ETV Bharat / opinion

ঢাকায় মুখোমুখি গোর-দীনেশ, দুই রাষ্ট্রদূতের বৈঠকের কী প্রভাব বিশ্ব-রাজনীতিতে ?

গত শুক্রবারের বৈঠকে কী নিয়ে কথা হয়েছে সে ব্যাপারে কোনও তথ্য় দিতে রাজি হননি গোর ৷ শুধু এটুকু জানিয়েছেন, দুজনের মধ্যে ইতিবাচক বৈঠক হয়েছে ৷

india us tie
মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের সঙ্গে দেখা হল বাংলাদেশে কর্মরত রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর (ছবি: ভারতে আমেরিকার দূতাবাসের এক্স হ্যান্ডেল)
author img

By Aroonim Bhuyan

Published : August 3, 2026 at 8:52 AM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের সঙ্গে দেখা হল বাংলাদেশে কর্মরত রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর ৷ ঢাকার এই বৈঠক এমন সময় হল যখন বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে ৷ আলোচনার বিষয় বস্তু সম্পূর্ণ জানা যায়নি ৷ তবে মনে করা হচ্ছে ভারত আর আমেরিকার মধ্যে যে দৃঢ় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে চিনের বাড়তে থাকা প্রভাবকে প্রশমিত করা নিয়ে বৈঠকে কথা হয়েছে ৷ ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, গত শুক্রবার এই বৈঠকটি হয়েছে ৷ তবে সেখানে কী নিয়ে কথা হয়েছে সে ব্যাপারে কোনও তথ্য় দিতে রাজি হননি গোর ৷ শুধু এটুকু জানিয়েছেন, দুজনের মধ্যে ইতিবাচক বৈঠক হয়েছে ৷

এখন ভারতের কৌশল প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা ৷ আবার আমেরিকা চাইছে ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকায় কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে ৷ আর এই প্রক্রিয়ায় দুটি দেশ একে অপরের কাছাকাছি চলে আসছে ৷ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সমুদ্র-নিরাপত্তা এবং আরও বেশি ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মতো বিষয়কে সামনে রেখে এই নৈকট্য ক্রমশ প্রবল হচ্ছে ৷ ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকায় বাংলাদেশের ভূমিকা আবার বিরাট ৷ সে দেশের তিনদিকে ভারত আর একদিকে মায়ানমার ৷ এখান থেকে ভারতের বিশেষ করে উত্তর পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে দরকারি চিকেনস নেকের দূরত্বও বেশি নয় ৷

সেদিক থেকে বাংলাদেশে কোনও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর পড়ে ৷ সীমান্তকে সুরক্ষিত করা থেকে শুরু করে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্পের নির্মাণ অথবা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রেও দেখা দেয় জটিলতা ৷ রেল যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ জলপথ, সড়ক করিডোর, উপকূলীয় নৌ-পরিবহণ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের ব্যাপারে সুবিধা- মূলত এই কয়েকটি বিষয়কে মাপকাঠি ধরলে বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ৷ নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচ্য ৷ বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের যাতে কোনওভাবে বাড়বাড়ন্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে ভারত সাহায্য করে ৷ কখনও গোয়েন্দা তথ্য় দিয়ে ৷ কখনও আবার সরাসরি সন্ত্রাস দমনের মাধ্যমে ৷ পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি টাকার লেনদেন করে ভারত ৷

বাংলাদেশেকে বিদ্যুৎ ক্ষেত্র থেকে শুরু করে এ সংক্রান্ত সহযোগিতার ব্যাপারে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে ভারত ৷ ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরির পাশাপাশি ক্রস বর্ডার ট্রান্সমিশন লাইন পাঠানোও এর অন্তর্ভুক্ত ৷ ওয়াশিংটনের চাহিদা আবার খানিকটা হলেও আলাদা ৷ তারা চায় বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থতায় স্থিতিশীলতা আসুক ৷ অর্থনৈতিক সংস্কার হোক ৷ আসুক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনাময় বাজার ৷ বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ, তাদের ক্রম বর্ধমান অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থায়ীত্ব, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং তার সঙ্গে যুক্ত আরও নানা বিষয় ৷ সার্জিও গোরকে দায়িত্বে এনে আমেরিকা আগেই বার্তা দিয়েছে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া নিয়ে তারা আগের থেকে অনেক বেশি আগ্রহী ৷

