ETV Bharat / opinion

অবিশ্বাসের চোরা স্রোত উপেক্ষা করে ভারত-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক মেরামতির চেষ্টা গোরের

আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাষ্ট্রদূত সের্জিয়ো গোর ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক মেরামতির চেষ্টা করে চলেছেন ৷ কিন্তু তাঁর এক্তিয়ার সীমিত ৷

US India Politics
(বাঁদিক থেকে) জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার সঙ্গে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সের্জিয়ো গোর (ছবি: @USAmbIndia আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সের্জিয়ো গোরের সোশাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত)
author img

By Nirmala Ganapathy

Published : August 26, 2026 at 12:28 AM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

নয়াদিল্লি, 25 অগস্ট: আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সার্জিয়ো গোর ভারতকে কাছে টানতে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ করেছেন ৷ তিনি কাশ্মীরকে 'ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ' বলে উল্লেখ করেছেন । তাঁর এই মন্তব্য ভারতের প্রশংসা কুড়িয়েছে ৷ অন্যদিকে গোরের এহেন মন্তব্যের সমালোচনায় মুখর হয়েছে পাকিস্তান । কূটনৈতিক স্তরে প্রতিবাদও করেছে ইসলামাবাদ ৷

গোর এখন সারা ভারত চষে বেড়াচ্ছেন ৷ দিল্লিতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল থেকে শুরু করে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি ও তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ৷ আবার প্রথম বার জম্মু-কাশ্মীর সফরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার সঙ্গেও বৈঠক সারছেন ৷ এতসব সত্ত্বেও ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে অনিশ্চয়তার ছায়া রয়েই গিয়েছে ৷

ওয়াশিংটনের সংস্থা হাডসন ইনস্টিটিউটয়ের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রবীণ গবেষক অপর্ণা পাণ্ডে বলেন, "রাষ্ট্রদূত গোর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে একটা গতি এনেছেন ৷ ট্রাম্পের দ্বিতীয়বারর শাসনকালের প্রথম বছরে এই ব্যাপারটা দেখা যায়নি ৷"

তিনি আরও বলেন, "সার্জিয়ো গোরের এই উদ্যোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে ঘনঘন ফোনে কথোপকথন এবং চলতি বছরের মে মাসে বিদেশ সচিব মার্কো রুবিয়োর চারদিনের ভারত সফর সত্ত্বেও দুই দেশের সম্পর্কে কৌশলী দিক দিয়ে একটা খামতি রয়ে গিয়েছে ৷ বাইরে থেকে দুর্দান্ত লাগলেও বাস্তবটা বদলায়নি ৷"

2025 সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসাবেমদ্বিতীয়বার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ৷ দিল্লি আশা করেছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম জমানায় আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক যেমন উষ্ণ ছিল, তেমনই থাকবে ৷ বেশ কয়েক বছর ধরে ভারত-আমেরিকা দু'দেশেরই মাথাব্যথা ছিল চিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামরিক বাড়বাড়ন্ত ৷ কিন্তু ট্রাম্পের সময়ে এই উদ্বেগ আর চোখে পড়ছে না ৷ কারণ, তিনি বেজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছেন ৷

অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশিষ্ট গবেষক মনোজ জোশী বলেন, "আমেরিকা চিনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে ৷ এখানে ভারতের গুরুত্ব অবশ্যই কমে গিয়েছে ৷ বাস্তব এটা যে, আমেরিকার প্রতিরক্ষা কৌশলে (পেন্টাগন প্রকাশিত) ভারত বা কোয়াড গোষ্ঠীর কোনও উল্লেখ নেই ৷ গোরকে দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে ৷ এটা ভারতের কাছে অস্বস্তির ৷"

ট্রাম্প আমেরিকার বিদেশ নীতিকে একেবারে নাড়িয়ে দিয়েছেন ৷ তাঁর লেনদেন-কেন্দ্রিক এই বিদেশ নীতির কোপ থেকে আমেরিকার সবচেয়ে কাছের দেশগুলিও রেহাই পায়নি ৷ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ করতে বন্ধু এবং শত্রুদের সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করেছেন তিনি ৷ তাঁর 'লিবারেশন ডে টারিফ' বা আরোপিত শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্যে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে ৷ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বিশ্বের শক্তিসম্পদের বাণিজ্যকে ব্যাহত করেছে ৷

আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ আটকে দিয়েছে ৷ কিন্তু ট্রাম্প আবার জরুরি ক্ষমতা (এমার্জেন্সি পাওয়ার) ও বাধ্যতামূলক শ্রম বিধান প্রয়োগের মাধ্যমে সেই শুল্ক আরোপ ফিরিয়ে এনেছেন ৷

দ্বি-স্তরীয় ব্যবস্থায় 10 শতাংশের মতো কম শুল্কের সুবিধা ভারত পেয়েছে ৷ কিন্তু এর সঙ্গে ওষুধ আমদানিতে চাপানো পর্যায়ক্রমিক শুল্ক কাঠামো থেকে শুরু করে আমেরিকায় উৎপাদন স্থানান্তর করা এবং রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে ভারত ও চিনের বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে বিল আনা- এই সবকিছু দুই দেশের মধ্যে একটা অবিশ্বাসের আবহওয়া তৈরি করেছে ৷

ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে শোনা গিয়েছে, কিন্তু এখনও চূড়ান্ত হয়নি ৷ এক্ষেত্রে দিল্লির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা অন্যান্য দেশগুলির উপর তুলনায় কম শুল্ক চাপানো নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে দিল্লি ৷ এর ফলে আমেরিকায় ভারতের রফতানি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে ৷ কারণ আমেরিকা ভারতের সবচেয়ে বড় রফতানির দেশ ৷

পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ভারত দুশ্চিন্তায় পড়েছিল ৷ পাকিস্তানের সামরিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়েছে ৷ ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান, ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনীরকে একজন 'মহান জেনারেল' বলে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ৷

এর উল্টোটা হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে ৷ যেমন আমেরিকার ডেপুটি বিদেশ সচিব ক্রিস্টোফার লানডাউ-এর মন্তব্য, আমেরিকা ভারতের সঙ্গে সেই একই ভুল করবে না, যা চিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা আটকাতে গিয়ে করেছে ৷ এর ফলে শুধু রাজনৈতিক অবিশ্বাসই বেড়েছে ৷

আর এইসবের মধ্যে ভারতে ট্রাম্প প্রশাসনের বন্ধুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন গোর ৷ তিনি জুনিয়র ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে 'উইনিং টিম পাবলিশিং' প্রতিষ্ঠা করেছেন ৷ আবার এর আগে প্রেসিডেন্টের সহকারী এবং হোয়াইট হাউজে ডিরেক্টর অফ প্রেসিডেনশিয়াল পার্সোলেন পদেও আসীন ছিলেন ৷ তাই তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে ৷

আমেরিকার রাষ্ট্রদূতরা সবসময় প্রভাবশালী ৷ ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর নৈকট্য এবং প্রেসিডেন্টের কাছে প্রবেশাধিকারই তাঁর জন্য ভারতের দরজা খুলে দিয়েছে ৷ ওয়াশিংটনের বিভিন্ন নীতির কারণে ভারতের সঙ্গে সু-সম্পর্কে ফাটল ধরেছে, যদিও সব নীতিই শুধু ভারতের জন্য নির্দিষ্ট নয় ৷

অগস্ট মাসে মুখ্যমন্ত্রী এ রেবন্ত রেড্ডি, সের্জিয়ো গোরের সঙ্গে ভিসা নীতি নিয়ে আলোচনা করেন ৷ এই বৈঠক এআই এবং বায়োফার্মা ক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও গভীর করা নিয়ে, উল্লেখ করেছেন আমেরিকার দূত ৷ ট্রাম্পের ভিসা নীতি ও অভিবাসী প্রত্যর্পণের ফলে মানুষে-মানুষে সংযোগে প্রভাব পড়েছে ৷ 2025 সালে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ভিসা 62 শতাংশে নেমে গিয়েছে ৷

