শান্তি চুক্তির আবহেও থামছে না ইরান সংঘাত, সঙ্কট বাড়াচ্ছে হাউথি-ইরাকের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি
পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কট দিনে দিনে ঘোরালো হচ্ছে ৷ ইরান-আমেরিকা সংঘাতের পাশাপাশি হাউথি ও ইরাকের ছোট ছোট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিও এই সংঘর্ষের অংশ হয়ে উঠেছে ৷

Published : August 2, 2026 at 8:34 PM IST
নয়াদিল্লি, 2 অগস্ট: মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ থামার লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না ৷ উল্টে এই সংঘর্ষের পরিধি ইরানের সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর পৌঁছে গিয়েছে ৷ আরও বেশ কয়েকটি দেশ এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ৷ ইয়েমেনের হাউথি গ্রুপ এবং ইরাকের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিও এখন এই আঞ্চলিক যুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়েছে ৷
হাউথিদের একটি দল লোহিত সাগর এবং বাব-আল-মানডেব প্রণালীতে জাহাজগুলিকে নিশানা করছে ৷ একই সময়ে ইরাকের জঙ্গি বাহিনীর উপর আমেরিকা ও সৌদি আরবের হামলা এই ইরান সংঘর্ষে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে ৷ হাউথি, ইরাকের কয়েকটি জঙ্গিগোষ্ঠী, হিজবুল্লা এবং হামাসরা আমেরিকা আর ইজরায়েলকে রুখতে জোটশক্তি গড়ে তুলেছে, যার নাম 'অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স' ৷
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তিচুক্তির ঘোষণা করেছেন ৷ চুক্তির শর্ত মেনে হামাসরা অস্ত্র সমর্পণের নীতিতে রাজি হয়েছে ৷ কিন্তু ইজরায়েলের ক্রমাগত আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়েছে হিজবুল্লা ৷ এই পরিস্থিতিতে হাউথি এবং ইরাকের জঙ্গি গোষ্ঠী আমেরিকা ও সৌদির বিরুদ্ধে আরও বড় হামলা করার হুমকি দিয়েছে ৷ এই সবমিলিয়ে ইরানকে ঘিরে সংঘর্ষ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে ৷
হাউথিদের জাহাজে হামলার হুমকি
লোহিত সাহর এবং বাব-আল-মানডেব প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির কাছে হাউথিরা একটা গুরুতর ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে ৷ এই দু'টি জলপথ ইউরোপ এবং এশিয়ার উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য়পথ ৷ সৌদি আরবের তেল রফতানিও এই পথ দিয়েই হয় ৷ সৌদি ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালানোয় এবং ইয়েমেনের বন্দর নিয়ন্ত্রণ করার পাল্টা হিসেবে 20 জুলাই হাউথিরা সমুদ্রপথ অবরোধ ঘোষণা করে ৷
গত কয়েক বছরে এই এলাকার বেশির ভাগ অংশে সংঘাতে অঘোষিত ইতি পড়েছিল ৷ কিন্তু এই অবরোধের জেরে সৌদি আরব এবং হাউথিদের মধ্যে সংঘাতে নাটকীয় মোড় নেয় ৷ তবে অতীতে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে হাউথিরা ৷ এখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে নিশানা করা হচ্ছে ৷ এই আবহে হাউথিরা ফের জাহাজগুলিকে টার্গেট করছে এবং তা আরও বেড়ে গিয়েছে ৷
এই হাউথি কারা ? বিংশ শতাব্দীর ন'য়ের দশকে হাউথি আন্দোলনের সূচনা ৷ উত্তর ইয়েমেনে বসবাসকারী শিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু জাইদিস গোষ্ঠীর প্রতিনিধি এই দল ৷
কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশনস-এর গ্লোবাল কনফ্লিক্ট ট্র্যাকার অনুযায়ী, ইয়েমেনের সরকার আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছে ৷ এই সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে হাউথিরা ৷ ইয়েমেনের সরকার আদতে সৌদি আরব এবং আরব আমীর শাহীর আঞ্চলিক সামরিক জোট ৷ আরেকটি সরকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লা সালে'র অনুগামী, যাঁরা এই সরকারের বিরোধী ৷ গত কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনের দু'টি সরকারকে সমর্থন জানিয়ে আসছে হাউথি ও সৌদি ৷ আবার তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ৷
এই মাসে ইয়েমেনের 33 শতাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে এমন একটা গোষ্ঠী সৌদি সরকারের নিজস্ব তেল কোম্পানি আরামকোতে হামলা চালায় ৷ সৌদির তেলের ট্যাঙ্কারগুলিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় ৷ এই পরিস্থিতিতে বিশ্বে শক্তিসম্পদের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে ৷
