তীব্র আর্থিক সঙ্কট লুকিয়ে বিশ্বের ত্রাতা হতে চাইছে পাকিস্তান, নেপথ্যে স্বৈরাচারের পদধ্বনি
পাকিস্তান আর্থিক সঙ্কটের মধ্য়ে দিয়ে যাচ্ছে ৷ গণতন্ত্রের পরিসর থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজকে আরও বেশি স্বাধীনতা দেওয়ার দাবি উঠছে ৷ ইমরান খুরশিদের প্রতিবেদন ৷

Published : May 23, 2026 at 2:42 PM IST
পাকিস্তানের আর্থিক পরিস্থিতি প্রায় ভাঙনের মুখে ৷ মুদ্রাস্ফিতি বাড়ছে, বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম ৷ সাধারণ মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকাই এখন দায় ৷ এসব নিয়ে না ভেবে পাকিস্তানের প্রশাসন এখন নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতেই ব্যস্ত ৷ তারা দেখাতে চায়, বিশ্ব কূটনীতির মানচিত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ৷ তাদের অবস্থান প্রায় কেন্দ্রবিন্দুতেই বলা যায় ৷ আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে এই ধারনাকে আরও পাকাপোক্ত করতে চায় ইসলামাবাদ ৷ কিন্তু এই ধারনা তৈরির পথটা ভুলে ভরা ৷ তারা মনে করে বিশ্ব সঙ্কটের ত্রাতা হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের দেশের আর্থিক দৈনিতা উধাও হয়ে যাবে ৷ রাজনৈতিক সঙ্কট মুছে যাবে ৷ আর তাই এই উচ্চপর্যায়ের কূচনীতির অংশ হয়েছে তারা ৷ আসলে বিশ্বের কাছে মূল্যবান হওয়ার চেষ্টা পাকিস্তানের ভণিতা ৷
ক্ষমতার ভরকেন্দ্র আসিম মুনির
বিশ্বে এই বিশেষ ভাবমূর্তি তৈরি সংক্রান্ত কৌশলের নেপথ্য় আছে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব ৷ তার মাথায় আসেন আসিম মুনির ৷ এমনিতেই সামরিক নেতৃত্ব চায় পাকিস্তানের উপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে ৷ গণতন্ত্র বলতে যেটুকু যা বাকি ছিল তা এখন অবলুপ্ত ৷ বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক পরিসরের আসল ক্ষমতা সেনার হাতে ৷ বিচারপতিদের বদলি করা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ৷ ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি মহসিন আখতার কায়ানি, বিচারপতি বাবর সাত্তার এবং বিচারপতি সামান রাফাত ইমতিয়াজকে অন্য়ত্র স্থানান্তরিত করা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন উঠেছে ৷ স্বচ্ছতা মেনে বদলি হয়নি বলে মনে করেন অনেকেই ৷ সংবিধানের বদল ঘটিয়ে বিচারব্যবস্থার কাঠামোই বদলে দেওয়া হয়েছে ৷ সামরিক আদালত এখন অসামরিক আদালতের উপর প্রভাব খাটাচ্ছে ৷ সংবিধানের 27তম সংশোধন করে সামরিক নেতৃত্বের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ৷

ভারতের সঙ্গে সঙ্কট বিশেষ করে 2025 সালে হওয়া অপারেশন সিঁদুর শুধু নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্য়া ছিল না ৷ এই পরিস্থিতি আসিম মুনির কাজে লাগান আরও বেশি করে ক্ষমতাবান হতে ৷ নিজের পদমর্যাদা বাড়াতে ৷ দেশকে এটা বোঝাতে যে কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যবস্থা (Authoritarian system) পাকিস্তানের জন্য জরুরি ৷ সেনাপ্রধান থেকে ফিল্ড মার্শাল হয়ে তিনি এক শক্তিশালী পাকিস্তানের প্রতিভূ হয়েছেন তা নয় ৷ বরং পাকিস্তানের সমাজের উপর সামরিক শক্তির দাপট কতটা বাড়ছে সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছে ৷ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্য সাধন পাক-কৌশলের একটি বড় অংশ ৷ ট্রাম্পের প্রশংসা করে এবং তার ইচ্ছামতো কাজ করার মনোভাব দেখিয়ে মুনির ট্রাম্পকে বার্তা চান ৷ চান পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব মার্কিন প্রেসিডেন্টের নেকনজরে থাকুক ৷ সময়ের বিচারে ট্রাম্প সখ্যের বিশেষ গুরুত্ব আছে ৷ তিনি দ্বিতীয়বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মার্কিন মুলুকে থাকা পাকিস্তানের নাগরিক থেকে শুরু করে সমাজকর্মী সকেলই মনে করেছিলে ইমরান খানকে যেভাবে আটকে রাখা হয়েছে তার বিরোধিতায় সরব হবে মার্কিন প্রশাসন ৷ ইমরানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে পাক প্রশাসন ৷ কিন্তু ট্রাম্পের নজরে কাজের লোক হয়ে এবং যে কোনও ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের মোকিবিলা করার বার্তা দিয়ে ইমরান-সম্ভবনা শেষ করেছেন মুনির ৷
কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যবস্থা কায়েম আছে বা সেদিকে এগোচ্ছে এমন রাষ্ট্রের জন্য এগুলি খুব অবাক করে দেওয়া প্রবণতা নয় ৷ এই ধরনের দেশের শাসক নিজেদের দেশে থাকা নিরাপত্তা সঙ্কটের মোকাবিলা করতে রাজনৈতিক বহমানতার বদলে বিদেশি নেতাদের সংরক্ষণের অপেক্ষায় বেশি থাকেন ৷ পাকিস্তানকে এভাবে করে দয়া করে বা তাদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করে ওয়াশিংটন কেবলমাত্র কূটনৈতিক কৌশল নিয়েছে তেমন ভাবার কারণ নেই ৷ এর নেপথ্যে কাজ করছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল এবং তার সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক অঙ্ক ৷
অতীতেও বিদেশ থেকে বিশেষ করে আমেরিকার সমর্থন নিয়ে নিজেদের শাসনের মেয়াদ বাড়িয়েছেন আয়ূব খান থেকে শুরু করে জিয়াউল হক এবং পারভেজ মুশারফের মতো সামরিক শাসক ৷ আর তাই ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সংবিধানের সংশোধন করে নিজের ক্ষমতা যখন বাড়ালেন তখন আমেরিকার দিক থেকে প্রায় কোনও প্রতিবাদ আসেনি ৷ এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় ৷ সুললিত কূটনৈতিক চ্যানেলের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে আসিম-আমেরিকা সখ্য়ও ছিল মার্কিন নিরবতার নেপথ্যে ৷
28তম সংবিধান সংশোধনের পথ সুগম করার প্রয়াস
আবারও একই কাজ হচ্ছে পাকিস্তানে ৷ আবারও নিজেকের সংঘাত মোচক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে পাকিস্তান ৷ কোনও সংঘাতের অবসান তাদের লক্ষ্য নয় ৷ তাদের লক্ষ্য দেশের ভিতরের ব্যর্থতা চেপে রাখা ৷ শুধু তাই নয়, আরও দানবিক সংবিধান সংশোধনের পথ ধরা ৷ প্রস্তাবিত 28তম সংবিধান সংশোধন এরই অংশ ৷ পাক সরকারের বিবৃতি বলছে নয়া সংশোধনের লক্ষ্য স্থানীয় স্তরে থাকা ক্ষোভকে সামাল দেওয়া, রাজস্বের বিতরণ এবং প্রশাসনিক সংস্কার ৷ তবে ভিতরের খবর অন্য কথা বলছে ৷ এই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর ভিতরে থাকা পাকিস্তানের সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন প্রদেশের সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য সংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখা ৷ দেশ পরিচালনায় বেশি গুরুত্ব আছে এমন বেশিরভাগ দফতরের নিয়ন্ত্রণ নিজের দিকে নিয়ে আসা ৷ এর ফলে পাক সরকারের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব আরও বাড়বে ৷ একইসঙ্গে ফিল্ড মার্শালের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে ৷ সংস্কারের আড়ালে ক্ষমতাকে আরও একমুখী করাই মূল লক্ষ্য ৷ এটা এক উদ্বেগজনক প্রবণতা ৷ এই ধরনের উদ্য়োগের আসল লক্ষ্য পাকিস্তানের চালিকা শক্তি হিসেবে যে সমস্ত সংস্থাগুলি কাজ করে সেগুলিকে দুর্বল করে দেওয়া ৷ এই কাজে পাকিস্তানের মূলধারার সংবাদমাধ্য়মের ভূমিকা বোড়ের চেয়ে বেশি কিছু নয় ৷ সত্যাসত্য ভুলে, নিজের দেশের মানুষের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে তারা এখন বিশ্ব মানচিত্রে পাকিস্তানের ভাবমূর্তিকে গৌরবান্বিত করতেই ব্যস্ত ৷
