সাদ্দামকে প্রকাশ্যে সমর্থন থেকে কৌশলী নীরবতা- কেরল রাজনীতির উপসাগরীয় যোগ
1990 সালে পশ্চিম এশিয়ায় পাশ্চাত্য শক্তির আগ্রাসনের নিন্দা করে সাদ্দামকে সমর্থন করেছিল সিপিএম ৷ এবারের সংঘাতে অবশ্য ধরা পড়েছে অন্য ছবি ৷

Published : March 9, 2026 at 8:11 PM IST
জয়ন কোমাথের প্রতিবেদন
কেরলের রাজনীতির উপর পশ্চিম এশিয়া ও উপসাগরীয় দেশে হওয়া সংঘাতের প্রভাব ঐতিহাসিক ৷ মধ্যপ্রাচ্যের সেই অস্থিরতা নির্বাচনী প্রচারের অংশ হয়েছে অতীতে ৷ তবে বর্তমানে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনও প্রভাব ভগবানের আপন দেশের রাজনীতির উপর সেভাবে পড়েনি ৷ ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও আমেরিকার সংঘাত আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ইস্যু হয়ে ওঠেনি ৷ আর তার ফলে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের রণকৌশলে বিরাট কোনও বদল এনেছে তা নয় ৷
তবে 1990 সালের জেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি দেখা গিয়েছিল ৷ সেবারই প্রথম জেলা পরিষদ গঠনের জন্য ভোট হয় রাজ্যে ৷ কেরলে তখন ক্ষমতায় বাম সরকার ৷ মুখ্যমন্ত্রী ইকে নয়ানার ৷ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক ভিএস অচ্যুতানন্দন ৷ দলের তাবড় নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ সাধারণ সম্পাদক ৷ সেবারও উপসাগরীয় এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল ৷ জেলা পরিষদের নির্বাচনে সংঘাত থেকে ব্যাপক ফয়দা তুলতে সক্ষম হয়েছিল সিপিএম ৷ সে সময় নির্বাচনী প্রকাশ্যে নাম্বুদিরিপাদকে প্রকাশ্যে বলতে শোনা যেত, "আমরা সাদ্দামের পাশে আছি ৷ আপনি কি তাঁকে সমর্থন করেন ?"
1990 সালের 2 অগস্ট কুয়েত আক্রমণ করেন ইরাক ৷ সেই আক্রমণের অভিঘাতে শঙ্কিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ৷ উপসাগরীয় এলাকায় বসবাসরত কেরলের বাসিন্দা থেকে শুরু করে অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়েছিল ৷

ইরাকের সুপ্রিম নেতা সাদ্দাম হোসেন কুয়েতে আক্রমণ করেছিলেন এক বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে ৷ কুয়েত থেকে বাহিনী প্রত্যাহারকে তিনি যুক্ত করেছিলেন প্যালেস্তাইন ইস্যুর সঙ্গে ৷ সে সময় পশ্চিম এশিয়ায় পাশ্চাত্য শক্তির আগ্রাসনের নিন্দা করে সাদ্দামকে সমর্থন করেছিল সিপিএম ৷ তাদের সেই আদর্শগত অবস্থান মুসলমান ভোটারদের পছন্দ হয়েছিল ৷ তার সুফল পেয়েছিল বাম দলটি ৷ তবে সেই মনোভাবের দীর্ঘমেয়াদি হয়নি ৷
ঠিক একবছর বাদে 1991 সালে হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে বড় জয় পায় কংগ্রেসের নেতৃত্বে থাকা ইউডিএফ ৷ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির হত্যা সেবার কংগ্রেসের প্রতি রাজ্যের ভোটারদের মনে বিশেষ আবেগের সঞ্চার করেছিল ৷ সেবার প্রথমে লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ভিএস অচ্যুতানন্দন পরে কেরল বিধানসভার বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পালন করেছিলেন ৷
দীর্ঘদিন ধরে কেরলের নির্বাচনী প্রচারে প্যালেস্তাইনের প্রসঙ্গ তুলছে সিপিএম ৷ তবে এবার ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল-আমেরিকার সামরিক সংঘাতকে রাজ্য রাজনীতির ইস্যু করতে তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না সিপিএম ৷
প্রবীণ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম জয়াচন্দ্রন জানিয়েছেন, ইরান সঙ্কট এবং তার সঙ্গে থাকা ঘটনাগুলিকে ভোটের ইস্যু করার বিলাসিতা করতে পারবে না বামেরা ৷ তারা আমেরিকা-ইজরায়েলের আক্রমণের বিরোধিতা করেছে ৷ আমেরিকাকে যুদ্ধবাজ অ্যাখ্যা দিয়ে প্রতিবাদে রাস্তাতেও নেমছে ৷ তবে এই ইস্যুকে সামনে রেখে নির্বাচনে লড়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয় ৷ আর তাই এই ইস্যুতে জনমত গঠনের কোনও মরিয়া প্রয়াসও তাদের তরফে দেখা যায়নি ৷
সিপিএমের নয়া নীতির কারণ
সিপিএমের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে বেশ ককেয়কটি কারণ কাজ করছে ৷ প্রথমেই বলা হয় মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্য়ে থাকা সিয়া-সুন্নি বিভাজন ৷ কেরলে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে বেশিরভাগই সুন্নি ৷ সিয়া-রা সংখ্যায় কম ৷ এই হিসেব থেকে কেরলের কোনও দলের পক্ষে ইরানপন্থী অবস্থান নেওয়ার খুব একটা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই ৷