এর জবাবে বাব-আল-মানডেব প্রণালী, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগর দিয়ে নিরাপদে তেলের ট্যাঙ্কার পাঠাতে 14টি দেশকে এক ছাদের তলায় এনে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স এলায়েন্স-গঠন করেছে সৌদি আরব ৷ খবর পাওয়া গিয়েছে, সমুদ্রে এবং স্থলভাগে মধ্য ইয়েমেনে হাউথির বিরুদ্ধে বড়সড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব ৷
ইরাকের জঙ্গিগোষ্ঠী
ইরান কেন্দ্রিক সংঘাতকে আরও গোলমেলে করে তুলেছে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি দেশ ইরাকের জঙ্গিগোষ্ঠী ৷ পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (পিএমএফ)-এর ব্যানারে এক ছাতার তলায় একাধিক সংগঠন নিয়ে গঠিত এই জঙ্গিগোষ্ঠী ৷ ইরাকের অখণ্ড নিরাপত্তা এই গোষ্ঠীর হাতে ৷ আবার এই সংগঠনগুলির অনেকের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগও রয়েছে ৷
2020 সালে প্রকাশিত ব়্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী 67টি ছোট ছোট জঙ্গি গোষ্ঠী এই পিএমএফ-এর অন্তর্ভুক্ত ৷ এর মধ্যে 40টি সংগঠনের সঙ্গে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর-এর মাধ্যমে ইরানের ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে ৷
ইরাক ও সিরিয়ার ড্রোন হামলা চালানোর দায় যে দলটি স্বীকার করেছে, তা তৈরি করেছিলেন 2014 সালের তৎকালীন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী নৌরি আল-মালিকি ৷ তিনি আইএসআইএসের মোকাবিলা করতে এই দলটি গঠন করেছিলেন ৷ এখন তারা দেশে যথেষ্ট প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে ৷
ইরান সংঘাতের শুরুর সময় থেকে এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ৷ পিএমএফ-ও আমেরিকার সেনাবাহিনী এবং সৌদির শক্তিসম্পদের পরিকাঠামোগুলিকে টার্গেট করে আক্রমণ চালিয়েছে ৷ এরপর 29 জুলাই পরিস্থিতি আরও সঙ্কটজনক হয়ে ওঠে ৷ আমেরিকা ও সৌদি আরব পাল্টা জবাবে ইরাক জুড়ে পিএমএফ-এর একাধিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় ৷
ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এই হামলার নিন্দা করেছে ৷ 20 জন পিএমএফ সদস্যের মৃত্যু হয় এই হামলায় ৷ পরিষদ এই হামলাকে 'ইরাকের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন' বলে সমালোচনা করে ৷ এদিকে পিএমএফ-এর এই দলগুলি আমেরিকা-সৌদিতে হামলার দায় নেয়নি ৷ সর্বোপরি, এই হামলায় ইরাক, ইরান বনাম আমেরিকার সংঘাতের আরও গভীরে প্রবেশ করেছে ৷ সৌদি আরব ও কুয়েত এবার ইরাকের সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো বন্ধ করা হোক ৷
এরপর কী ?
হাউথিরা বারবার হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে ৷ এবার ইরাকের সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার ৷ একই সময় হাউথিরা এও স্পষ্ট করেছে যে তারা ইরানের প্রক্সি নয় ৷ তাদের নিজস্ব পৃথক উদ্দেশ্য আছে ৷ কিন্তু এই সবকিছু ইতিমধ্যে সঙ্কটজনক সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে ৷ এখন দেশগুলির কাছে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ জাহাজে হামলা ৷ ভারত এই সংঘাতে সরাসরি জড়ায়নি ৷ কি্তু কৃষ্ণসাগর থেকে লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলির উপর একের পর এক হামলায় ভারতের অন্তর্ভুক্ত ঝুঁকিও বেড়ে গিয়েছে ৷
ভারত তার অপরিশোধিত তেলের 88 শতাংশই ইরাক, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে আমদানি করে ৷ আন্তর্জাতিক শক্তিসম্পদের সরবরাহ শৃঙ্খলে কেনওরকম বিঘ্ন ঘটলে তাতে তেলের দাম, বিমা এবং পরবিহণের মূল্য বৃদ্ধি পাবে ৷
শক্তিক্ষেত্রে নিরাপত্তা ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হল, ভারতের বহু নাগরিক নাবিক হিসাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছেন ৷ এ ব্যাপারে বিশ্বে ভারতের স্থান দ্বিতীয় ৷ পশ্চিম এশিয়া এবং কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলির উপর হামলার ফলে অন্তত 17 জন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে ৷ হাউথি এবং ইরাকের জঙ্গি গোষ্ঠী, ইরানের সংঘাতে অংশ নেওয়ায় দিনে দিনে তা আরও বিস্তার লাভ করছে ৷ বিশ্বের জাহাজ চলাচলের উপর প্রভাব পড়ছে ৷ ভারত এই সংঘাত থেকে অনেক দূরে থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ৷