গোরের সঙ্গে দীনেশের বৈঠকের অভিঘাত কয়েকটি কারণে বেড়ে যায় ৷ বাংলাদেশের উপর চিনের প্রভাব বাড়তে শুরু করেছে ৷ ধীরে ধীরে অন্য সব দেশকে ছাপিয়ে চিনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি টাকার কারবার শুরু করেছে বাংলাদেশ ৷ এখন ঢাকার প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারীর নাম বেজিং ৷ পরিকাঠামোতেও আসছে চিনেরই টাকা ৷ বন্দর থেকে শুরু করে সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং শিল্পদ্যোগ-বাংলাদেশের সর্বত্র চিনের প্রভাব চোখে পড়ার মতো ৷ ঢাকার অতিরিক্ত চিন-প্রীতি ভারতের জন্য সুসংবাদ নয় মোটেই ৷ আঞ্চলিক ভারসাম্য ধাক্কা খেতে পারে বলে ভাবছে দিল্লি ৷ আমেরিকা আবার ভাবিত বঙ্গোপসাগরে চিনের দাপট নিয়ে ৷

তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারত দু'দেশের সম্পর্ককে আরও একবার মজবুত করতে চেষ্টার ত্রুটি করছে না ৷ দুদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক স্তরের মধ্যে বৈঠক, পর্যটকদের জন্য ভিসা, সেপ্টেম্বর মাসে আয়োজিত হতে চলা ব্রিকসের সম্মেলনে তারেককে আমন্ত্রণের পাশাপাশি বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্নে ঢাকাকে নিরলসভাবে সাহায্য করে চলেছে দিল্লি ৷ বাংলাদেশ সফরে এসে কক্স বাজারে রোহিঙ্গাদের রিফিউজি ক্যাম্পেও গিয়েছিলেন গোর ৷

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত রণনীতি নিয়ে চর্চা করে দিল্লির সংস্থা ইমাজিনইন্ডিয়া ৷ গোরের সঙ্গে দীনেশের বৈঠকে খানিকটা বিস্মিতই হয়েছেন সংস্থার সভাপতি রবীন্দর সচদেব ৷ ইটিভি ভারতকে তিনি বলেন, "আমার মনে হয় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা সম্পর্কের অভিঘাতের কারণেই এই বৈঠক ৷" ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন চর্চা করছেন এমন এক বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও কথা হয়েছে ৷ নাম প্রকাশ করা হবে না এই শর্তে তিনি বলেন, "গোরের বাংলাদেশ সফরকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায় ৷ এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ৷ বঙ্গোপসাগরে চিন তার শক্তি বেশ খানিকটা বাড়িয়েছে ৷ বাংলাদেশের পরিকাঠামো থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে তারা মোটা বিনিয়োগ করছে ৷ তলিকায় পারাদ্বীপ এবং মঙ্গলা বন্দরও আছে ৷ এভাবে আর্থিক ক্ষেত্রেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে চিন ৷ বাড়ছে বাণিজ্যিক আধিপত্য ৷ এসব নিয়ে আমেরিকা অবশ্যই ভাবিত ৷ বাংলাদেশের সীমান্ত-নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সীমান্ত নিরাপত্তাও ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে আগ্রহের বিষয় ৷ "

বাংলাদেশের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক রক্ষা করতে সবসময় চাইবে দিল্লি ৷ দেশের পূর্বদিক সুরক্ষিত করে আঞ্চলিক শান্তি স্থাপনের জন্য এই পদক্ষেপ করা একান্ত জরুরি ৷ আমেরিকার অভিপ্রায় অবশ্য আলাদা ৷ সুতরাং, ঢাকায় ভারত এবং আমেরিকার নৈকট্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বঙ্গোপসাগরে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা এবং চিনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে দু'পক্ষের প্রায় একই বিন্দুতে থাকা স্বার্থেরই প্রতিফলন ঘটায় ৷