গত জুনে সের্জিয়ো গোর তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উৎপাদন, ওষুধ এবং শক্তিসম্পদ নিয়ে আলোচনা করেন ৷ এরপর তাঁর সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল সফর জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ, যা পাকিস্তানের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ কারণ স্বাধীনতার পর থেকে কাশ্মীরের দাবি ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে ৷

সের্জিয়ো গোরের 'কাশ্মীর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ' মন্তব্যের পর ইসলামাবাদে আমেরিকার চার্জ ডি' অ্যাফেয়ার্স নাতালি বেকারকে তলব করে পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক এবং তাঁর কাছে তীব্র আপত্তি জানায় ৷ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের জম্মু-কাশ্মীর সফর ঘিরে আশা জেগেছে, এরপর আমেরিকার কাশ্মীর নীতিতে বদল আসবে ৷ কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের বিশ্বাস, তা হবে না ৷

ওয়াশিংটনের একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক সংস্থা হাডসন ইনস্টিটিউট-এর ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে সিনিয়র গবেষক অপর্ণা পাণ্ডে বলেন, "কাশ্মীর নিয়ে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য মার্কিন সরকারের কাশ্মীর ইস্যুর নীতিতে বদল আনবে না, একই থাকবে ৷" তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে ভারত ও পাকিস্তানে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূতও কাশ্মীর সফর করেছিলেন ৷ কিন্তু তাতে কিছু পাল্টায়নি ৷ গবেষকের কথায়, "এতে আমেরিকার প্রশাসনের কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি ৷"

এছাড়া মে মাসে রুবিয়ো ভারতকে 'জটিল' এবং 'স্বাভাবিক' কৌশলী অংশীদারি বলে উল্লেখ করেন ৷ বহুস্তরীয় মঞ্চগুলিকে আমেরিকার কীভাবে দেখছে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার মাঝেই রুবিয়ো ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বিদেশ মন্ত্রীদের সঙ্গে কোয়াড গোষ্ঠীর বিদেশ মন্ত্রীর বৈঠকে অংশ নেন ৷ এইসব চাপানউতোর সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৷

দিল্লি বিশ্বাস করেন, এই সম্পর্ক বহুমুখী ৷ প্রতিরক্ষা থেকে এআই- বিভিন্ন ক্ষেত্রের গভীরতাই সম্পর্ককে মেরামত করা যাবে না এমন ক্ষতি থেকে বাঁচিয়ে দেয় ৷ এক আধিকারিকের কথায়, "ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তিগুলি শক্তিশালী ৷"

এই সার্বিক অনিশ্চয়তার আবহাওয়ার সঙ্গে দোসর ট্রাম্পের ভাবনা ৷ তিনি এশিয়ায় মিত্রদেশগুলির সঙ্গে কী আচরণ করবেন, তার কোনও ঠিক নেই ৷ সম্প্রতি তিনি আমেরিকার অত্যন্ত কাছের দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার পরিমাণ কমিয়েছেন ৷ কারণ, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়ার প্রতি 'অনুপযুক্ত ও শত্রুতার' ইঙ্গিত দিয়েছে ৷ পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকার করেছে ৷ ইরান-সংঘর্ষের শুরু থেকে সেখানে মোতায়েন থাকা একটি বিমানবাহী রণতরীকে প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আরেকটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে ৷

গোর কিন্তু দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগের রাস্তা খুলে রেখেছেন ৷ কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি একা রাজনৈতিক আস্থা ফেরাতে পারবেন না ৷ প্রাক্তন বিদেশ সচিব অনিল ওয়াধা বলেন, "আমেরিকা এখনও ভারতকে চিনের ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি দেশ হিসাবে বিবেচনা করে ৷ ট্রাম্পের দ্বিতীয় শাসনকালে ভারতের সঙ্গে লেনদেন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ "

তিনি আরও বলেন, "সার্জিয়ো গোর ভারত ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক ফেরানোর জন্য লাগাতার পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ৷ তিনি ভারতের গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের বোঝাতে পেরেছেন ৷ কিন্তু এটা নিশ্চিত যে তা সীমিত, এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আসল ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই ৷"