তালিবান-নৈকট্য : ভারতের বদলে যাওয়া বাস্তবমুখী বিদেশ নীতি
আফগানিস্তানের বিদেশমন্ত্রীকে ভারতে আমন্ত্রণ করা এবং নিজেদের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়া সবদিক থেকেই বিশেষ ৷

Published : October 15, 2025 at 5:29 PM IST
মাত্র কয়েকদিন আগে ভারতে এসেছিলেন আফগানিস্তানের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ৷ 2022 সালের জুন মাস থেকে ভারত ও অফিগানস্তানের মধ্যে যে যোগাযোগ এবং সমন্বয়ের বাতাবরণ তৈরি হয়েছেএটা সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ ৷ আফগানিস্তানের তালিবানের সরকারকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় দেশের মতো ভারতও স্বীকৃতি দেয়নি ৷ এরপর বিদেশমন্ত্রীর পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া তালিবানের নেতাকে ভারতে আমন্ত্রণ করা এবং নিজের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়া সবদিক থেকেই বিশেষ ৷
ইতিহাস কী বলছে ?
গঠনের দিক থেকে অতি চরমপন্থী ইসলামিক মতাদর্শে বিশ্বাসী তালিবান প্রথম ক্ষমতায় আসে 1996 সালে ৷ তারও আগে 1989 সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় আফগানিস্তান ৷ 2001 সালের 9 সেপ্টেম্বর আমেরিকায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয় ৷ এই ঘটনার মূলচক্রীদের তালিবান সাহায্য করেছে বলে অভিযোগ করে আমেরিকা এবং তার কয়েকটি সঙ্গী দেশ ৷ তাদের সামরিক অভিযানে তালিবান মুক্ত হয় আফাগানিস্তান ৷

তালিবান বিদায়ের পর আফগানিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার তৈরির কাজ শুরু হয় ৷ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সরকারকে স্বীকৃতিও দেয় ৷ এই সময়ে আফগানিস্তানের মধ্যে তালিবানের বিরুদ্ধে লড়াই করে মার্কিন সেনা ৷ 2020 সালে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় হোয়াইট হাউজ ৷ শর্ত ছিল একটাই- আমেরিকা বা তার সহযোগী কোনও দেশকে নিশনা করবে না তালিবান ৷ আশা করা হয়েছিল সমস্ত রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে একত্রিত করে নতুন সরকার তৈরি হবে আফগানিস্তানে ৷ আলোচনা এবং সমঝোতার হাত ধরে উঠবে নতুন সূর্য ৷ সেই প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছিল । তবে তা মাঝপথে ভেস্তে যায় ৷ 2021 সালের 15 অগস্ট কোনও বাধা ছাড়াই রাজধানী কাবুল দখল করে তালিবান ৷ সরকারের পতন হয় ৷ আফগানিস্তানে শুরু হয় দ্বিতীয় তালিবান যুগ ৷ সেই শুরু ৷ তারপর থেকে ক্রমশ আফগানিস্তানের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে চলেছে তালিবান ৷ তবে আইএসআইএস তাদের কখনও কখনও কিছুটা বিপদে ফেলে ৷
ক্ষমতায় আসার পর প্রথমদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায় সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল তালিবানকে ৷ তাদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছে ৷ রাশিয়া আফগানিস্তানকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছে ৷ আবার চিনের মতো দেশ তালিবানের সঙ্গে নানা স্তরে সমন্বয় স্থাপন করছে ৷

বর্তমান পরিস্থিতি
ভারত এবং আফগানিস্তানের একে অপরকে নানা কারণে দরকার ৷ আফগানিস্তানে 2001 থেকে 2021 সালের মধ্যে 3 বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে ভারত ৷ আর তাই কাবুল বারবার দিল্লিকে জানিয়েছে,আফগানিস্তানের পরিস্থিতি এখন বিনিয়োগ সহায়ক ৷ শুধু তাই নয়, ভারত নিজের অসমাপ্ত প্রকল্প যাতে শেষ করতে পারে সে কথাও বলেছে আফগানিস্তান ৷ তারা জানে ভারতের সঙ্গে সংযোগ থাকলে তাদের দেশ নতুন করে গড়ার কাজ আগের থেকে অনেক সহজ হবে ৷ অন্যদিকে, ভারত-যোগ তালিবানকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলবে বলে মনে করে কূটনৈতিক মহলের একাংশ ৷

নয়া তালিবানের সঙ্গে সংযোগ তৈরির ব্যাপারে ভারতের নির্দিষ্ট নীতি আছে ৷ আর সেই নীতির ভিত্তি নিরাপত্তা-পরিস্থিতি ৷ আফগানিস্তানের মাটি ভারত বিরোধী কার্যকলাপের জন্য যাতে ব্যবহৃত না হয় তা নিশ্চিত করা দিল্লির কাছে অগ্রাধিকার ৷ 2021 সালে পাকিস্তান চেষ্টা করেছিল আফগানিস্তানের মাটিকে ভারত বিরোধী কার্যকলাপে ব্যবহার করতে ৷ সেবার পাকসেনা এবং আইএসআইএসের মধ্যে সমন্বয়ও চোখে পড়ে ৷ এই ধরনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর দিল্লি ৷

আফগানিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফর আচমকা কোনও সিদ্ধান্ত নয় ৷ 2021 সালের 31 অগস্ট আফগানিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা হয় তালিবানদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতার ৷ 2022 সালে বিদেশ মন্ত্রকের যুগ্ম সচিবদের একটি দল আফগানিস্তান সফরে যায় ৷ এরপর সেদেশের ভারতীয় দূতাবাসে একটি বিশেষ টিম মোতায়েন করে ভারত ৷ এদের কাজ আফগানিস্তানে ভারতের অর্থে চলতে থাকা বিভিন্ন প্রকল্পের গতিপ্রকৃতি খতিয়ে দেখা ৷ এরই মধ্যে আফগানিস্তানে যে কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে সবার আগে পাশে দাঁড়ায় ভারত ৷ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দুবাইতে আফগানিস্তানের বিদেশ মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয় ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রীর৷
পাকিস্তানের ভূমিকা
2021 সাল পর্যন্ত পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে যে সুসম্পর্ক ছিল এখন তাতে খানিকটা বদল এসেছে ৷ দু'দেশেক মধ্য়ে থাকা আন্তর্জাতিক সীমান্তের কয়েকটি বিষয় নিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে মতপার্থক্য হয়েছে ৷ আফগানিস্তান দাবি করে আইএসআইএসে (কাবুল)-কে মদত করে পাকিস্তান ৷ আবার টিটিপি নামে অন্য একটি জঙ্গি সংগঠনকে আফগানিস্তান মদত করে বলে পাকিস্তানের দাবি ৷ সাম্প্রতিক অতীতে পাকিস্তানে একাধিক নাশকতামূলক কার্যকলাপে এই টিটিপির নাম জড়ায় ৷ দুটি দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা থেকে সীমান্তে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে ৷ এই দুই দেশের সংঘাত থেকে নিজেদের জন্য কূটনৈতিক সুবিধে খুঁজে পাওয়ার আশা দেখছে ভারত ৷
আফগান বিদেশমন্ত্রীর সফরের তাৎপর্য
বিদেশমন্ত্রী-সহ আফগানিস্তানের অন্য উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের ভারত সফরের অর্থ দুদেশের সম্পর্ক এখন এক নতুন স্তরে পৌঁছে গিয়েছে ৷ আফগানিস্তান চায় ভারত সে দেশের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়াক ৷ পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ করুক ৷ আফগানিস্তানের বিদেশ মন্ত্রীর ভারতে সফরের মাধ্যমে দুটি দেশের সম্পর্ক কেমন হতে চলেছে সে ব্যাপারে ঘুরপথে নিজেদের মনোভাব বুঝিয়ে দিয়েছে ভারতও ৷ এই সফরের অনুমতি দিয়ে ভারত জানান দিয়েছে, তারা আগামিদিনে তালিবানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চায় ৷ রাজনৈতিক মতামত বিনিময়ও করতে চায় ৷
দুটি দেশই সীমান্ত পারের সন্ত্রাস নিয়ে সরব হয়েছে ৷ পাকিস্তানের নাম না নিলেও দুটি দেশই বলেছে, যে কোনও ধরনের নাশকতামূলক কাজ বরদাস্ত করা হবে না ৷ বিদেশমন্ত্রী আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন, তাঁদের সরকার আফগানিস্তানের মাটিকে ভারত বিরোধী কাজের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না ৷

ভারতকে আরও দুটি ইস্যুর মোকাবিলা করতে হবে এখন ৷ প্রথমেই আছে আফগানিস্তানকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ৷ মনে হচ্ছে, এ ব্যাপারে ভারত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী সিদ্ধান্ত নেয় তার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ দ্বিতীয় বিষয় হল নীতিগত সমন্বয় ৷ সামগ্রিকভাবে তালিবান এমন নীতির পক্ষে যা পশ্চাদমুখী ৷ বিশেষ করে মহিলাদের অধিকার ও স্বাধীনতা দিতে চায় না তারা ৷ ভারত কী করে এই নীতির সঙ্গে সমন্বয় সাধন করবে সেটা দেখার বিষয় হতে চলেছে ৷ এখানেই ভারতকে আরও বেশি করে বাস্তবের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে ৷ ভূ-রাজনীতি আবার এই বাস্তববাদী হওয়ার মধ্য়েও নানা ধরনের পরিবর্তন আনার দাবি করে ৷ এই বিষয়টি ভারতও বুঝেছে ৷ আর তাই আফগানিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষকে নিয়ে সমন্বয় সরকার তৈরির দাবি থেকে সরে এসেছে দিল্লি ৷

