কর্মসংস্থান বনাম গোর্খাল্যান্ড ! 54 আসনের উত্তরবঙ্গে কোথায় দাঁড়িয়ে তৃণমূল ?
ভোটের আগে কী ভাবছে উত্তরবঙ্গ ? রাজনৈতিক আনুগত্য বনাম নতুন দিনের স্বপ্ন-প্রশ্ন অনেক ৷ উত্তর খুঁজল ইটিভি ভারত ৷

Published : January 9, 2026 at 3:24 PM IST
( প্রতিবেদক: দীপঙ্কর বসু, সঞ্জীব গুহ, শুভদীপ রায় নন্দী ও অভিজিৎ বোস)
শিলিগুড়ির ব্যস্ত রাস্তা মিলন মোড়ের ট্রাফিক সামলে গাড়ি নিয়ে গন্তব্যের দিকে রওনা দিয়েছিলেন সুকান্ত বর্মন ৷ গত দু'দশকেরও বেশি সময় ধরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় পর্যটকদের নিয়ে যান তিনি ৷ কখনও বা চলে যান উত্তর-পূর্ব ভারতেও ৷ সুকান্ত বললেন, "পাহাড়ের মানুষের প্রশ্নে চোখে পড়ার মতো বদল এসেছে ৷ আগে রাজনীতির প্রসঙ্গ এলে সবাই জানতে চাইত, কাকে সমর্থন করতে হবে ? বা বিরোধিতা করতে হবে কার ৷ এখন সবাই জানতে চায় আমরা কী পাব ?" আদতে এই প্রশ্নেই লুকিয়ে 54 আসনের উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের সম্ভাবনা ৷
2011 সালে ক্ষমতায় আসা তৃণমূলের পক্ষে উত্তরবঙ্গ বরাবর এক জটিল অঙ্ক হয়েই থেকে গিয়েছে ৷ এখানে রাজ্য সরকারে উন্নয়ন মূলক প্রকল্প আর অবিশ্বাস হাত ধরাধরি করে অবস্থান করে ৷ কখনও কখনও পরিচয়ের রাজনীতি এখানে ছাপিয়ে যায় অন্য় সব সমীকরণকে ৷ আর তাছাড়া উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি দক্ষিণবঙ্গের ঠিক বিপরীত ৷ কারণ রাজ্যের দক্ষিণাংশে তৃণমূলের একছত্র দাপট চোখে পড়লেও উত্তরবঙ্গে সে পথে হাঁটে না ৷

2021 সালের বিধানসভা নির্বাচনে 294টি বিধানসভা আসনের মধ্য়ে 213টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল ৷ পেয়েছিল 48 শতাংশ ভোট ৷ প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করা তৃণমূল উত্তরবঙ্গে ততটা ভালো ফল করতে পারেনি ৷ 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনের মতো বিধানসভাতেও বিজেপির ফল ভালো হয় এখানে ৷ বিশেষ করে দার্জিলিং পাহাড়, আলিপুরদুয়ারের আদিবাসি অধ্যুষিত এলাকা, জলপাইগুড়ির ডুয়ার্স অঞ্চল এবং শিলিগুড়ির শহুরে ভোটারদের মধ্য়ে বিজেপি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল ৷
তৃণমূল দাপট দেখা গিয়েছিল উত্তর দিনাজপুরের মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা এবং গ্রামীণ কোচবিহারে ৷ বাদ বাকি প্রতিটি এলাকায় শাসক ও বিরোধীর কড়া টক্কর দেখা গিয়েছে ৷ ভাগ হয়েছে ভোট ৷ একইসঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে বিজেপির সাংগঠনিক গভীরতাও ৷ উত্তরবঙ্গে বিজেপির সাফল্য আকস্মিক- এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই ৷ 2014 সাল থেকে আরএসএস এবং বিজেপির সংগঠন হিন্দু ভোটকে ঐক্যবদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে ৷ বিজেপি বাংলায় 2009 সাল থেকে পরিচয়ের রাজনীতি করে আসছে ৷ পাহাড়ের স্থানীয় শক্তিগুলির সমর্থন নিয়ে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখতেও বারবার সক্ষম হয়েছে ৷ রাজশাহি থেকে আদিবাসি এবং চা বাগানের কর্মীদের মধ্যে নিজেজের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বাড়াতে পেরেছে বিজেপি ৷

পরিচয়ের রাজনীতি আর তৃণমূলের খামতি !
