খসড়া বীজ বিল: কেমন হবে কৃষকদের আগামী ?
খসড়া বিল আইনে পরিণত হলে 1966 সালের বীজ আইন এবং 1983 সালের বীজ নিয়ন্ত্রক আইন অবলুপ্ত হবে ৷ আর কী কী প্রভাব পড়বে ?

Published : December 15, 2025 at 7:55 PM IST
সংসদে খসড়া বীজ বিল পেশ করার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার ৷ শীতকালীন অধিবেশনের বাকি সময়ের মধ্যে এই বিল পেশ হবে কি না সেটাই এখন দেখার ৷ তবে এই নয়া বিল কৃষকদের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে ৷ এই খসড়া বিল আইনে পরিণত হলে 1966 সালের বীজ আইন এবং 1983 সালের বীজ নিয়ন্ত্রক আইন অবলুপ্ত হবে ৷
সরকারি তরফে বলা হচ্ছে এই নয়া বীজ বিলের মূল লক্ষ্য, উন্নতমানের বীজ বপণ করা ৷ বীজের উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করা ৷ এর পাশাপাশি বাজারে নকল বীজ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমিয়ে আনাও এই বিলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ৷
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন যে সমস্ত আইন কার্যকর আছে সেগুলি তৈরি ছয়ের দশক এবং সাতের দশকে ৷ আর তাই কৃষিকাজের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা ওই পুরনো আইনের মাধ্য়মে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব ৷ এ ব্যাপারে বাণিজ্য়িক বা প্রযুক্তি কোনও দিক থেকেই সন্তোষজনক ফলাফল প্রত্যাশা করা যায় না ৷ এখন বীজের ব্যবসায় বেসরকারি সংস্থার সংখ্যা অনেকটা বেড়েছে ৷ ব্যবহার বেড়েছে বায়োটেকনলজির ৷ এর পাশাপাশি আমাদানি এবং অনলাইনে বীজ বিক্রি সংক্রান্ত বিষয় পুরনো আইনের মাধ্যমে বর্ণিত হতে পারে না ৷ নয়া বিল বীজ-ব্যবস্থাকে আগের থেকে বেশি আধুনিক করে তুলবে ৷
নতুন বিলে বলা হয়েছে বীজের উৎপাদক সংস্থা থেকে শুরু করে বিক্রেতা এবং যারা এ সমস্ত নিয়ে পরীক্ষা করে সেই সমস্ত সংস্থার রেজিস্ট্রেশন থাকা বাধ্যতামূলক ৷ প্য়াকেটের মাধ্যমে বীজ বিক্রির ব্যাপারেও নিয়মে বদল পরিলক্ষিত হচ্ছে ৷ নতুন ব্যবস্থা প্যাকেটের গায়ে এখন থেকে ব্যাচ নম্বরের পাশাপাশি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নানা তথ্য স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে ৷ কিউআর কোডের সাহায্যে জানা যাবে প্যাকেটে থাকা বীজটি আসল না নকল ৷
কোনও বীজ বাজারে আনার আগে নানা পরীক্ষা করতে হয় ৷ সে ব্যাপারেও বেশকিছু নির্দেশিকা থাকছে নয়া আইনে ৷ কীভাবে পরীক্ষা করতে হবে তা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে ৷ বলা আছে কত পরিমাণ নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন ৷ কোনও সংস্থার কাছে কী কী ধরনের পরিকাঠামো এবং অন্য ব্যবস্থা থাকলে তারা বীজ পরীক্ষা করতে সক্ষম, উল্লেখ আছে সেটারও ৷ আমদানি-রফতানির নিয়মে সামান্য ছাড় থাকলেও সরকার বীজ থেকে রোগ ছড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে বিশেষ ভাবিত ৷ জীবজগৎ রক্ষা করা তাদের কাছে সবচেয় জরুরি বিষয় ৷

