ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব, কী কী বিষয়ে কথা হবে দুই নেতার?
বৈঠকে বসছেন ট্রাম্প-জিনপিং ৷ কী কী নিয়ে কথা বলবেন দুই নেতা ? কলম ধরলেন পলাইটিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সঞ্জয় পুলিপাকা ৷

Published : May 13, 2026 at 9:06 PM IST
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চিনের প্রেসিডেন্টের শি জিনপিংয়ের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে কূটনৈতিক বিশ্ব ৷ এই বৈঠক কি দুদেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন পথের দিশা দেখাবে ? নাকি আমেরিকা এবং চিনের মধ্যে যে 'বোঝাপড়া ভিত্তিক সংঘাত' আছে তা আরও বাড়িয়ে দেবে ? আগে ঠিক ছিল মার্চের শেষ অথবা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বৈঠক হবে ৷ কিন্তু ইরান যুদ্ধে নিয়ে ট্রাম্প অস্বস্তিতে ছিলেন ৷ আর তাই বৈঠকের দিন হিসেবে মে মাসের 14 ও 15 তারিখকে বেছে নেওয়া হয় ৷
এর আগে শেষবার কোনও মার্কিন রাষ্ট্রপতি চিনে গিয়েছিলেন 9 বছর আগে ৷ তাই এবার ট্রাম্পের চিন সফর তাৎপর্যপূর্ণ ৷ এই সফর আনুষ্ঠানিকতা আর কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ থাকবে ৷ আকর্ষণীয় নৈশভোজ আর কূটনতিক নিয়ম নীতির বাইরে গিয়ে দুটি দেশই বিশ্ব ক্ষমতার মানচিত্রে নিজেদের আলাদা জায়গা তৈরি করতে মরিয়া প্রয়াস চালিয়ে যাবে ৷

ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম অধ্য়ায়ের থেকে এবার বিপরীত পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক বেশি তৈরি চিন ৷ ট্রাম্পের নিষ্ঠুর মন্তব্য হজম করতে প্রস্তুতও বটে ৷ ট্রাম্প আর জিনপিংয়ের মধ্যে এ নিয়ে 6টি বৈঠক হয়েছে ৷ তার মধ্যে সফরে গিয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি কোনও সম্মেলনে অংশ নিয়ে একান্তে মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টিও আছে ৷ ট্রাম্প কী করতে পারেন এবং করতে চান তা আগের থেকে এখন অনেক ভালো অনুধাবন করতে পারেন চিনের নেতারা ৷ ট্রাম্পের কূটনৈতিক কৌশলও চিনের জানা ৷
চলতি বছরে আরও বেশ কয়েকবার দেখা হওয়ার কথা ট্রাম্প এবং জিনপিংয়ের ৷ চিন এপিইসির মাথায় ৷ আবার আমেরিকা এখন জি20 পরিচালনের দায়িত্বে ৷ দু'পক্ষের নীতি নির্ধারকরা এখন একাধিকবার একে অন্যের রাজধানীতে যাবেন ৷ কথা বলবেন ৷ মতামত গঠন করবেন ৷ ট্রাম্প আর জিনপিং বৈঠক সেই সমস্ত আলোচনার রূপরেখা ঠিক করে দেবে ৷
প্রসঙ্গ ইরান
প্রকাশ্যে কেউ স্বীকার না করলেও এই আলোচনার বড় অংশ জুড়ে থাকতে চলেছে ইরান ৷ ইরান যুদ্ধ চিনকে কয়েকটি সমস্যার মুখে ফেলে দিয়েছে ৷ আবার কয়েকটি সুযোগের সামনে এনেও দাঁড় করিয়েছে ৷ ইরানের তেলের 80 শতাংশই এবার চিন কিনেছে ৷ তা তাদের সমুদ্র পথে হওয়া তেল আমদানির 13.4 শতাংশ ৷ যুদ্ধের জেরে ইরান থেকে আগের মতো সস্তায় তেল কিনতে পারছে না চিন ৷ সেটা তাদের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ৷