2021 তৃণমূলকে বড় জয় বা বিরাট পরাজয়- কোনওটাই দেখায়নি উত্তরবঙ্গ ৷ রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব এই সমীকরণ সম্পর্কে অবহিত ৷ তাঁর কথায়, "তৃণমূল তৈরি হয়েছিল সিপিএমের বিরোধিতা করতে ৷ এটাই আমাদের গর্বের জায়গা ৷ নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শকে হাতিয়ার করে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লড়াই করার প্রশিক্ষণ আমরা পেয়েছি ৷ কিন্তু যখন পরিচয়ের রাজনীতি বড় হয়ে দেখা দিল আমাদের কাছে তার যোগ্য জবাব ছিল না ৷ ধর্ম-জাতি-ভাষা নিয়ে রাজনীতি হলে তার জবাব কীভাবে দেওয়া যায় তার উত্তর জানা ছিল আমাদের ৷"

রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেবের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নৈকট্যের কথা কারও অজানা নয় ৷ উত্তরবঙ্গে বিজেপির এভাবে সংগঠন গড়ে তোলা যে তাঁকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে তা আর বলে দিতে হয় না ৷ তিনি বলেন, "উত্তরবঙ্গে বিজেপি ক্যাডার ভিত্তিক দল নয় ৷ কয়েকটি সম্প্রদায় এবং আরএসএসের উপর নির্ভর করতে হয় বিজেপিকে ৷ আরএসএসের প্রচারকদের প্রকাশ্যে বিশেষ দেখা যায় না ৷ তারা ভিতরে ভিতরে সংগঠনকে মজবুত করার কাজ করেন ৷ সারাবছর ধরে নানা কর্মসূচির মধ্যে নিজেদের ডুবিয়ে রাখেন ৷ নিজেদের মতো করে সংগঠনকে শক্তিশালী করে চলেন ৷ এটাই এখানে বিজেপির মূল শক্তি ৷ এর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি তৃণমূল ৷ সম্প্রদায় ভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি ৷"
উত্তরের বঞ্চনা, বঞ্চনার উত্তর
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, উত্তরবঙ্গের ভোটাররা যেভাবে ভোট দেন তার মধ্যে কোনও স্থায়ী প্রবণতা বা পোলিং প্য়ার্টান দেখা যায়নি এতকাল ৷ বাম আমলেও এই বিষয়টি বারবার দেখা গিয়েছে ৷ জটিলতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি তৃণমূলও ৷ ক্ষমতায় আসার পর উত্তরবঙ্গে বামেদের দাপট কমাতে চেষ্টার ত্রুটি করেনি মমতার দল ৷ ক্যাডার ভিত্তিক সিপিএম ও তার সহযোগী দলগুলির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তৃণমূল বুঝতেই পারেনি রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসে হাজির হয়েছে অচেনা 'শত্রু' বিজেপি ৷

গৌতম মেনে নিলেন দক্ষিণবঙ্গের কায়দায় উত্তরবঙ্গ-বিজয় সম্ভব নয় ৷ আর তাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য়সাথী এবং খাদ্যসাথীর উপর বাজি ধরতে চাইছে শাসক শিবির ৷ গতবছর আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়ে দেয় তৃণমূল ৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের দিক থেকে এই সাফল্য রেকর্ডের চেয়ে কোনও অংশে কম নয় ৷ কারণ ক্ষমতায় থাকার এত বছর পরেও এর আগে কখনও ওই আসন জেতা হয়নি তৃণমূলের ৷ এবার সেটাই হল ৷ আর তাই তৃণমূল নেতারা অনুমান করতে শুরু করলেন সরকারি প্রকল্পগুলিকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গের ভোটারদের মন জয় করতে হবে ৷ এতদিন তাঁরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করতেন ৷ সেই ভাবনায় বদল আনা জরুরি ৷ তৃণমূল চায় বঞ্চনার অভিযোগকে ভুলিয়ে দিয়ে উত্তরবঙ্গের ভোটারদের মধ্যে আনুগত্য তৈরি করতে ৷