পাক-রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ মূলত একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া দ্বারা পরিচালিত। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আয়েশা সিদ্দিকী বলেন, "সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ক্ষমতার বলেই অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে ৷ আর তাই সামরিক বাহিনীর মন সেনা ছাউনিতে আটকে থাকে না ৷ সেখানে ফিরে যাওয়ার কোনও তাগিদও তারা দেখায় না ৷" ক্রিস্টিন ফেয়ার আবার যুক্তি দিয়েছেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কেবল বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয়তার উপর হস্তক্ষেপ করে থাকে ৷ আর এভাবে এভাবে একের পর এর অসামরিক সংস্থার ক্ষমতার বিন্যাস পাল্টে যায় ৷ তারা দুর্বল হয়ে পড়ে ৷ পাক সামরিক বাহিনী অবশ্য এসবকেই সুযোগ হিসেবে দেখে ৷ 2014 সালে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ পথে নেমেছিলেন ৷ বিশেষ করে ইমরান খানের দল এবং আরও কয়েকটি সংগঠন ৷ এই বিক্ষোভ নিয়ে মাইকেল কুগেলম্যানের প্রতিক্রিয়া সেই বিক্ষোভ কী কী সামাজিক পরিবর্তনের সূচক হয়ে উঠেছে বা আগামিদিনে উঠবে সেটা এখনও অনিশ্চিত ৷ তবে এই সংঘাত থেকে যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সবচেয়ে বেশি লাভবান করেছে তাতে সংশয় নেই ৷ আর এই ঘটনা পাকিস্তানের ভেঙে পড়া গণতন্ত্রের জন্য একটি দুঃসংবাদ। ইতিহাস বলছে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটকালে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্য বরাবর বিস্তার করে এসেছে ৷ এর মধ্য দিয়ে এক বিশেষ একটি ধারা বা প্যাটার্ন জোরদার হয়েছে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পরিবর্তে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সহায়ক হয়েছে

এলিট সংস্কৃতি এবং সঙ্কট সামাল দেওয়ার রাজনীতি
আর্থিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ অন্য কথা বলে ৷ বাস্তব বলছে, পাকিস্তানের অর্থনীতির দ্রুত পতন হচ্ছে ৷ মুদ্রাস্ফিতি বাড়ছে ৷ পেট্রলের দাম বাড়ছে ৷ সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের উপর চাপ বাড়ছে ক্রংমশ ৷ পাকিস্তানেক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ নিজেই জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে তেল কিনতে 800 মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে ৷ এটা সে দেশের আর্থিক শক্তি নয় অনিশ্চয়তার সূচক ৷ সবচেয়ে দরকারি কথা হল ভারতের মতো তৈল ভাণ্ডার নেই পাকিস্তানের ৷ পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলি পারভেজ মালিক জানিয়েছেন পাকিস্তানের কাছে 5-7 দিনের তেল আছে ৷ এটাই বলে দেয় পাকিস্তানের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ৷ এই বিবৃতিতেই তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন পাকিস্তানের পরিস্থিতি তাদের থেকে অনেকটাই আলাদা ৷ তৈল ভাণ্ডার থাকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলেও ভারতের কাছে সেটা কোনও সমস্যার বিষয় নয় ৷ এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, পাকিস্তানের শক্তি ক্ষেত্র ভিতরে ভিতরে কতটা অস্থায়ী ৷ এই সমস্যা সমাধানে যতটা সম্ভব রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করছে সরকার ৷ একসময় আইএমএফের টাকায় সৌরশক্তির প্রচলনকে সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা হত ৷ এখন তার উপরেও কর চাপানো হচ্ছে ৷ পাকিস্তানের সরকার ঠিক করে রেখেছে আরও নানা ক্ষেত্রে নতুন করে কর চাপানো হবে, আগে থেকে ছাড় ছিল এমন কয়েকটি ক্ষেত্র থেকে ছাড় প্রত্যাহার করা হবে ৷ আগে পাকিস্তানের কাছে যা ছিল বিকল্প এখন তা-ই হয়ে উঠেছে বোঝা ৷ মধ্য়প্রাচ্যের সঙ্কটকেও তারা নিজেদের আর্থিক ব্য়র্থতাকে ঢাকতে কাজে লাগিয়েছে ৷ ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাত পাকিস্তানকে একাধিক চরম পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করেছে ৷ তারা লকডাউন করতে পেরেছে ৷ তার ফলে ছোট ছোট দোকান থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে ৷
এখানে আরও একটি বিষয়ের উল্লেখ করা দরকার ৷ পাকিস্তান সৌদি আরব বা চিনের মতো দেশ থেকে বিরাট অঙ্কের ঋণ নেয় ৷ কিন্তু সেই টাকা কোথায় যায়, কোথায় কোথায় ব্যবহার হয় তা নিয়ে তুমুল অস্বচ্ছতা আছে ৷ একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থতহবিল থেকে যে টাকা আছে সেটারও কোনও হদিশ পাওয়া যায় না ৷ ঋণের টাকা জণকল্যাণে লাগে এমন সম্ভবনা প্রায় নেই ৷ সামরিক নেতাদের পাশাপাশি বিত্তবানদের কাছেই অর্থের বেশিটা চলে যায় ৷ তারা এই টাকা ব্যবহার করে বিদেশে সম্পত্তি বাড়াতে থাকেন ৷ অথচ পাকিস্তানের গরিব মানুষ অর্থকষ্টে ভোগেন ৷ তাঁদের উপর করের অনাবশ্যক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হতে থাকে ৷
প্যান্ডোরা পেপার্সের তদন্তে দেখা গিয়েছে পাকিস্তানের প্রায় 700 নাগরিক বিদেশের সংস্থায় বেনামে প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করেছে ৷ রিয়েল এস্টেটেও অনেক টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে ৷ এই তালিকায় পাক সেনার কেষ্টবিষ্টুদের পাশাপাশি মন্ত্রী, ব্যবসায়ী এবং অন্য ক্ষেত্রের বিশিষ্ট এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা আছেন ৷
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক ‘গভর্নেন্স অ্যান্ড করাপশন ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এরকম আরও তথ্য পাওয়া গিয়েছে ৷ এই রিপোর্ট থেকে পাক সমাজ ব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রশাসনিক দুর্বলতার পাশাপাশি দুর্নীতির ঝুঁকি এবং অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের বিভিন্ন রূপ স্পষ্ট হয়েছে ৷ আরও জানা গিয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শিতার অভাব ও দুর্নীতির কারণে পাকিস্তানের বার্ষিক জিডিপির প্রায় 5 থেকে 6.5 শতাংশ ক্ষতি হয়।

স্বৈরাচারের পদধ্বনি
গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করাও একইরকম উদ্বেগজনক বিষয় ৷ পাকিস্তান সবচেয় জনপ্রিয় নেতা ইমরান খান ৷ তাঁকে বছরের পর বছর জেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছে ৷ বেঁচে থাকার নূন্যতম অধিকারগুলোও কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাঁর থেকে ৷ তাঁর শরীর প্রতিনিয়ত খারাপ হচ্ছে ৷ তবু মুক্তি পাচ্ছেন না ৷ পাকিস্তানে বিরোধীদের বাস্তব পরিস্থিতি ঠিক কতটা ভয়াবহ সেটাও এখান থেকে জানা যায় ৷ নাগরিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে ৷ অতিসম্প্রতি জানা গিয়েছে, পাকিস্তানের নাগরিকদের পাসোপোর্ট নিস্ক্রিয় করে দেওয়ার অধিকার সরকারের হাতে এসেছে ৷ দীর্ঘদিনের জন্য কোনও নাগরিকের বিদেশ যাত্রার উপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করতে পারে পাক সরকার ৷ যে কোনও অজুহাতে সরকার কোনও নাগরিককে নতুন পাসপোর্ট নাও দিতে পারে নয়া ব্যবস্থায় ৷ পাকিস্তানের যে সমস্ত নাগরিকদের কোনও কারণে অন্য দেশ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদের পাসপোর্ট ইতিমধ্যেই বাতিল করে দিয়েছে সরকার ৷ তাঁরা এখন অন্য কোনও দেশে যাত্রা করতে পারবেন না ৷ এমনিতে এই ধরনের পদক্ষেপ সরকার পরিচালানোর দিক থেকে বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে বৈধ বলে মনে হতেই পারে ৷ কিন্তু ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি কায়েম করছে এমন সরকারের ক্ষেত্রে এই সমস্ত পদক্ষেপ শাসকের হাত আরও শক্তের হাত উপায় হয়ে উঠতে পারে ৷ বিশেষ বিশেষ নাগরিককে নিশানা করে যাঁরা আগামিদিনে সরকারের চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে তাঁদের দমানোর কৌশলও হতে পারে ৷
গণতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রের মিশেল শাসন ব্যবস্থা এখন হাইব্রিড শাসন ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ৷ পাকিস্তান এই ব্যবস্থার ধারক ও বাহক হতে চায় ৷ কিন্তু এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ৷ পাকিস্তানে এখন সামরিক শাসন কায়েম হয়েছে ৷ সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা শুধুই আলঙ্কারিক ৷ তাঁরা নীতি নির্ধারক নন ৷ কোনও নেতাই সামরিক নেতৃত্বকে প্রশ্ন করতে পারেন না ৷ কেউ প্রশ্ন তুললে তাঁকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয় ৷

এমন বিষম পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে উপায় খুঁজে নিয়েছে সংবাদমাধ্যম ৷ তারা দেশের মুদ্রাস্ফিতি নিয়ে প্রশ্ন করে না ৷ বেকারত্বের হার বৃদ্ধির কারণ জানতে চায় না ৷ শুধু সামরিক নেতৃত্বের প্রশংসা করে ৷ এই প্রশংসা করার ব্যাপারটা কোনও আচমকা নেওয়া সিদ্ধান্ত নয় ৷ নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনেই এই প্রশংসা-প্রক্রিয়া চলছে ৷ যাতে বাস্তব পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন নাগরিকের মনে যেন ধারনা বদ্ধমূল হয় যে সামরিক নেতৃত্ব দেশকে প্রগতির পথে এগিয়ে দিচ্ছে ৷ বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের এই চমকে দেওয়ার মতো উত্থান আদতে বানানো ৷ আর্থিক অস্বচ্ছতা ঢাকার উপায়, সেনার হাত শক্ত করার পথ, জনগণের কণ্ঠরোধের রাস্তা ৷ আর অজান্তে এই অব্যবস্থার জয়গান গেয়ে পাকিস্তানের নাগরিকরা সেদেশেকে গণতন্ত্রহীন করার প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠছন ৷
লেখক পরিচিতি- ডঃ ইমরান খুরশিদ আইসিপিএসের সহযোগী গবেষক, পেনিনসুলা ফাউন্ডেশনের অ্যাডজাঙ্কট ফেলো এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।
( ডিসক্লেইমার: এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এখানে প্রকাশিত তথ্য ও মতামত ইটিভি ভারত-এর দৃষ্টিভঙ্গিকে কোনওভাবেই প্রতিফলিত করে না।)

