দ্বিপাক্ষিত সম্পর্কের বৈচিত্র, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরিবেশবান্ধব উন্নতিতে ভুটানের পাশে ভারত
হিমালয়ের দেশগুলির মধ্যে কৌশলগত সম্পর্কের প্রতিযোগিতা তীব্রতর ৷ এমন সময়ে ভুটানের উন্নয়নে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করছে ভারত ৷ লিখছেন অরুণিম ভুঁইয়া ৷

Published : August 1, 2026 at 10:43 PM IST
ভারত-ভুটানের মধ্যে পঞ্চম 'ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন টকস' আলোচনা প্রথাগত উন্নয়নে সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে এখন একটি বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়েছে ৷ থিম্পুর সঙ্গে নয়াদিল্লির অংশীদারিত্বে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী পরিকাঠামো থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা, পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ব্যবস্থা (গ্রিন মোবিলিটি) এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলি ।
হিমালয় অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন তীব্রতর, ঠিক সেই সময় ভুটানের ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে ভারত সমর্থন জানিয়েছে, যা দেশটির প্রধান উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে ভারতের ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করেছে ৷ একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে বিশ্বস্ত সম্পর্কের গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করছে ৷
রাজধানী থিম্পুতে ভুটানের ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (FYP) বিষয়ক পঞ্চম ভারত-ভুটান উন্নয়ন সহযোগিতা আলোচনায় এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ৷
শুক্রবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মন্ত্রকের সচিব বিক্রম মিস্রী এবং ভুটানের বিদেশ সচিব দাশো পেমা লেকতুপ দর্জি "উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আঞ্চলিক বিষয়" নিয়ে আলোচনা করেছেন ৷
ভুটানের ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (2024-29)-য় ভারত সরকারের দশ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সাহায্যের সামগ্রিক অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের বিষয়টিও পর্যালোচনা করেন তাঁরা । এর আওতায় রয়েছে প্রজেক্ট টায়েড অ্যাসিস্ট্যান্স (PTA), হাই ইমপ্যাক্ট কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস (HICDP), ইকোনমিক স্টিমুলাস প্রোগ্রাম (ESP) এবং প্রোগ্রাম গ্রান্ট ৷
'প্রজেক্ট টায়েড অ্যাসিস্ট্যান্স' দ্বিপাক্ষিক আর্থিক সহায়তার এমন একটি রূপ যেখানে নির্দিষ্ট ও পূর্ব-সম্মত উন্নয়ন প্রকল্পগুলির জন্যই অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে এবং সেই প্রকল্পগুলিতে সীমাবদ্ধ রাখা হয় ৷
পরিকাঠামো, স্বাস্থ্যপরিষেবা, কৃষি, শহুরে সুযোগ-সুবিধা এবং বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলি মিলিয়ে মোট 332 কোটি টাকা ব্যয়ে 12টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে ৷
হিমালয় অঞ্চলে দেশগুলির মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা জোরদার হয়ে চলেছে ৷ আর নয়াদিল্লি তার 'নেবারহুড ফার্স্ট' বা 'প্রতিবেশী-প্রথম' নীতিকে আরও গভীর করতে চাইছে ৷ বিশ্বস্ত আঞ্চলিক সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে ৷ এমন এক সময়ে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হল ৷
পরিকাঠামোয় আর্থিক বিনিয়োগ ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক পরিবহণ ব্যবস্থা ও নগর উন্নয়ন— এই বিষয়গুলি আলোচনাই সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান বিস্তারকে প্রতিফলিত করে ৷ এই সম্পর্ক এখন চিরাচরিত অর্থনৈতিক সাহায্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে ৷
এর আগে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পর্যায়ে প্রধানত সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ এবং মৌলিক পরিকাঠামোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হত ৷ বর্তমানে প্রকল্পগুলির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী নগর উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামো, জনপরিসর, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতার মতো বিষয়গুলি ক্রমশ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ৷ উভয় দেশের বিদেশ সচিবরা পিটিএ (PTA) প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ‘থিম্পু ইকোলজিক্যাল পার্ক’ এবং ‘ওলাখা পার্ক’-এর ভার্চুয়াল উদ্বোধন করেন ৷
এছাড়া, 'অ্যাক্সিলারেট ই-মবিলিটি আপটেক ইন ভুটান' শীর্ষক পিটিএ প্রকল্পের আওতায় সংগৃহীত ৪৫টি বৈদ্যুতিক যান ভুটানের রাজকীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ৷
এই অগ্রাধিকারগুলি ভুটানের ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বা ‘সামগ্রিক জাতীয় সুখ’ বিষয়ক উন্নয়নমূলক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত স্থায়িত্বের উপরও জোর দেয় ৷
ভুটানকে ভারতের 45টি বৈদ্যুতিক যানের হস্তান্তর দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের প্রতি বৃহত্তর গুরুত্ব প্রদানের বিষয়টিকেই আরও জোরদার করে। ইতিমধ্যে ভুটান কার্বন-নেগেটিভ দেশ হিসেবে পরিচিত অর্থাৎ কোনও কার্বন নির্গত হয় না ৷ পরিবেশ নিয়ে তারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