পাহাড়ের মানুষের মধ্যে সরকার বিরোধী মনোভাব আছে ৷ তা জানিয়ে গৌতম বলেন, "পাহাড়ের নাগরিকদের মধ্যে থাকা সরকার-বিরোধী মনোভাবে পরিবর্তন আনতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কঠোর পরিশ্রম করছেন ৷ তাঁর আমলে তৈরি হয়েছে একাধিক উন্নয়ন পর্ষদ ৷ এর পাশাপাশি নতুন রাস্তা তৈরি করতে এবং আবাসন প্রকল্পের জন্য অনেক টাকাও খরচ করেছেন তিনি । তবে এত করেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি ৷ দার্জিলিং, কার্শিয়াং এবং কালিম্পং- পাহাড়ের এই তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রে লড়াই করতে আমরা অনিত থাপার উপর নির্ভর করছি ৷ ভোটের এখনও কিছু দিন বাকি আছে বলে কোনও চূডা়ন্ত সিদ্ধান্ত হয়নি ৷ তবে এখনও পর্যন্ত যা পরিস্থিতিতে তাতে বিজেপিকে মোকাবিলা করবেন অনিত ৷"
গোর্খাল্যান্ডের দাবি-দাওয়া আর ঘরে-বাইরে বিজেপির অবস্থান
পাহাড়ের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে নারাজ কার্শিয়াংয়ের বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মাও ৷ শিলিদগুড়ির বাড়িতে নিজের পছন্দের জায়গায় বসে বিধায়ক বলেন, "পাহাড়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন বদলে গিয়েছে ৷ পাহাড়বাসীর মনের ক্ষোভের আগুন ধিক ধিক করে জ্বলছে ৷ এসআইআরের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ারল পর পাহাড়বাসীর মানসিকতা কী হবে তা এথন বলে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় ৷ তবে চোখে একটা পড়ার মতো বদল হবে তাতে কোনও সংশয় নেই ৷"

বিষ্ণুর সঙ্গে দার্জিলিঙের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার সম্পর্ক বেশ খারাপ ৷ রাজু পাহাড়ের বাসিন্দা নন এই বিষয়টি সামনে রেখে আক্রমণ শানাতে থাকেন বিষ্ণু ৷ শুধু তাই নয়, 2024 সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজুর বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী হিসেবে তিনি লড়াইও করেছিলেন ৷ ষষ্ঠ তফশিলে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দার্জিলঙের বিজেপি বিধায়ক নীরজ জিম্বার সঙ্গে বিষ্ণুর মত একেবারেই মেলে না ৷ তিনি মনে করেন, "ষষ্ঠ তফশিলে অন্তর্ভুক্তি গোর্খা সম্প্রদায়কে স্বাভাবিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে ৷"
2016 সালে তিনটি আসন পাওয়া বিজেপি 2021 সালে 77টি আসন দখল করে ৷ ভোটের হার বেড়ে হয় 38 শতাংশ ৷ 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ফল খারার হলেও বিজেপির এই চোখে পড়ার মতো ভালো ফল বঙ্গ রাজনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তনের জোরালো সংকেত দিয়েছিল ৷ দার্জিলিং থেকে শুরু করে শিলিগুড়ি, ফাঁসিদেওয়া, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির মতো বিধানসভা কেন্দ্রে বড় ব্যবধানে জেতে বিজেপি ৷ এই ফল সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি হিন্দু এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতির ভোটারদের উপর বিজেপির দাপট কতটা তার প্রমাণ দিয়েছিল ৷
উত্তরবঙ্গের চাওয়া-পাওয়া ও গোর্খা জাত্যাভিমান
