মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে: এক আলোকবর্তিকা যা আজও ভারতকে পথ দেখায়
মহাত্মা ফুলের সমগ্র জীবনব্যাপী কর্মসাধনায় শিক্ষা, জ্ঞানার্জনই হয়ে উঠেছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, জ্ঞান এমন এক শক্তি যাকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।

Published : April 11, 2026 at 8:25 PM IST
আজ 11 এপ্রিল, আমাদের সকলের কাছেই এক অত্যন্ত বিশেষ দিন। আজ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলের জন্মবার্ষিকী আজ। এ বছর এই দিনটি আরও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ আজ থেকেই তাঁর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের সূচনা হচ্ছে।
মহাত্মা ফুলে ছিলেন এক মহান সংস্কারক। এর পাশাপাশি, তাঁর জীবন ছিল নৈতিক সাহস, নিরন্তর অনুসন্ধিৎসা এবং জনকল্যাণের প্রতি অটল অঙ্গীকারের এক মূর্ত প্রতীক। মহাত্মা ফুলে মূলত স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনগুলির জন্য। একই সঙ্গে, আমাদের সভ্যতার অগ্রগামী যাত্রায় তাঁর অবদান নিহিত রয়েছে সেই আশার সঞ্চারে, সেই আত্মবিশ্বাসের জাগরণে এবং তাঁর চিন্তাধারা থেকে উদ্ভূত সেই শক্তির মধ্যে— যা আজও সমগ্র দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রতিনিয়ত শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।

1827 সালে মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী মহাত্মা ফুলে অত্যন্ত সাধারণ এক পারিবারিক পটভূমি থেকে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রাথমিক জীবনের কঠোর সংগ্রাম কখনওই তাঁর শিক্ষালাভ, তাঁর সাহস বা সমাজের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এটি এমন একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা তাঁর সারা জীবন অটুট ছিল ৷ পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, হাত গুটিয়ে বসে না থেকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং সেই চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করতে হবে। স্কুলজীবন থেকেই কিশোর জ্যোতিরাও ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী এবং হয়ে উঠেছিলেন একজন জ্ঞানপিপাসু পাঠক ৷ তিনি প্রায়শই এমন সব বই পড়তেন যা তাঁর সমবয়সি শিশুদের পড়ার কথা ভাবাই যেত না। বহু বছর পর তিনি বলেছিলেন, “আমরা যত বেশি প্রশ্ন তুলব, সেই প্রশ্নগুলো থেকেই তত বেশি জ্ঞানের উন্মেষ ঘটবে।” এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, শৈশব থেকেই তিনি অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার অধিকারী ছিলেন, তা তাঁর জীবনের সমগ্র যাত্রাপথেই অপরিবর্তিত ছিল।
মহাত্মা ফুলের সমগ্র জীবনব্যাপী কর্মসাধনায় শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনই হয়ে উঠেছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু। তিনি এক বিরল স্বচ্ছ দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে, জ্ঞান কোনও এমন বিশেষ অধিকার নয় যাকে কেবল আগলে রাখতে হবে; বরং এটি এমন এক শক্তি যাকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। যখন শিক্ষালাভ থেকে সমাজের বহু মানুষকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল, এমন এক সময়ে তিনি মেয়েদের জন্য এবং প্রথাগত শিক্ষা থেকে দূরে রাখা মানুষদের জন্য বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “মায়েরাই যেহেতু সন্তানদের গড়ে তোলেন, তাই শিশুদের মধ্যে শিক্ষার মাধ্যমে যে কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তা অত্যন্ত মূল্যবান। সুতরাং, যদি নতুন কোনও স্কুল বা শিক্ষালয় স্থাপন করতেই হয়, তবে সবার আগে তা মেয়েদের জন্যই স্থাপন করা উচিত।” তিনি এমন এক নতুন সামাজিক ভাবনার জগত গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে গিয়েছেন, যেখানে শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠেছিল ন্যায়বিচার ও সাম্যের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর যে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা আমাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। গত এক দশক ধরে, আমরা ভারতের তরুণ প্রজন্মের জন্য গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছি। বর্তমানে এমন একটি অনুকূল পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে, যেখানে তরুণ মনগুলোকে প্রশ্ন করতে, নতুন কিছু অন্বেষণ করতে এবং উদ্ভাবনী কাজে ব্রতী হতে উৎসাহিত করা হয়। জ্ঞানার্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারত তার তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে ক্ষমতায়িত করছে, যাতে তারা সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানকারী এবং জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সুবাদে, মহাত্মা ফুলে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলিতে গভীর অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করেছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন যে, "আমাদের কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতি অবিচার আমাদের সমাজকেই দুর্বল করে তোলে।" তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে, সামাজিক বৈষম্যগুলি কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে— তা সে কৃষিক্ষেত্রে হোক বা গ্রামগঞ্জে— প্রকাশ পায়। তাই, তিনি দরিদ্র, নিপীড়িত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা নিশ্চিত করার কাজে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেছিলেন। একই সঙ্গে, তিনি সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সম্ভাব্য সকল প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