অন্যদিকে, যুদ্ধ চিনকে অপার সম্ভবনার সামনেও দাঁড় করিয়েছে ৷ যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমেরিকা এবং ইরানকে মুখোমুখি বসিয়েছে ৷ দুটি দেশের মধ্যে বার্তা বাহকেরও কাজও করছে তারা ৷ ইরানের সঙ্গে কথা বলতে কোনও সমস্যা হলে পাকিস্তান চিনের সাহায্য নেয় ৷ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ইরানের সঙ্গে নিবিড় রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে চিনের ৷ আর তাই ইরানকে অবস্থান পরিবর্তনের জন্য বাধ্য করতে পারে চিন ৷ ঠিক এই কারণে পাকিস্তানের সমঝোতা-কৌশলের নেপথ্যে চিনের ভূমিকা সব বিচারেই উল্লেখ করার মতো ৷
ইরানকে চিন অস্ত্র দিয়ে সাহয্য করে কি না তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আছে আমেরিকা ৷ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চিনের নেতাদের বলে দিয়েছেন তাঁরা যেন ইরানকে অস্ত্র না দেন ৷ চিন থেকে ইরানের দিকে যাওয়া অস্ত্র ভর্তি জাহাজ আটকানো হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প জানিয়েদেন ইরানকে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দিলে চিন বড় সমস্যার সম্মুখীন হবে ৷ তার মানে চিনের কাছে দুটো রাস্তা ৷ হয় ইরানকে সামরিকভাবে সাহায্য করা নয়তো ইতিবাচক শান্তি প্রস্তাবের দিকে নিয়ে যাওয়া ৷ এখানেই চিনের কাছে সুযোগ খোদ ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতা করার ৷
প্রসঙ্গ তাইওয়ান
আমেরিকা-চিনের আলোচনায় তাইওয়ানের প্রসঙ্গ উঠে আসতে পারে ৷ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে তাইওয়ান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ৷ বেজিং তাইওয়ানকে সম্পূর্ণ চিনের দখলে আনতে চায় ৷ আর তাই অনেক দিন ধরে আমেরিকা তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে আসছে ৷ যে অবস্থায় তাইওয়ান আছে তার সামান্য বদলও আমেরিকার কাছে গ্রহণযোগ্য নয় ৷ চিন চায় আমেরিকার তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করুক ৷ একই সঙ্গে অস্ত্রও না বিক্রি করুক ৷ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবার আগেই ঘোষণা করেছেন তাইওয়ান তাদের সস্তার ব্যবসায় ভাগ বসিয়েছে ৷ তাই এমতাবস্থায় তিনি যে তাইওয়ান নিয়ে সদয় হবেন এমন ভাবার কোনও বিশেষ কারণ নেই ৷ তবে আমেরিকা যাতে তাইওয়ান নিয়ে মনোভাবের বদল ঘটায় সেই চেষ্টায় কোনও ফাঁক রাখবে না চিন ৷
আর্থিক বিষয়
আর্থিক সহযোগিতা এবং লেনদেন এই আলোচনার একটা বড় অংশ জুড়ে যে থাকবে তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই ৷ আমেরিকা এবং চিনের মধ্যে একাধিক বিষয়ে সংঘাত আছে আর তার জেরে দুদেশের আর্থিক সম্পর্ক ততটা সহজ-স্বাভাবিক নয় ৷ ইন্টালেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস নিয়ে দু'দেশের মধ্য়ে মিলের চেয়ে অমিল অনেক বেশি ৷ চিনের ব্যবসার ধরণ আর আমেরিকার শুল্ক নীতির কথাও বলতে হবে আলাদা করে ৷ গতবছর চিনের উপর 145 শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প ৷ পাল্টা আমেরিকায় ধাতু পাঠানো বন্ধ করে দেয় চিন ৷ এই ধরনের ধাতু মোবাইল-ড্রোন এবং যুদ্ধবিমান-সহ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত এমন নানা সামগ্রী উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় ৷

