আমেরিকা-ইজরায়েলের ইরান আক্রমণ, প্রতিবেশীদের উপর কী প্রভাব ?
ইরানে আক্রমণ করেছে ইজরায়েল ও আমেরিকা ৷ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এই সামরিক অভিযান ৷ সংঘাতের নানা দিক বিশ্লেষণ করল ইটিভি ভারত ৷

By Bilal Bhat
Published : March 3, 2026 at 3:43 PM IST
ইরানে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারের পরিবর্তন ঘটানো ৷ তবে এই যুদ্ধের করুণ পরিণতি ইরানের ধর্মীয় শক্তিগুলিকে এক অভিনব সুযোগের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেে ৷ সে দেশের ধর্মীয় নেতারা এখন নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার কাজ শুরু করেছেন ৷ কয়েক বছর আগে হিজাব পরতে অস্বীকার করায় ইরানের এক মহিলাকে গ্রেফতার করা হয় ৷ জেলেই তাঁর মৃত্যু হয় ৷ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া গণ-প্রতিবাদ ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং তাঁদের ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল ৷
তরুণীর মৃত্যুর প্রতিবাদে সামিল আন্দোলনকারীদের যেভাবে গায়ের জোরে দমন করার চেষ্টা হচ্ছিল তাতে দেশের তরুণ-তরুণীরা অতিশয় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ৷ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইেয়ের নেতৃত্বে থাকা প্রশাসন কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দিচ্ছিল ৷ তা-ও যবু সমাজ মেনে নিতে পারেনি ৷ ইরানের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের দমানোর প্রয়াস করেছিল ৷ তার ফলে বেশ কয়েকজনের প্রাণ যায় ৷

আন্দোলন অবশ্য শেষ হয়ে যায়নি ৷ এতদিন যা ছিল ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে হওয়া এক আঞ্চলিক প্রতিবাদ অচিরেই তা জাতীয় রূপ নিতে শুরু করে ৷ ইরানের এই প্রতিবাদ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক স্তরের চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে ৷ আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান প্রশাসনকে নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করে দেন ৷

2025 সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়া বা প্রতিবাদ করার বিষয়টিকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে রেখেছিল আমেরিকা ৷ ইরান গোপনে গোপনে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হতে চাইছে- এই অভিযোগ করা ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আর কোনও ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি ৷ কিন্ত তখন দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল ৷ সে সময় ট্রাম্প হস্তক্ষেপ করলে তার প্রতিক্রিয়া হত ভিন্ন ৷ বিশেষ করে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে ৷ তবে খামেনেইকে এভাবে হত্যা করা আদতে ভ্রান্তকর কৌশল হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে ৷ বিশেষ করে সময়ের বিবেচনায় ৷ ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা শেষ করা এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য় হলেও এখন বিষয়টি অন্য হয়ে গিয়েছে ৷ অনেকের কাছে বিষয়টি ইরানের সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ ৷ শুধু তাই নয়, এতদিন যে জনগণ এই প্রশাসনের বিরোধিতায় সরব হয়েছিল এখন তারাই পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছেন ৷ মাত্র কয়েক মাস আগে ইরানের বর্তমান প্রশাসন দেশের ভিতর সবচেয়ে বড় চ্য়ালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল ৷ আজ তারাই নিজেদের ঘর গোছানোর চেষ্টা করছে ৷ সেই সুযোগ তাদের হাতে এসে পৌঁছেছে ৷
ইরানের সামরিক বাহিনীর কাঠামো অন্য অনেক দেশের তুলনায় জটিল ৷ তাতে অস্পষ্টতাও বিদ্যমান ৷ আর এই কাঠামোর কারণেই অনেক সময় বাহিনীকে আক্রমণের মুখে পড়তে হয় ৷ খামেনেইকে ইরানের রেভলিউশানারি গার্ডের দফতরে পাওয়া এবং এত সহজে মেরে ফেলা বাহিনীর কাঠামো সংক্রান্ত জটিলতার ফলাফল ৷ এই হামলায় খামেনেইয়ের পাশাপাশি ইরানের বেশ কয়েকজন সামরিক নেতৃত্বেরও প্রাণ যায় ৷