মহাত্মা ফুলে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, "সমাজে প্রত্যেককে সমান অধিকার প্রদান না করা পর্যন্ত প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব নয়।" আর এই লক্ষ্যেই তিনি এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যা তাঁর এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে অবদান রেখেছিল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'সত্যশোধক সমাজ' ছিল আধুনিক ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সমাজ সংস্কার আন্দোলন। সমাজ সংস্কার, জনসেবা এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই আন্দোলন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। নারী, তরুণ সমাজ এবং গ্রামগঞ্জে বসবাসকারী মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মহাত্মা ফুলের সেই গভীর বিশ্বাসটিই প্রতিফলিত হয়েছিল যে— সমাজকে শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব, যদি এর মূলভিত্তি হিসেবে ন্যায়বিচার, প্রতিটি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মিলিত অগ্রগতির চেতনাকে স্থাপন করা হয়।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত বহন করে। সর্বদা কর্মব্যস্ত থাকা এবং সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে সময় কাটানোর ফলে তাঁর স্বাস্থ্যের ওপর বেশ চাপ পড়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতিও তাঁর সংকল্পকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি। এক মারাত্মক স্ট্রোকের শিকার হওয়ার পরেও তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন। হ্যাঁ, তাঁর শরীর হয়তো চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল; কিন্তু সমাজের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার কখনোই নতি স্বীকার করেনি। আজকের দিনে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে— বিশেষ করে যাঁরা সংগ্রামের পথেই সাহসের সন্ধান পান— মহাত্মা ফুলের জীবনের এই দিকটি আজও এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
মহাত্মা ফুলের কোনও স্মরণই সাবিত্রীবাই ফুলের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ উল্লেখ ছাড়া পূর্ণতা পেতে পারে না; তিনি নিজেও ছিলেন আমাদের জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক। ভারতের নারী শিক্ষকদের অগ্রদূত হিসেবে, তিনি মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে তাদের নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মহাত্মা ফুলের প্রয়াণের পর, সাবিত্রীবাই সেই মশালকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং 1897 সালে প্লেগ মহামারীর সময় আক্রান্তদের এমন গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা করেন যে, তিনি নিজেও সেই রোগে আক্রান্ত হন এবং নিজের প্রাণ হারান।
আমাদের এই পুণ্যভূমি বারবার এমন সব মহান নারী ও পুরুষের স্পর্শে ধন্য হয়েছে, যাঁরা তাঁদের চিন্তা, ত্যাগ ও কর্মের মাধ্যমে সমাজকে শক্তিশালী করেছেন। তাঁরা পরিবর্তনের জন্য অন্য কোথাও থেকে সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকেননি; বরং তাঁরা নিজেরাই হয়ে উঠেছিলেন সেই পরিবর্তনের উৎস। শত শত বছর ধরে আমাদের এই ভূমিতে সামাজিক উন্নতির আহ্বান প্রায়শই সমাজের ভেতর থেকেই ধ্বনিত হয়েছে—সেই মানুষদের কণ্ঠেই, যাঁরা সমাজের দুঃখ-কষ্টকে স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছিলেন এবং তাকে কেবলই 'ভাগ্যলিপি' হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে ছিলেন এমনই এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
2022 সালে পুনে সফরের স্মৃতি আমি আজও গভীর ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করি; সেই সফরে আমি শহরের বুকে স্থাপিত মহাত্মা ফুলের বিশাল মূর্তির পাদদেশে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলাম। আমরা যখন তাঁর দ্বিশতবার্ষিকী বর্ষের সূচনা লগ্নে দাঁড়িয়ে আছি, তখন মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলের প্রতি আমাদের সবচেয়ে উপযুক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে এক নবায়নের অঙ্গীকার—এমন এক নবায়ন, যা তাঁর হৃদয়ের অত্যন্ত প্রিয় বিষয়গুলোর প্রতি—যেমন শিক্ষা—আমাদের অঙ্গীকারকে নতুন করে জাগিয়ে তুলবে। অন্যায়-অবিচারের প্রতি আমাদের সংবেদনশীলতাকে শানিত করবে। এবং এই বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করবে যে, সমাজ তার নিজস্ব অন্তর্নিহিত শক্তির মাধ্যমেই নিজেকে উন্নত করতে সক্ষম। তাঁর জীবন আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, নৈতিক স্বচ্ছতা ও জনকল্যাণমুখী উদ্দেশের সঙ্গে যখন সমাজের সম্মিলিত শক্তি যুক্ত হয়, তখন ভারতের বুকে অলৌকিক সাফল্য অর্জন করাও সম্ভব। ঠিক এই কারণেই তিনি আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে শক্তির সঞ্চার করেন। ঠিক এই কারণেই তাঁর বাণী ও কর্ম আজও মানুষের মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে। আর ঠিক এই কারণেই—তাঁর জন্মের প্রায় দুশো বছর পরেও—মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে কেবল অতীতের কোনো ব্যক্তিত্ব হয়েই সীমাবদ্ধ নন, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন ভারতের ভবিষ্যতের এক আলোকোজ্জ্বল পথপ্রদর্শক।

