ETV Bharat / opinion

চিনের চ্যালেঞ্জ উড়িয়ে মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে চায় ভারত, জটিলতা কোথায় ?

বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশের মতে, ভারত ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিক সম্পর্কটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

India Central Asia
চিনের চ্যালেঞ্জ উড়িয়ে মধ্য এশিয়ায প্রভাব বাড়াতে চায় ভারত, (ছবি : পিআইবি)
author img

By Nirmala Ganapathy

Published : September 3, 2026 at 1:18 AM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন, আগামী বছর মধ্য় এশিয়া সম্মেলন হবে ভারতে । পাঁচ বছর বাদে আবারও ভারতে এই সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার মধ্যে দিয়ে দিল্লি বুঝিয়ে দিয়েছে তার এই এলাকায় নতুন করে আর্থিক এবং কৌশলগত পদক্ষেপকে মজবুত করতে চায় ।

এর আগে মাত্র একবার 2022 সালে এই সম্মেলনের আয়োজন ভারতে হয়েছিল । এবার আবারও সম্মেলন আয়োজন নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে । এই সময়টা নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে । বছরখানেক আগে ইউরেশিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য় নিয়ে চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে শুরু করে ভারত । এখনও চুক্তি হয়নি । তবে ব্যবস্থা সব পাকা । ওই ইউনিয়নে আছে আর্মেনিয়া, বেলারুস, কাজাগস্থান, কিরিগিস্থান এবং রাশিয়া ।

কিন্তু সম্মেলনের আয়োজনের মাধ্য়মে কি মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের আর্থিক সম্পর্ক আরও মজবুত হবে ? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ইউক্রেন এবং ইরান সঙ্কটের আগামীর উপর। মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও নিবিড় করতে যে সমস্ত প্রকল্পগুলি হাতে নেওয়া হয়েছে সেগুলি এই দুই সঙ্কটের কারণে আটকে পড়ে আছে। তাছাড়া এই এলাকার চিনের উপস্থিতি এবং প্রভাব-দুটোই খুব বেশি । দিল্লি মধ্য এশিয়াকে প্রতিবেশী ভাবে বটে কিন্তু সেখানে সরাসরি যাওয়ার কোনও পথ ভারতের কাছে নেই ।

যোগাযোগের সমস্যা

ভারতের এই মধ্য এশিয়া তৎপরতার নেপথ্যে একইসঙ্গে আর্থিক এবং কৌশলগত কারণ লুকিয়ে আছে। কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তান খণিজ পদার্থ থেকে শুরু করে হাইড্রো কার্বনের সম্ভার । আর তাছাড়া ভারতীয় পণ্যের বিরাট বাজারও বটে।

অন্যদিকে, এই দেশগুলির জন্যও ভারত এক বিরাট সম্ভাবনাময় বাজার ৷ তার পাশাপাশি চিন এবং রাশিয়ার পর তৃতীয় বিকল্প। মূলত এই দুটি দেশের প্রভাব রয়েছে মধ্য এশিয়ায়। চিন এবং রাশিয়ার মতো ভারত মধ্য এশিয়ার কোন দেশের সঙ্গে সীমানা ভাগ করে নেয় না । মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর একমাত্র রাস্তাটাও পাকিস্তানের ভিতর দিয়ে যায় । তাই সেটাও ভারতের কাছে ব্যবহারযোগ্য নয়।

ইরানে ছাবার বন্দর নির্মাণ সংক্রান্ত উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। এই বন্দর তৈরি হলে ইরান হয়ে মধ্য এশিয়ায় পৌঁছে যাওয়া ভারতের পক্ষে সহজ ছিল। কিন্তু ইরানের বর্তমান সংঘাত এবং আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেই প্রকল্প এখনই বাস্তবায়িত হবে না।

এই বন্দর নির্মাণের আশা ভারত যে একেবারে পরিত্যাগ করেছে তেমনটা ভাবার অবশ্য কোনও কারণ নেই। বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি সম্প্রতি জানিয়েছেন, ছাবার বন্দরের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পক্ষের সঙ্গে ভারত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই উদ্যোগে আরও গতি আনার প্রক্রিয়া শুরু করবে দিল্লি ।

একইভাবে আন্তর্জাতিক উত্তর দক্ষিণ করিডর তৈরি নিয়েও ভারত আশাবাদী। ভারত থেকে রাশিয়ায় পৌঁছানোর সড়কপথ-রেলপথ এবং জলপথ এই করিডরের অন্তর্ভুক্ত। ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই দুই পথেই পরিকাঠামো নির্মাণের গতি কমেছে।

ব্যবসা বাড়ছে

ভৌগোলিক সমস্যা আছে। আছে যোগাযোগের সমস্যাও। তারপরও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের ব্যবসা বাণিজ্য আগের থেকে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সামগ্রিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল কমবেশি 2 বিলিয়ন ডলার। গত 15 বছরের প্রেক্ষাপটে এই পরিমাণটি সাড়ে তিনগুণ বেশি।