উত্তর দিনাজপুরে তৃণমূলের জয়কে তাদের সংখ্যালঘু এবং শহুরে ভোটারদের কাছে টানার অংশ হিসেবে দেখেছে রাজনৈতিক মহল ৷ এই প্রবণতা থেকে আরও একবার বোঝা যায় উত্তরবঙ্গের ভোটাররা কোনও একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে তাকিয়ে ভোট দেন না ৷ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা থেকে শুরু করে চা-বাগান কর্মী সকলে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন ৷ এই বিবিধতাকে অগ্রাহ্য করার কোনও কারণ নেই ৷ 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 215টি আসনে জিততে চান ৷ 2021 সালের সবুজ-সুনামির দিনেও আসন সংখ্য়া এতটা বেশি হয়নি ৷ বিজেপিকে তার গড়ে টেক্কা দিয়ে ভালো ফল করতে কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৷ স্থানীয় এলাকায় সাংগঠনিক শক্তিকে আগের থেকে অনেক বেশি মজবুত করা, মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ভোটের আগে যে কথা দেওয়া হয়েছিল তা রক্ষা করা- এই বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই নির্বাচনের রণকৌশল তৈরি করছে বাংলার শাসক শিবির ৷ এর সঙ্গে বাঙালি অস্মিতাকেও মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে সুকৌশলে ৷
তৃণমূলের 'দুর্নীতি' নিয়ে আক্রমণাত্মক বিজেপি
উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সংগঠনকে গত কয়েক বছর ধরে বারাবরা ঢেলে সাজিয়েছে তৃণমূল ৷ শাসক শিবিরের নেতা-কর্মীরা শুধু বিজেপিকে রুখতে সচেষ্ট তা নয় ৷ তাদের অন্যতম বড় লক্ষ্য পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মনে থাকা ক্ষোভ প্রশমিত করা ৷ কখনও সেটা উন্নয়নের প্রশ্নে, কখনও আবার নিজেদের গোর্খা জাত্যাভিমান ধরে রাখা নিয়ে ৷

কথা হচ্ছিল তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র জেলা সভাপতি নির্জল দে-র সঙ্গে ৷ তিনি জানালেন, পাহাড়ের একটি অংশের মানুষ মনে করেন, তৃণমূল তাদের নিয়ে ততটা ভাবিত নয় ৷ এই অংশের মানুষের মধ্য়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা অনেকটা বাড়াতে পেরেছি বিজেপি ৷ শুধু তাই নয়, তাঁদের ,সামগ্রিক উন্নয়ন করবে বলেও ওরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ৷
সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসা এই নেতার কথায়, "চা বাগানের রাজনীতি অন্য সবকিছুর থেকে আলাদা ৷ এখানে শ্রমিকদের উপর যে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে সেই জিতবে ৷ তবে শ্রমিকদের মধ্য়ে ভোট ভাগাভাগিও হয় ৷ বামেরা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছিল ৷ সেই জায়গাটা দখল করেছে বিজেপি ৷ এর পাশপাশি তৃণমূলের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে ৷ সেটাই উত্তরবঙ্গে বিজেপির শক্তির মূল উৎস ৷"
কংগ্রেস-সিপিএম আর হুমায়ুন কবির
বিষয়টি বুঝতে কোনও অসুবিধে নেই যে উত্তরবঙ্গের লড়াইটা দ্বিমুখি নয় ৷ তৃণমূল-বিজেপির দ্বৈরথের মধ্যে কয়েকটি কেন্দ্রে সিপিএম ও কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর যে সংকেত মিলেছে তাকে অগ্রাহ্য করা চলে না ৷ সরকারের কাজে অখুশি এমন ভোটারদের একটি অংশের কিছু ভোটার এই দুটি দলের দিকে চলে যেতে পারেন ৷ পরিস্থিতি আরও গুরুতর করে দিয়েছেন হুমায়ুন কবির ৷ তৃণমূল থেকে বহিস্কৃত এই নেতা 50টিরও বেশি আসনে লড়বেন বলে আগেই জানিয়েছেন ৷ এই সিদ্ধান্তেরও খানিকটা প্রভাব যে পড়তে পারে তা বলা যায় ৷ বিশেষ করে এর আগে সামান্য ব্যবধানে যে সমস্ত আসনে ফয়সালা হয়েছিল সেখানে খেলা ঘুরেও যেতে পারে ৷
