নেপাল-তিব্বত হড়পা বান, নেপথ্যে আচমকা হিমবাহ বিপর্যয়
নেপালের হড়পা বানে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা ৷ মৃতের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে ৷

Published : September 1, 2026 at 1:14 PM IST
26 অগস্ট সকালে লেন্দে খোলা-ত্রিশূলী-নারায়ণী নদী পথ দিয়ে নেমে আসা কাদা-মাটির হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে ৷ নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার ৷ মনে করা হচ্ছে, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিমবাহ ধস বা বরফের চাঁই ভাঙা এবং সম্ভবত জমাট বাঁধা হিমবাহের লেক ফেটে (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড, জিএলওএফ) যাওয়া ৷ নেপাল-তিব্বত সীমান্তে (চিনের দিকে) রাসুয়াগঢ়ীর উত্তর-পূর্বে প্রায় 20 কিমি দূরে অবস্থিত এই জলাশয় ৷
হড়পা বানের ঢেউ কোথাও কোথাও 8-10 মিটার পর্যন্ত উঁচু ছিল ৷ আধ ঘণ্টার মধ্যে ত্রিশূলীর মালেখুতে 7 মিটার এবং গালচিতে ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল 9 মিটার ৷ এই বিশাল ঢেউয়ে তিমুর, রাসুয়াগঢ়ীর বিভিন্ন এলাকা, সায়াপ্রুবেশির অংশবিশেষ, মেলাং, শান্তিবাজার এবং বেত্রাবতীর পথে যাকিছু ছিল সব ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে ৷ এই হড়পা বানে 12টি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (431.1 মেগাওয়াটের ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে), অন্তত 19টি সেতু এবং প্রায় 40 কিমি রাস্তা স্রেফ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে ৷
ঠিক কী কারণে নেপালে এই হড়পা বানের দুর্যোগ ঘটল, তা পুরোপুরি জানা যায়নি ৷ স্যাটেলাইটে তোলা ছবি এবং এলাকায় সম্প্রতি কতটা বৃষ্টি হয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাবে, এর নেপথ্যে রয়েছে হিমবাহ ধস ৷ প্রাথমিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় 4.4 তীব্রতার ভূ-কম্পনের ফলে হয়তো হিমবাহে ফাটল ধরে এই বিপর্যয় ঘটেছে ৷
যদিও আমেরিকার জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)-এর নয়া সমীক্ষা ভূমিকম্পের হাইপোথিসিসকে খারিজ করে দিয়েছে ৷ বরং, এর জন্য হিমবাহ ধস এবং পাহাড় থেকে পাথর পড়ে যাওয়াকে দায়ী করেছেন ৷ বৃষ্টির জলে বা বরফ গলা জলে মাটি ও বরফ আলগা হয়ে গেলে এই ধরনের বিপর্যয় আরম্ভ হয় ৷
নেপাল ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিএমএ) জানিয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে (চিনের দিকে) রাসুয়াগঢ়ীর উত্তর-পূর্বে প্রায় 20 কিমি দূরে লেন্দে নদীতে ধ্বংসস্তূপ পড়ে ধস নেমেছিল ৷ হিমালয়ের এবড়োখেবড়ো উপত্যকায় এই ধরনের ঘটনার ঝুঁকি এমনিতেই বাড়িয়ে দেয় ৷

ন্যাশনাল রিমোট সেনসিং সেন্টার (এনআরএসসি) অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের উৎসস্থল তিব্বতের পাহাড়-পর্বতে ৷ ভারতের ইন্ডিয়ান আর্থকুয়েক নেটওয়ার্কস সেন্টারে রেকর্ড করা তথ্য অনুযায়ী, 26 অগস্ট সকাল 8.22 মিনিট (আইএসটি) রাসুয়া এলাকার কাছে (28.076°N অক্ষাংশ, 86.494°E দ্রাঘিমাংশ) 10 কিমি গভীরে 4.9 তীব্রতার ভূ-কম্পন হয়েছিল ৷ সম্ভবত এই কম্পনের ফলেই জির্ক গ্লেসিয়ার ফেটে গিয়েছিল ৷ বরফ ও পাথরের বিশালাকার চাঁই পাহাড়ের খাড়াই ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসে এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে দেয় ৷
তারই ফল এই বিধ্বংসী হড়পা বান ৷ ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা দিয়ে বয়ে যাওয়া জল, কাদা, মাটি, পাথর আর ধ্বংসস্তূপের স্রোত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে ৷ বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছেন, হিমবাহ ভেঙে এবং বরফের চাঁইয়ে ধস নামার ফল এই হড়পা বান ৷ এই ধরনের ঘটনাগুলিকে 'গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাডস' (জিএলওএফএস) বলে উল্লেখ করা হয় ৷ 2024 সালে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল নেপালে ৷
জলবায়ু পরিবর্তন: তৃতীয় মেরুর ঝুঁকি
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দ্রুত গতিতে বরফ গলছে ৷ আর্কটিক এবং আন্টার্কটিকার পর হিমালয়ে সবচেয়ে বেশি হিমবাহ রয়েছে ৷ তাই এই অঞ্চলকে পৃথিবীর 'তৃতীয় মেরু' বলা হয় ৷ পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে কয়েক শতকের প্রাচীন বরফের স্তর, মাটি- সব গলে খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে নীচে নামতে শুরু করে এবং তার ফলে হঠাৎ ধ্বংসস্তূপের স্রোত বয়ে যায় ৷
এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় ৷ 2021 সালে উত্তরাখণ্ডে চামোলি বিপর্যয়, সুইৎজারল্যান্ডে হিমবাহ ধসে ব্লাটেন গ্রামের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এবং 2023 সালে জর্জিয়ান পাহাড়ের রিসর্টে ধস নেমে 33 জনের মৃত্যু- সবই এই দ্রুত গতিতে হিমবাহ গলে যাওয়ার পরিণতি ৷

এই ধরনের বিপর্যয়ের মোকাবিলার উপায় ?
সুইৎজারল্যান্ডে হিমবাহ ধসের আগেভাগে সতর্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে সময়ের মধ্যে এলাকাবাসীদের বিপজ্জনক জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ৷ তার ফলে প্রাণহানি খানিকটা রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল ৷
যদিও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এই ধরনের ব্যয়বহুল সতর্কতামূলক ব্যবস্থা স্থাপন করাটাই একটা বড়সড় চ্যালেঞ্জ ৷ গত বছর নেপালের নজরাদারি পরিকাঠামো উন্নত করতে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের ঘোষণা করা হয়েছিল ৷
জলের প্রাপ্যতা
এই হিমবাহগুলি গলে জল গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলিতে গিয়ে পড়ে ৷ সেখান থেকে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান এবং চিনের কয়েক কোটি মানুষ পরিস্রুত পানীয় জল পায় ৷ হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সাময়িকভাবে নদীর স্রোত বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু শুষ্ক আবহাওয়ায় হিমবাহগুলি জমাট বেঁধে গেলে জলের সরবরাহ অনেকটাই কমে যায় ৷ তখন জলের সঙ্কট দেখা দেয় ৷
এই সমস্যার একটিই সমাধান- গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস করা, আগেভাগে সতর্কতা জারি করবে এমন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ এবং বিপজ্জনক পাহাড়ি এলাকাগুলিতে সর্বক্ষণের নজরদারি চালানোর বন্দোবস্ত করা ৷ এই সার্বিক ব্যবস্থা হয়তো সম্পূর্ণরূপে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবে না, কিন্তু হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে ৷

