নয়া সমীকরণের খোঁজে তালিবান, চাপে পড়েছে আইএসআই-সিআইএ
পরিস্থিতি যেখানে এসে দাঁড়িযেছে তাতে সামান্য এদিক ওদিক হলেই পাকিস্তানের পর্যুদস্ত হওয়া সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু থাকবে না ।

By Bilal Bhat
Published : August 23, 2026 at 4:32 PM IST
1979 সালের কথা । পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়া উল হক আইএসআইয়ের আফগানিস্তান ব্যুরোর দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল রহমান খানকে বলেছিলেন,"আফগানিস্তানের অশান্তি যেন কাঙ্খিত স্তরে পৌঁছতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে ।" ইতিহাসের সেই পর্বে রাশিয়া অনুপ্রবেশ বাড়তে শুরু করেছে আফগানিস্তানে। আমেরিকাকে পাশে নিয়ে পাকিস্তান চেষ্টা করছে কমিউনিস্টদের আটকাতে।
এখন রাশিয়া আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করে না । 20 বছর সে দেশে থাকার পর 2021 সালে তালিবানি শাসন কায়েম হওয়ার পর কার্যত রাতারাতি আফগান-মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে আমেরিকাকেও । তালিবান গত পাঁচ বছর ধরে শাসন করছে সে দেশ । মার্কিন বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র এখন তাদের মালিকানায় । আর সেই সুবাদে তাদের সামরিক শক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যা হজম করার ক্ষমতা আমেরিকার নেই । প্রতিবেশী পাকিস্তানও নাক গলাতে ভয় পাচ্ছে । ভয় পাওয়ার কারণ, পরিস্থিতি যেখানে এসে দাঁড়িযেছে তাতে সামান্য এদিক ওদিক হলেই পাকিস্তানের পর্যুদস্ত হওয়া সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু থাকবে না ।
তালিবানের পাঁচ বছরের শাসন স্পষ্ট করে মনে করিয়ে দেয় এক ভয়াবহ অতীতকে । একদা সিআইএ'কে সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করতে অভিযান শুরু করেছিল আইএসআই । কিন্ত তা খুব একটা ইতিবাচক হয়নি । রাশিয়া আফগানিস্তানের দখল নেওয়ার পর আইএসআই-কে ব্যবহার করে পাকিস্তান রাশিয়া বিরোধী শক্তিকে মদত দিতে সামরিক বাহিনীর কর্তাদের বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিল । লক্ষ্য একটাই, রাশিয়া আফগানিস্তান ছাড়ার পর যাাতে সে দেশের উপর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত হয় । ব্রিগেডিয়ার এম.ইউসুফ এবং মেজর মার্ক অ্যাডকিন তাঁদের ‘আফগানিস্তান—দ্য বেয়ার ট্র্যাপ: দ্য ডিফিট অফ আ সুপারপাওয়ার’ বইটিতে লিখেছেন আফগানিস্তানকে আরেকটি ভিয়েতনামে পরিণত করার প্রচেষ্টা হয়েছিল । যে হাল ভিয়েতনামে আমেরিকা হয়েছিল সেটাই রাশিয়ার জন্য হতে পারত আফগানিস্তানে।

বইয়ের লেখক পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর শীর্ষ কর্তা হিসেবে কাজ করেছেন । আইএসআইয়ের আফগানিস্তান ব্যুরোও সামলেছেন । তিনি এক বিশেষ ইউনিটের খোঁজ দিয়েছেন বইতে। এই ইউনিটকে বলা হত 'সফটওয়্যার অফ ওয়ার' । এই ইউনিটের কাজ ছিল রাশিয়ায় মোকাবিলা করা আফগান জঙ্গিদের সিআইএ-র টাকা দিয়ে মদত করা। হিন্দুকুশ পর্বতের পূর্ব ও দক্ষিণে পুশতু ভাষায় কথা বলা আফগানদের জামা কাপড় ও রেশন দিয়ে সাহায্য করেছিল পাকিস্তান। পর্বতের উত্তর এবং পূর্ব দিকে থাকা তেজিকিস, হাজারাস এবং উজবেক যোদ্ধাদেরও সাহায্য করা হয়েছিল ।
একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত যে সমস্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ পাস্তুনদের হাতে থাকত তারা আফগানিস্তানে আমেরিকার প্রবেশের পর হিন্দুকুশ পর্বের উত্তর দিকে থাকা যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। আমেরিকা-পরবর্তী আবহে উত্তরাংশে থাকা যোদ্ধারা তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আমেরিকানরা হয়তো ভুলে গিয়েছিল ইতিহাস বলে যে সমস্ত শক্তি তাদের বশ করার চেষ্টা করেছে তাদের পাস্তুনরা বারবার প্রতিযোগিতার মুখে ফেলেছে । এমনকী ব্রিটিশদেওর এই এলাকার উপজাতিদের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে রীতিমত বেগ পেতে হয়েছিল ।
আফগান মুজাহিদিনদের সমর্থন করার জন্য পাকিস্তানের আলাদা কারণ ছিল। ভারত তখন রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই সমীকরণকে সামনে রেখেই পাকিস্তানের মনে হয়েছিল তারা বিদেশ নীতি সংক্রান্ত কৌশলের প্রশ্নে পরাজিত হবে। আমেরিকার চেয়েছিল ভিয়েতনামে তারা যে পরিস্থিতি সম্মুখীন হয়েছে, সেই একই অবস্থা রাশিয়ার হোক আফগানিস্তানে ৷ আর তাই বলা যেতেই পারে আমেরিকার পক্ষে আফগান নীতি ছিল বিদেশ নীতির একটি বর্ধিত অংশ। আমেরিকার সেদিনের সমর্থনের সঙ্গে বা বলা ভালো সমর্থনে নেপথ্যে থাকা সদিচ্ছার সঙ্গে এখনকার গাজা যুদ্ধে ইজরায়েলকে সাহায্য করার মার্কিন-মানসিকতার মধ্যে মিল পাওয়া যেতে পারে।

আফগানিস্তানে আমেরিকার আচরণের একজন কট্টর সমর্থক কংগ্রেসম্যান চার্লস উইলসন । তাঁর একটি উদ্ধৃতি 1985 সালের 14 জানুয়ারি ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মিরাম শাহ শহরের বিপরীতে, আফগানিস্তানের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ভিতরে অবস্থিত ঝাওয়ারের আফগান বেস ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়েছিলেন উইলসন । তাঁর আগে আমেরিকার কোনও রাজনীতিবিদ যিনি আফগানিস্তানে যাননি । তিনি বলেছিলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানকে সমর্থন করার বিষয়টিকে একস্বরে সমর্থন করেছিল মার্কিন সংসদ ।
এই সময় পাক সেনাবাহিনী এক বিশেষ রণকৌশল নেয়। আফগান প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের চর বসিয়ে রেখেছিল তারা। সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে আফগান যোদ্ধারা নিজেদের রণকৌশল তৈরি করত। পরবর্তী সময়ে অনেকেই নিখোঁজ হয়ে যায় বা মৃত্যুর কাছে ধরা দেয়। ধরা পড়ার পর এই গুপ্তচরদের অনেকেই দোষের কথা স্বীকার করে নেয়। তাদের প্রায় দেড় বছর করে পুল এ চারখি নামে এক জেলে রাখা হত। সেখানকার পরিবেশ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ওখানে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় বলে মনে করতো বন্দিরা। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এ কথা কোনওদিনই স্বীকার করেনি পাকিস্তান। সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে এই তথ্য সংগ্রহ এবং চরবৃত্তির লড়াইও চলেছে ।
আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া বারবার তালিবানকে দুষেছে মহিলাদের সঙ্গে বৈষম্য করার জন্য । আফগানিস্তান দখলের সময় নারীর অধিকারের কথা বলেছিল রাশিয়াও । তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকার নারী শিক্ষায় গুরুত্বও দিয়েছিল । কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছু । কারণ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক রীতিনীতি ও বিশ্বাস । সেখানে নারীদের উপর নানা বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সুদূর অতীত থেকে । আধুনিক সমাজও সেই ক্ষত বয়ে বেরিয়েছে। রাশিয়া যাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল পরে তারাই পরে রুশ বিরোধিতায় মুখর হয় । এখন আবার সেই তালিবানের রাজত্ব চলছে । তারা ভারতের পাশাপাশি চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায় । অন্যদিকে, পাকিস্তান বা আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সমীকরণ বেশ জটিল । দিনে দিনে সেই জটিলতা আরও বাড়ছে ।
সম্প্রতি আফগানিস্তানে তালিবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে দিল্লির আফগান দূতাবাসে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় । সেখানে ভারতীয় কূটনৈতিকদের আমন্ত্রণ করা কূটনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়াকেই ইঙ্গিত করে । একইসঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের জেরে কাবুল আর ইসলামাবাদের সম্পর্কও খারাপ হয়েছে । 2025 সালে আফগান নেতা আমির মুতাক্কি ভারত সফরে আসেন । উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দে গিয়ে সেখানকার ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন । এই সফর এবং সাক্ষাৎ পাকিস্তানকে চাপে রেখেছে । পাশাপাশি আঞ্চলিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে । আরও কয়েকধার এগিয়ে দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে তালিবান প্রশাসন। মহিলা সাংবাদিকরাও সেখানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান । এভাবে ভারত আর নতুন আফগানিস্তানের নৈকট্যের প্রকাশ পেয়েছিল ।
সবমিলিয়ে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে এমন এক অক্ষ তৈরি হয়েছে যার একদিকে আমেরিকা আর পাকিস্তান আর অন্যদিকে আছে সেই সব শক্তি যাদের ব্যবহার করে আফগানিস্তানে নিজেদের পায়ের তলার জমি শক্ত করতে চেয়েছিল আইএসআই এবং সিআইএ । এই সব শক্তি এবার তালিবানের পাশে । ভূ-রাজনীতির বদলের বড়সড় ইঙ্গিত এখান থেকেই মেলে । নিজেদের তৈরি গর্ত থেকে কীভাবে আফগানিস্তান এবং আমেরিকা রক্ষা পায় সেটা তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে । আফগানিস্তানকে অশান্ত করে রাখতে যে আবহের কথা জিয়া বলেছিলেন তা হয়তো একটু বেশি জটিল হয়ে গিয়েছে । জটিলতার অভিঘাত এতটাই যে সেটা পাকিস্তানকেই চাপে ফেলে দিয়েছে ।