চেষ্টার ত্রুটি করছে না তৃণমূল ৷ দলের একটি সূত্র ইটিভি ভারতে জানিয়েছে ফাঁসিদেওয়া বিধানসভা কেন্দ্রে কে প্রার্থী হতে পারেন তা মোটামুটি ঠিক করা আছে ৷ শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের সরকারি সভাধিপতি রমা রেশমি এক্কাকে প্রার্থী করতে পারে তৃণমূল ৷ তিনি নিজে আদিবাসী ৷ তাই ওই সম্প্রদায়ের ভোটারদের মন কাড়ার দক্ষতা তাঁর আছে বলে মনে করা হচ্ছে ৷ মহকুমা পরিষদের কাজটা অনেকটা জেলা পরিষদের মতো ৷
তৃণমূলের 'অবাঙালি' বাণ ও দলবদল
শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের মধ্যে একটা বড় অংশ অবাঙালি ৷ তাঁদের মন পেতে তৃণমূল যে মরিয়া তা বোঝা যায় দুটো ঘটনা থেকে ৷ সঞ্জয় টিবরেওয়ালকে দার্জিলিংয়ের সমতল এলাকায় দলীয় সংগঠনের চেয়ারপার্সন করেছে তৃণমূল ৷ দিলীপ দুগ্গারকে করা হয়েছে শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি উন্নয়ন পর্ষদের সভাপতি ৷ আর এসবের মধ্যে বিজেপি যে হাত গুটিয়ে বসে আছে তেমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই ৷ জনপ্রতিনিধি হিসেবে দলের বিধায়করা নিজেদের পায়ের তলার মাটির শক্ত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন ৷ পাশাপাশি বিজেপির হয়ে তৃণমূলকে টেক্কা দিতে পারেন এমন যুবনেতার সন্ধানও নিয়মিত করে থাকে তারা ৷

দলবদলের প্রস্তাব যে ইতিউতি দেওয়া হচ্ছে তা মেনে নিয়েছেন ফাঁসিদেওয়া 1 নম্বর ব্লকের প্রেসিডেন্ট আখতার আলি ৷ তাঁর কাছেও তৃণমূল ছাড়ার প্রস্তাব এসেছিল বলে দাবি করেছেন ৷ যদিও তিনি আগ্রহ দেখাননি ৷ আলি মনে করেন, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে তত এই ধরনের প্রস্তাব আসার প্রবণতা আরও অনেকটাই বাড়বে ৷ তিনি বলে দিলেন, দলবদল যদি হতে থাকে তবে তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে কোচবিহারের 9টি কেন্দ্রে ৷
কোচবিহার জমজমাট
কোচবিহারের লড়াইটা সমানে সমানে ৷ সিতাই, দিনহাটা, নাটাবাড়ি, তুফানগঞ্জের মতো আসনে লড়াই হচ্ছে ৷ সাম্প্রতিক অতীতে কখনও তৃণমূল আবার কখনও বিজেপির প্রতি আস্থা রেখেছে এই আসনগুলি ৷ এখানে বৈতরণী পার করতে তৃণমূল আবারও সেই সরকারি প্রকল্পের উপর আস্থা রাখছে ৷ তার সঙ্গে আছে তফশিলি জাতি এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার রণকৌশল ৷ তবে দলের প্রবীণ নেতা গৌতম দেব সংশয়মুক্ত হতে পারছেন না ৷
কোচবিহারে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আছে মেনে নিয়ে গৌতম বলেন, "দলের মধ্যে কয়েকটি গোষ্ঠী আছে ৷ আমরা সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে বৈঠক করেছি ৷ তাতে সমস্যা খানিকটা মিটেছে বলে আমি মনে করি ৷ আমাদের আশা সবাই একত্রিত হয়ে কাজ করবে ৷" বিজেপি যে এই সুযোগ কাজে লাগাতে কোনও কসুর করবে সেটাও জানেন গৌতম ৷ সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে থাকা অনুপ্রবেশ-উদ্বেগ, রোজগারের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকার মতো বিষয়ের সঙ্গে তূণমূলের মধ্যে থাকা বিভাজনকে কাজে লাগানোর সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে গেরুয়া শিবির ৷