তাদের দেশে উৎপাদনের গতি এখন কমে এসেছে ৷ এমতাবস্থায় আমেরিকার সঙ্গে আরও একটা শুল্ক যুদ্ধ শুরু করতে চাইবে না চিন ৷ তাছাড়া পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে আমেরিকা নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে চিনের উপর শুল্ক আরোপ করতে পারছে না ৷ ইরান যুদ্ধের জেরে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির মধ্যে ট্রাম্প আরও একটি শুল্ক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন এমন সম্ভাবনাও বেশ কম ৷
ট্রাম্প প্রশাসন চাইবে চিন তাদের থেকে প্রচুর পরিমাণে কর্ন থেকে শুরু করে সোয়াবিনের মতো কৃষিজাত পণ্য কিনুক ৷ চিন আগে কথা দিলেও শেষমেশ কেনেনি ৷ তাছাড়া আমেরিকা আরও চাইবে চিন তাদের থেকে বাণিজ্যিক বিমানের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে অন্য ইঞ্জিনিয়ারিংজাত সামগ্রীও কিনুক ৷ কোনও রকম আর্থিক চাপ না এলে চিন দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা থেকে এই ধরনের সামগ্রী কিনবে এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই ৷
সেই সূত্র ধরে চিনকে চাপে রেখতে গেলে পূর্ব এশিয়ায় কার্যকর এমন কোনও কৌশলের সাহায্য নিতে হবে আমেরিকাকে ৷ কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হয় না চিনের আর্থিক প্রগতির পাল্টা হিসেব তারা কোনও কৌশল নেওয়ার কথা ভাবছে ৷ প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা নিয়ে আমেরিকার আলাদা ভাবনা আছে ৷ সেখানে তারা অংশীদারিত্ব খোঁজার প্রয়াসও শুরু করেছে ৷ শুধু তাই নয়, এমন বন্ধুর খোঁজ তারা শুরু করেছে যাদের সঙ্গে নিয়ে তারা স্বচ্ছ্বতার সঙ্গে এক বিকল্প মুক্ত বাজার তৈরি করতে পারবে ৷

চিনের জন্য তাদের কৌশল খানিকটা আালদা ৷ একদিকে চিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কে জোর দিয়েছে আমেরিকা ৷ আঞ্চলিক পর্যায়ে চিনের সঙ্গীদের উপরও শুল্কও আরোপ করেছে ৷ আর এভাবে ঘুরপথে আমেরিকা চিনকে স্থানীয় স্তরে ব্যবসা বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে ৷ এখন চিনের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার হল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি ৷ মোট ব্যবসার পরিমাণ 1.055 ট্রিলিয়ন ডলার ৷
এআই এবং প্রযুক্তি
ডিজিটাল প্রযুক্তির দুনিয়া আমেরিকা ও চিনের মধ্যে সংঘাতের আরও একটি বড় কারণ ৷ আমেরিকা অ্য়াডভান্সড এআই এবং সেমিকন্ডাক্টার চিপস রফতানির উপর কিছু বিধিনিষে আরোপ করেছে ৷ ট্রাম্পের সফরে এই দুটি বিষয়ে কোনও সমঝোতা হলেও সেটা হবে অল্প সময়ের জন্য ৷ তার কারণ চিন চাইছে প্রযুক্তিতে সেরার সেরা হয়ে উঠতে ৷ তাও আবার আমেরিকা এবং পশ্চিম বিশ্বের উপর নির্ভরতা প্রায় না রেখে ৷ আপাতত সেমিকন্ডাক্টার চিপস আমেরিকা থেকে নিলেও আগামিদিনে সেই নির্ভরতা কমিয়ে আনার পথে হাঁটবে চিন ৷ এআই এবং সেমিকন্ডাক্টার চিপসের প্রশ্নে তারা অবশ্যই চাইবে আত্মনির্ভর হতে ৷

শেষ কথা
সবমিলিয়ে বোঝাই যায় আমেরিকা এবং চিনকে একমত হতে অনেক পরিশ্রম করতে হবে এমন সমস্যার সংখ্যা নেহাত কম নয় ৷ তবে আলোচনা শেষমেশ সফল হবে কি না তা নির্ভর করবে কোন নেতা কীভাবে এবং কতটা দাবি আদায় করতে পারেন ৷ অতীতে দেখা গিয়েছে, সমস্ত প্রস্তুতি থাকার পরও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক সফরকে ব্যক্তিগত সফর বলা ভালো ভ্রমণের রূপ দিয়ে ফেলেন ৷ অন্যদিকে, সর্বোচ্চ এবং নির্ণায়ক শক্তি হয়ে ওঠার রাস্তা থেকে মোটেই সরে আসতে চাইবে না চিন ৷ মানে দু'পক্ষ সম্পূর্ণ আলাদা ভাবনা এবং অবস্থানকে পাথেয় করে আলোচনার টেবিলে বসছে ৷ আর তাই এই বৈঠক কোনও কিছুর শেষের রূপক হয়ে উঠবে না ৷ বরং আন্তর্জাতিক মানচিত্রে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলের সূচক হয়ে উঠবে ৷