ভারত এই সমস্ত দেশে তেল-সার এবং কাঁচা সিল্ক পাঠায়। তামার টিউবও যায় ভারত থেকে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলি থেকে ভারত ওষুধ এবং কৃষিজাত পণ্য আমদানি করে। দু'পক্ষই চায় ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও ভালো করতে।

মোদির উজবেকিস্তান সফরে সে দেশের তরফে এক মাসের ভিসা-মুক্ত যাত্রার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতীয় নাগরিকরা একমাস পর্যন্ত ভিসা ছাড়াই উজবেকিস্তানে থাকতে পারবেন। ব্যবসার পাশাপাশি শিল্পে গতি আনতেই এমনটা করা হয়েছে।

দুটি দেশই চায় কৌশলগত দিক থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তৈরি হোক। তারই অংশ হিসেবে ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ইউরেনিয়াম সরবরাহ করা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তালিকায় আছে অন্য খনিজ পদার্থও। 26তম এসসি ও সম্মেলনে এই বিষয়টি উঠে এসেছে । এই আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার উপর প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন। বাণিজ্য এবং ব্যবসার উপর আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব কী হতে পারে সেকথাও তুলে ধরেছেন মোদি। তাকে বলতে শোনা যায়, "ভারত সেই সমস্ত পদক্ষেপকে সমর্থন করে যা বাজারের সঙ্গে জড়িত, বাণিজ্যের পরিবেশ তৈরি করে উন্নয়নের নতুন নতুন রাস্তা খোলে। "

চিনকে টেক্কা দিতে পারবে ভরত ? ়

ভারত এবং মধ্য এশিয়ার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হলে চিনের প্রসঙ্গে অবশ্যই আসবে। ভৌগোলিক বাধা এবং অন্য প্রতিবন্ধকতাকে পরাজিত করে ভারত মধ্য এশিয়ার প্রভাব বিস্তার করতে পারবে কিনা সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই এলাকায় চিনের প্রভাব সর্বজনবিদিত । সেই প্রভাবকে অতিক্রম করে ভারত কী কী করতে পারে সেটাই এখন দেখার । মধ্য এশিয়ার সঙ্গে চিনের বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ 100 বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। শুধু তাই নয় চিনের বহুচর্চিত বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগেরও একটি বড় অংশ মধ্য এশিয়া।

চায়না-গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য় এশিয়ায় চিনের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এখন আর কেবল তেল ও গ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই । বরং তা উৎপাদন শিল্প, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি এবং কৃষি প্রযুক্তির মতো বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্য এশিয়ায় চিনের বিনিয়োগের পরিমাণ 35 বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণটি রাশিয়ার বিনিয়োগকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, মধ্য এশিয়ায় ভারতের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক 1.5 বিলিয়ন ডলার । বাণিজ্যের পরিমাণ 2 বিলিয়ন ডলারের কম

চিনের সঙ্গে ভারত সরাসরি প্রতিযোগিতায় পেরে উঠবে না । তবুও বিশ্লেষকদের মতে, চিনের বাড়তে থাকা আধিপত্যকে মাথায় রেখে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় ভারত মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি ভালো বিকল্প অবশ্যই হয়ে উঠতে পারে।

তিলোত্তমা ফাউন্ডেশনের ইউরেশিয়া অ্যান্ড ওয়েস্ট এশিয়া সেন্টারের প্রধান এবং এই অঞ্চলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চর্চা চালিয়ে আসা বিশেষজ্ঞ মিনা সিং রায় বলেন, "মধ্য এশিয়ার দেশগুলি চায় ভারত আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করুক। তাদের সঙ্গে নানা ব্যাপারে সম্পৃত্ত হওয়ার গতিধারা বজায় রাখুক। সহযোগিতার ভবিষ্যৎ ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে—ডিজিটাল পরিকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যাঙ্কিং, খেলাধুলো, পর্যটন, খাদ্য নিরাপত্তা, বস্ত্র শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা বিষয়। ভারত ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিক সম্পর্কটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।" তাঁর পরামর্শ, ভারত মধ্য এশিয়ার জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ করতে পারে।

সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে ভারত ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলি রাজনৈতিক ও কৌশলগত আগ্রহ স্পষ্ট করেছে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থাপনাই নির্ধারণ করবে যে এই অঞ্চলে ভারত কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তবে যোগাযোগ বিষয়ক বড় কোনও প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলেও ভারত মধ্য় এশিয়ার সঙ্গে আদানপ্রদান আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে পারে । বাণিজ্য বৃদ্ধির উপায় খুঁজতে পারে। মিনা আরও বলেন, "সহযোগিতার এই গতিধারা আমাদের ধরে রাখতে হবে। যদি আমরা 2027 সালে মধ্য এশিয়া শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করি, তবে 2028 সালেও তা আমাদেরই আয়োজন করতে হবে।"