কোচবিহারে ধাক্কা খেলে তৃণমূলের উত্তরবঙ্গ-স্বপ্ন যে দিনের আলো দেখতে পাবে না তা জানেন মমতা ৷ জানে মমতার দলের থিঙ্কট্যাঙ্ক ৷ আর তাই গোটা রাজ্যে এসআইআর নিয়ে যে রণং দেহি মেজাজ তৃণমূল দেখাচ্ছে সেটা কার্যত উধাও এখানে ৷ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কাজে লাগিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছে তৃণমূল ৷
উত্তরবঙ্গে এসআইআর ও অন্য তৃণমূল
রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতমের কথায়, "এসআইআর প্রক্রিয়াকে আমরা খুব কাছ থেকে দেখছি ৷ প্রতিটি আসনে আমাদের দলের বিএলএ-রা কাজ করছেন ৷ এটা বলতেই হয় এই এসআইআর প্রক্রিয়া কোনও কোনও জায়গায় আমাদের দলকে এক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি ৷ যার সুবাদে আমাদের কাছে এখন সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আছে ৷ এখন শুধু আসন ধরে ধরে নয় ভোটার তালিকা ধরে ধরে রণকৌশল স্থির করতে পারি আমরা ৷" মজার কথা বাংলায় এসআইআর করা কেন দরকার তা বোঝাতে বারবার এই ধরনের নানা বিষয়কেই তুলে ধরে বিজেপি ।
ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আনুগত্য বনাম নতুন দিনের স্বপ্ন
উত্তরবঙ্গের ভেটারদের মনন তৈরি হয়েছে জীবনের বদলাতে থাকা অভিজ্ঞতার হাত ধরে । সংখ্যা সেখানে তেমন কোনও চোখে পড়ার মতো প্রভাব ফেলতে পারে না । চা বাগানের বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় কর্মসংস্থান । সেখানে সরকারের নানা ধরনের সামাজিক প্রকল্পকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে তৃণমূল । ঠিক সেখানেই আবার বিজেপির বাজি সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে জনজাতি সাংস্কৃতিক পরিচয় । শিলিগুড়ির মতো শহুরে এলাকার তরুণ ভোটারদের মন আবার পড়ে উন্নয়নে, কাজের নতুন সুযেোগে । ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আনুগত্য নয় তাঁদের কাছে বড় কথা একটা ভালো জীবন পাওয়া । পাহাড়ের লড়াইটা তৃণমূল ও তার সহযোগীদের 'উন্নয়নের পাঁচালির' সঙ্গে বিজেপি প্রদত্ত বিকল্প সুশাসনের । আর এর সঙ্গে তুলনায় ছোট রাজনৈতিক দলগুলিও যে কোনও একটি অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে সেটা ভুলে গেলে চলবে না । উত্তর দিনাজপুরের সংখ্যালঘুরা তৃণমূলে আস্থা রাখছেন মেরুকরণের রাজনীতি বিরোধিতায় । তবে প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন বা অপেক্ষাকৃত তরুণরা প্রাভাবিত হচ্ছেন সোশাল মিডিয়ায় । সেই প্রভাবের সাক্ষী বহন করতে পারে ইভিএম ।
ভাবনার ঐক্য। ও মোহভঙ্গের উপাখ্যান
2021 সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল থেকে বোঝা হয়েছিল উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের ভোট দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করে সরল চাওয়া-পাওয়া । বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে 2026 সালে উত্তরবঙ্গে মন পড়তে গিয়ে কয়েকটি বিষয়কে এড়িয়ে চলা অসম্ভব । এখন স্পষ্ট, পাহাড়-সমতলে ঘেরা এই অঞ্চলের মানুষের ভাবনাএক সুতোয় বাঁধা । তবে সেই পরিসর একান্ত ব্যক্তিগত, পরিচয় এবং চাওয়া-পাওয়ার বিবিধতায় গঠিত মোহভঙ্গের উপাখ্যান ।