ইরানে একই প্রয়োজন মেটাতে একাধিক বাহিনীকে সমান্তরালভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে ৷ একটি বাহিনীর কাজ- যে কোনও দরকারে অন্য বাহিনীকে সাহায্য করা ৷ এই ব্যবস্থার একটি বড় অংশ আইআরজিসি ৷ তারা আবার বাসজি নামে একটি শাখা পরিচালন করে ৷ এই শাখা সবসময় সক্রিয় থাকে তা নয় ৷ দেশে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বাড়লে এবং সেই বিরোধিতার জেরে দেশ পরিচালন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়লে এই বাহিনী সক্রিয় হয়ে ওঠে ৷ এদের কর্মপদ্ধতি বেশ জটিল ৷ অনেকের মতো ব্যাপারটা মাকড়সার জালের মতো ৷ সেখানে বাসজির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠী কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে বা তাদের আগামী পরিকল্পনা কী হতে চলেছে তা অন্যদের পক্ষে অনুধাবন করা বিশেষ সমস্যার বিষয় হয়ে ওঠে ৷
কথায় বলে সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনা করতে রাষ্ট্র যে সমস্ত বিষয়কে মান্যতা দেয় সেখানকার মানুষও সেগুলিকেই সত্য বলে ধরে নেন ৷ ইরানের সমাজও তেমনই ৷ দেশ ও সমাজের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেও মাঝেমধ্যেই তাদের আচরণে বেশ খানিকটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয় ৷ শুধু তাই নয়, বুদ্ধিজীবীরাও অনেক সময় ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপের প্রশ্নে সরকারের পাশে থাকেন ৷ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে যে সরকারের তাঁরা সমালেচনা করছিলেন তাঁদের পাশে থাকতেও সমস্যা হয় না ইরানের সমাজের একটা বড় অংশের ৷ সমর্থন করেই দায় শেষ করে দেন তাও নয় ৷ সমর্থন করার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানাতেও তাঁদের কোনও সমস্য়া হয় না ৷

গণআন্দোলন, সরকার বিরোধী প্রতিবাদ এবং অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স- এর প্রতিনিয়ত অবক্ষয় ইঙ্গিত দিচ্ছিল ইরানের প্রশাসনের পতন আসন্ন ৷ সিরিয়া-লেবানান-ইয়েমেন এবং ইরান একসঙ্গে এই অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স পরিচালন করে ৷ মূলত বেসরকারি উপায় আমেরিকা এবং ইজারায়েলের বিরুদ্ধে একে অপরকে সামরিক সাহায্য করতেই গড়ে তোলা হয়েছে এই নেটওর্য়াক ৷ ইরানের বর্তমান শাসনের অবসান সাধারণ মানুষ নিজেরাই করে দিতেন ৷ পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছিল ৷ কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা না-করে আমেরিকা এবং ইজরায়েল সামরিক অভিযানের পথ বেছে নিল, যুদ্ধ করল ৷ এ ব্যাপারে তাদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল ইরানের মিত্রদের দিক থেকে আসা প্রত্যাঘাত ৷ লেবাননের পাশাপাশি হিজবুল্লা তাদের আঘাত করতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল ইজরায়েল এবং আমেরিকা ৷
একের পর এক মাথাকে হত্যা করে অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স-এর শক্তি কমিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে 2023 সালের 7 অক্টোবর হওয়া ইজরায়েলের উপর হওয়া হামাসের আক্রমণের সময় থেকে ৷ গাজার বিধ্বস্ত হওয়া, হিজবুল্লার মাথাদের বেছে বেছে হত্যা, সিরিয়ায় আসাদ প্রশাসনের অবসানের ফলে ইরান একা হয়ে পড়েছিল ৷ এর আগে তেহরান থেকেই এই সমস্ত মিত্র শক্তিদের যাবতীয় সাহায্য করা হত ৷ এখন সেই নেটওর্য়াক সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছে ৷ হামাস নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়ছে ৷ লড়াই চালাবে না আত্মসমপর্ণের পথে হাঁটবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে হিজবুল্লা ৷ ক্ষমতা হারিয়ে আসাদ কার্যত অদৃশ্য হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের এই রঙ্গমঞ্চ থেকে ৷ তাদের থেকে ধারে ও ভারে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আসার আগে পর্যন্ত হাউথিদের খানিকটা দাপট ছিল ৷ কিন্তু ইরান সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করার পর তাদের আর করার খুব একটা কিছু নেই ৷

ইরানের ভৌগলিক অবস্থান একাধারে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দুর্বলতা ৷ পশ্চিমি দুনিয়া চায় ইরান ব্যবসার ব্যাপারে তাদের পাশে থাকুক ৷ তাহলে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে ৷ এখন ইরানের মাধ্যমে চিনের সামগ্রী ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে যায় ৷ ইরান, চিনের বেল্ট এবং রোড- উদ্যোগের একটা বড় অংশও বটে ৷ আর তাই পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে ইরান এমন এক বিদ্রোহী দেশ যারা আন্তর্জাতিক বাজারের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে সক্ষম ৷ পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে , ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল বর্তমান প্রশাসনের অবসান ঘটানো, আন্তর্জাতিক পরিণাম নিয়ে তারা বিশেষ ভাবিত ছিল না ৷
আঞ্চলিক সীমানা পেরিয়ে সংঘাত এখন ব্যাপক আকার নিয়েছে ৷ অন্য কয়েকটি মুসলিম প্রধান দেশও এই সংঘাতের অংশ হয়ে গিয়েছে ৷ আমেরিকা তাদের দেশের জমি ব্যবহার করছে যুদ্ধের কাজে ৷ ইরানও আশপাশের মুসলিম প্রধান দেশে হামলা চালাচ্ছে ৷ এর ফলে এই সমস্ত দেশ আমেরিকা ও ইজরায়েলর সঙ্গে নৈকট্য আরও বাড়াবে নাকি নিরপক্ষে অবস্থান বজায় রাখবে সেটাই এখন দেখার বিষয় হতে চলেছে ৷

