ব্যবসায়ীরা ইরানের ধর্মীয় সংগঠনগুলিকে দেশের ভিতরে ও বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালাতে সাহায্য করেন ৷ কুর্দুসের এই ইরানি সংস্করণকে যুদ্ধের ব্যাপারে অপটু ভাবার কোনও কারণ নেই ৷ অন্য অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তারা জানে আইআরজিসি-র মতো গোষ্ঠীর মোকাবিলা কীভাবে করতে হয় ৷ সবমিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরের সামরিক অভিযান কোনও পক্ষের কাছেই সহজ হবে না ৷ কুর্দুসরা এখন যুদ্ধের অংশ হলে ইরানের সামরিক গোষ্ঠীগুলি ধরেই নেবে সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পিছনেও তাদের ভূমিকা ছিল ৷
বালোচরা আমেরিকাকে সমর্থন করতে মরিয়া ৷ কারণ, তারা একটা দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী সরকার চালিয়ে আসছে ৷ তারা চিন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরের বিরোধিতা করেছে ৷ একাধিকবার আক্রমণও করেছে চিনের ইঞ্জিনিয়রদের ৷ চিন-বিরোধিতা নিজেদের অজান্তেই তাদের আমেরিকার পক্ষ নিয়ে লড়াই করার জন্য এক আদর্শ বাহিনীতে পরিণত করেছে ৷ তবে বালোচকে যুদ্ধের অংশ করা নিয়ে ইতিমধ্যেই নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়ে রেখেছে পাকিস্তান ৷ ঘটনাচক্রে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করলে বালোচরাও প্রতিদানে কিছু একটা চাইবে ৷ এটা আমেরিকাকে উভয় সঙ্কটের সামনে এনে দাঁড় করারে ৷ একদিকে ওয়াশিংটন বালোচদের কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা পাকিস্তানের অপছন্দের কারণ হবে ৷ অন্যদিকে, আমেরিকার স্বার্থও বিঘ্নিত হবে ৷ যদিও ইরানের বিরুদ্ধে জমি বরাবর আক্রমণ চালিয়ে নিয়ে যেতে বালোচ যোদ্ধাদের উপর আস্থা রাখার ব্যাপারে ইজরায়েলের কোনও সমস্যা হবে না ৷
ইরানের শক্তিক্ষয় হবে ধরে নিয়েই খামেনেইকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল আমেরিকা ৷ তাদের মনে হয়েছিল, বর্তমান প্রশাসনের কাজে যাঁরা অখুশি তারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ ও আন্দোলন সংগঠিত করবেন ৷ কিন্তু বদলে যেটা হল সেরকম যে কিছু হতে পারে সেটা আমেরিকা ধারণা করতে পারেনি ৷ ইরান এভাবে আমেরিকাকে জবাব দেবে সেটাও বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল ওয়াশিংটন ৷ আসাদ জমানার পতনের পর কুর্দুসরা আক্রমণের শিকার হয়েছিল ৷ তার ধরন থেকেও স্পষ্ট এই লড়াই খুব সহজ হবে না কোনও অবস্থায় ৷ একইভাবে তাদের জন্য প্রাণ দেওয়া আফগানদের আত্মত্যাগ অবহেলা করেই আফগানিস্তান ছেড়েছিল আমেরিকা ৷ সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ৷

মার্কিন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাদের ও ইজরায়েলের বাহিনীর পক্ষে ইরানের জমি বরাবর আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া খুব একটা সহজ হবে না ৷ আর মাটি কামড়ানো আক্রমণ বা জনজাগরণ ছাড়া ইরানের প্রশাসনের অবসানও অসম্ভব ৷ ইজরায়েল জানে তারা কেন লড়ছে ৷ ইরানের লড়াই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ৷ কিন্তু ওয়াশিংটন পড়েছে ফাঁপড়ে ৷ ইরানের সরকার ফেলতে যে সমস্ত উপায়ের সাহায্য নিয়েছিল সেটাই এখন হোয়াইট হাউজের সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে ৷