অর্থনীতির ভূমিকা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে ৷ গাল্ফ কর্পোরেশন কাউন্সিল বা জিসিসি'র মধ্যে থাকে দেশগুলির সঙ্গে কেরলে সম্পর্ক খুবই নিবিড় ৷ এই সমস্ত দেশে কেরলের বহু বাসিন্দা থাকেন কর্মসূত্রে ৷ তাঁদের থেকে আসা অর্থ কেরলের সামগ্রিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ ৷
এমন নানা কারণে রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে কোনও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া সহজ নয় ৷ আরেকটি বড় কারণ হল প্রস্তাবিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর ৷ কেরল সরকারের কাছে এই প্রস্তাবিত করিডর এক অপার সম্ভাবনার দুনিয়া ৷
এই করিডর চিন এবং ইরানকে বাইপাস করে কেরলের আর্থিক উন্নতিতে বড় ভূমিকা নেবে ৷ ভিজিনজাম সমুদ্রবন্দরের মতো পরিকাঠামো আরও বেশি পরিমাণে গড়ে উঠবে ৷ এর ফলে কেরলের রোজগার বৃদ্ধি পাবে অনেকটা ৷
রাজনৈতিক দল ব্যাতি রেখে জামাত-ই-ইসলামির মতো সংগঠন ইরানের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে ৷ ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ নীরবতাকেই শ্রেয় বলে মনে করেছে ৷ বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, মধ্য়প্রাচ্যের এই উত্তেজনা স্বত্তেও বহু মানুষ কেরলে ফিরে আসবেন এমন সম্ভাবনা বিশেষ নেই ৷
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম জয়াচন্দ্রন এবং কেরল পরিকল্পনা পর্ষদের প্রাক্তন সদস্য জি বিজয়রাঘবন মনে করছেন, আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা এবং কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে সংঘাত স্থিমিত হয়ে আসতে পারে ৷ বিজয়রাঘবনের আরও অনুমান, এই সংঘাতের ফলে বহু সংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেরলে ফিরে আসবেন তেমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই ৷ তবে কিছু মানুষের মোহভঙ্গ হবে এবং তাঁরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেরলে ফিরে আসবেন সেটা ধরে নেওয়াই যায় ৷
কেরলের অনাবাসী বাসিন্দারা এই সংঘর্ষের পরিবেশে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন ৷ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে থাকা এই সমস্ত বাসিন্দারা নিজেদের মাতৃভূমিতে আবাসন-সহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করে থাকেন ৷ কিন্তু যুদ্ধের কারণে আগামিদিন আর ততটা রোদ ঝলমলে হবে না ধরে নিয়ে যদি তারা বিনিয়োগ বন্ধ করেন সেটা কেরলের অর্থনীতিকে অবশ্যই চাপে ফেলবে ৷ কারণ, রাজ্যের অর্থনীতির একটা বড় অংশই হল বাইরে থেকে আসা টাকা ৷

একসময় কেররে রাজনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলা পশ্চিম এশীয় সমীকরণ আজকের রাজনীতিতে ফিকে হয়ে এসেছে ৷ নির্বাচনের প্রচারে তার অস্তিত্বও এখন তেমন প্রবল নয় ৷ একটা সময় দেশের বাইরে বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশে থাকা ভোট কেরলের রাজনীতিকে নানাভাবে প্রভাবিত করত ৷ চাটার্ড বিমানে চড়ে ভোট দিতে আসার ঘটনাও ঘটেছে অতীতে ৷ কেএমসিসি, নবোদয় এবং কৈরালির মতো সংগঠন প্রচারও চালাত ৷ কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা ৷ রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সংগঠন গুলিও প্রচার করছে না ৷ মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এমন অভাবনীয় পরিবর্তন দেখে অবাক হতে হয় অবশ্যই ৷