এই বৈদ্যুতিক যান ব্যবস্থার জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো, পরিবহণের ফলে নির্গমন হ্রাস, পরিচ্ছন্ন নগর পরিবহণ ব্যবস্থার পক্ষে এবং জলবায়ু বিষয়ক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অবদান রয়েছে ৷
এই উদ্যোগটি ভারতের ক্রমবর্ধমান বৈদ্যুতিক যানের বাস্তুতন্ত্রকে তুলে ধরার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বাস্তবসম্মত সহযোগিতার নিদর্শনও বটে ৷ শিলং-এর সংস্থা ‘এশিয়ান কনফ্লুয়েন্স’-এর ফেলো কে ইয়হোমের মতে, পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের ক্ষেত্রে ভারত ও ভুটান উভয়ই নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করছে ৷
ইয়হোম ইটিভি ভারতকে বলেন, “ভুটান সরকার পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে, বিশেষত হিমালয় অঞ্চলে দেশটির অবস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে। জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশের অবক্ষয়ের ফলাফল সম্পর্কে ভুটান সচেতন। ভুটানের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচিতি পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”
তিনি উল্লেখ করেন, পর্যটন ভুটানের আয়ের দুটি প্রধান উৎসের একটি ৷ অন্যটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ।
এই প্রসঙ্গে অবশ্য ইয়হোমের বক্তব্য, “তা সত্ত্বেও, তারা দেশে আসা পর্যটকদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে তাদের জাতীয় পরিবেশগত লক্ষ্যের সঙ্গে আপস করতে না-হয় ৷”
ঐতিহাসিকভাবেই ভারত-ভুটান অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জলবিদ্যুৎ প্রধান ভূমিকা পালন করে এসেছে ৷ ভুটানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতের জ্বালানির চাহিদা মেটায় ৷ পাশাপাশি দেশটির জলবিদ্যুৎ রফতানি উল্লেখযোগ্য আয় নিশ্চিত করে ৷
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই ক্ষেত্রে সচেতনভাবে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা খেয়াল করা গিয়েছে ।
1961 সালে হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই দেশটি পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সূচনা হয় ৷ সেই সময় থেকে ভারত, ভুটানের উন্নয়নে বৃহত্তম সহযোগী দেশে হিসেবে কাজ করছে। ভুটানের প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ভারত উল্লেখযোগ্য মাত্রায় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে ৷
পঞ্চম 'ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন টকস' আলোচনায় ভুটানের ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ভারতের সহযোগিতার দিকটি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ভুটানের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে ৷
ভারতের সহযোগিতার প্রতি ভুটানের ইতিবাচক মনোভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ৷ কারণ উন্নয়নে সহযোগিতাই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি ৷
অধিকাংশ দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের মতো নয় ভারত-ভুটানের সম্পর্ক ৷ দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট নিয়মিত আলোচনা ৷ এই আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ যৌথভাবে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে, যাতে প্রকল্পগুলি ভুটানের নিজস্ব জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
4 হাজার কোটি টাকার এই ঋণের সুবিধা (কনসেশনাল লাইন অফ ক্রেডিট) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি ভুটানের উপর ঋণের বোঝা বা পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে না-বাড়িয়ে অনুকূল শর্তে পরিকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ করে দেয় ৷
দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে অর্থের বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ ঠিক এমন সময়ে এই ঋণের সুবিধা ভুটানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে সাহায্য করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহকেই তুলে ধরে ৷
ভুটান বর্তমানে জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রের বাইরেও তাদের অর্থনীতির বৈচিত্র্য আনার এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে ভারতের অর্থনৈতিক অবদান পরিবহণ পরিকাঠামো, নগর উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল সংযোগ, জনসেবা এবং শিল্প উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ভুটানের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সহযোগিতা করার মাধ্যমে ভারত তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশটির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাতেও অবদান রাখছে ৷
বিদেশ মন্ত্রকের তরফে আরও জানানো হয়েছে যে, ভুটানে জ্বালানি প্রকল্পের জন্য 4 হাজার কোটি টাকার নমনীয় ঋণ সুবিধা কার্যকর করার লক্ষ্যে ভুটান সরকার এবং ভারতের এক্সিম (EXIM) ব্যাঙ্কের মধ্যে একটি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ৷ পাশাপাশি, স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে গবেষণা ও বিনিময় কর্মসূচিতে সহযোগিতার লক্ষ্যে নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস) এবং ভুটানের খেসার গেয়ালপো ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (কেজিইউএমএসবি)-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় করা হয়েছে ৷
নয়াদিল্লির এইমস এবং ভুটানের কেজিইউএমএসবি-র মধ্যকার এই সমঝোতা স্মারকটি কেবল পরিকাঠামো নির্মাণের বাইরে গিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার বিষয়টিকেই প্রতিফলিত করে ৷
সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা শিক্ষা, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ বিনিময়, যৌথ গবেষণা কার্যক্রম, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্য।
ভুটানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরের হওয়ায়, ভারতের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে এই সহযোগিতা তাদের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা সক্ষমতা জোরদার করতে এবং বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, নগর পরিকল্পনা, বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিধি সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরে।
এই বহুমুখীকরণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদী সম্পৃক্ততার জন্য আরও ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করে।
ভুটানের সাথে সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।
ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অবস্থানে ভুটান অবস্থিত। যদিও ভুটান ও চীনের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, তবুও ভারতই ভুটানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে।
উন্নয়নমূলক সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে একাধিক লক্ষ্য অর্জিত হয়—যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক আস্থা সুদৃঢ় করা, ভুটানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি, ভুটানের নিজস্ব উন্নয়ন-পছন্দকে সহায়তা করা এবং ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
উন্নয়ন সহায়তাকে কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে, নয়াদিল্লি ক্রমশ এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই ফলাফলগুলো ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা ‘প্রতিবেশী-প্রথম’ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অনুদান সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, কারিগরি দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য ভারত যে একটি নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী—তা প্রমাণ করার প্রচেষ্টা ভারত ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
এই পদ্ধতির অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে প্রায়শই ভুটানের কথা উল্লেখ করা হয়, কারণ দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পগুলো সাধারণত ভুটানের রাজকীয় সরকারের সাথে নিবিড় আলোচনার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।
বৃহস্পতিবারের চুক্তিগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত-ভুটান সম্পর্ক এখন আরও বহুমুখী ও জ্ঞান-ভিত্তিক এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। অবকাঠামো খাতে অর্থায়ন মূল বিষয় হিসেবে থাকলেও, এই অংশীদারিত্বের আওতায় এখন টেকসই নগর উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোও ক্রমশ যুক্ত হচ্ছে।
ভারতের জন্য, ভুটানের ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সহায়তা প্রদান ভুটানের প্রধান উন্নয়ন সহযোগী ও বিশ্বস্ত কৌশলগত প্রতিবেশী হিসেবে তাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে। অন্যদিকে ভুটানের ক্ষেত্রে, ভারতের অব্যাহত সহায়তা এমন সব আর্থিক সম্পদ, কারিগরি দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ জোগায়, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে, এই উদ্যোগগুলো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্থিতিশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলীয় হিমালয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও অবদান রাখে।
ইয়োহোম উল্লেখ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। “যেমন ধরুন, বৈশ্বিক সৌরশক্তি উদ্যোগের কথা—যেখানে পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন এনার্জি’র দিকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে খোদ প্রধানমন্ত্রীই নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছিলেন ৷ এরপর অবশ্যই বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারের ওপরও ব্যাপক জোর দেওয়া হচ্ছে। তাই দক্ষিণ এশিয়ায় এমন সব চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে এই দুটি দেশ যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই; কারণ এই চুক্তিগুলো তাদের পরিবেশ রক্ষার জাতীয় নীতি ও কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একই সঙ্গে তা নিশ্চিত করে যে, এর ফলে যেন তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনওভাবেই ব্যাহত না-হয়।”