বীজের মান খারাপ হলে তার কু-প্রভাব পড়ে কৃষকের উপর ৷ নয়া বিলে সরকার এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট উৎপাদক সংস্থাকে অভিযুক্ত করতে চায় ৷ অভিযোগ জানানো থেকে শুরু করে সংস্থার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ যাতে কৃষক পান সেটা সুনিশ্চিত করা হয়েছে খসড়া বিলে ৷ কিন্তু কৃষকদের একাংশ থেকে শুরু করে বীজ বিক্রেতা এবং বেশকিছু বিশেষজ্ঞ বিলের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন ৷
ভারতের কৃষকরা যুগের পর যুগ ধরে নিজেদের তৈরি বীজ ব্যবহার করেছেন ৷ প্রতিবেশীকেও দিয়েছেন ৷ বীজের সংগঠিত বাজার নিয়ে তাদের কোনও ভাবনা ছিল না কখনও ৷ এখানেই তাঁদের আশঙ্কা বীজ উৎপদানের প্রতিটি ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু লাইসেন্সের ব্যবস্থা করলে চিরাচরিত ব্যবস্থাটি আগের মতো থাকবে না ৷
আরও একটি চিন্তার বিষয় হল- গ্রামের বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে স্থানীয় সমবায়ের পক্ষে এই নতুন আইন মেনে চলা সমস্য়ার কারণ হতে পারে ৷ প্রযুক্তির পাশাপাশি আর্থিক দিক থেকেও দেখা দিতে পারে সমস্যা ৷ কিন্তু নতুন আইনে বর্ণিত সমস্ত ব্যবস্থা করতে কোনও সমস্যা হবে না বড় সংস্থাগুলির ৷ ছোট ছোট সংস্থা পড়তে পারে অস্বিত্বের সঙ্কটে ৷ আর তাই কোথাও স্থানীয় বীজ বৈচিত্র্য আবার কোথাও কৃষকদের স্বাধীনতার প্রশ্নে খসড়া বিলের বিরোধিতা শোনা যাচ্ছে ৷
নকল বীজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি-এ কথা মনে করেন সকলেই ৷ তবে কৃষকদের একাংশ মনে করছেন, কেউ বীজ নকল করলে তাঁকে জেলে পাঠানো বা তার থেকে জরিমানা আদায় করা সুযোগ্য বিকল্প নয় ৷ তাঁদের যুক্তি, বীজের মান ভালো না হওয়ার নেপথ্যে অন্য কয়েকটি কারণের সঙ্গে আবহাওয়া, সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে সেগুলি বড় ভূমিকা পালন করে ৷ আর তাই বীজের মান খারাপ হলেই যদি কৃষক প্রতারণা করেছেন বলে ধরে নেওয়া হয় এবং শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তা সুবিচারেব নির্দশন হতে পারে না ৷
এই বিলের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে রাজ্য রাজ্যে আরও বেশি পরিমাণে গবেষণাগারের পাশাপাশি প্রশিক্ষক দরকার ৷ কৃষক থেকে শুরু করে অন্যরা যদি কোনও সমস্যার মুখোমুখি হন তাহলে তাঁকে দ্রুত সমাধানের পথ দেখানো দরকার ৷ কিন্তু দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে এ সংক্রান্ত পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই ৷ পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকলে এই বিল আইনে পরিণত হলেও কোনও কাজের কাজ হবে না ৷
তবে কৃষি কাজের জড়িত কেউ কেউ অবশ্য মনে করছেন, এই বিলে যা বলা আছে তা কার্যকর হলে কৃষকদের ভালো হবে ৷ তাঁদের মতে, লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা, নতুন কার্যনির্বাহী পদ্ধতি নিয়ে আসা এবং নকল বীজের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করলে কৃষকরা গুণমানে ভালো এমন বীজ পাবেন ৷ তবে এই অংশও মনে করে ছোট ছোট সংস্থার সমস্যা বাড়বে ৷ লাইসেন্স আছে এমন সংস্থার হাতেই বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক দখল চলে যেতে পারে ৷
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, কৃষকদের কথা শুনে এবং রাজ্যে রাজ্যে যে আলাদা আলাদা পরিস্থিতি আছে সেগুলিকে মাথায় রেখে বিলে দরকারি পরিবর্তন আনলে সেটি অনেক বেশি কার্যকর হবে ৷ বীজের প্রতি কৃষকের অধিকার সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি ছোট ছোট উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষা এবং কম সুদে ঋণ দেওয়া, গ্রামের বীজ ব্যাঙ্কগুলিকে আরও বেশি করে সক্রিয় করা দরকার ৷ এই ব্যবস্থা বিলে থাকা উচিত ৷

বিল সম্পর্কে এখন সংশ্লিষ্ট সকলকে মতামত জানাবার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার ৷ এটা একটা ভালো সুযোগ ৷ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কৃষক-বীজ বিক্রেতা-গবেষক-ব্যবসায়ী এবং সরকারি প্রতিনিধিদের নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা করা উচিত ৷ আর সেই সূত্র ধরেই বিলে যাবতীয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার ৷ ভ্রান্ত নীতি কৃষকদের স্বাধীনতা খর্ব করবে ৷ নষ্ট করবে বীজ বৈচিত্র্য ৷ স্থানীয় বাজারে যে বিভিন্ন ধরনের বীজ পাওয়া যায় সেটাও আর মিলবে না ৷ একইভাবে কার্যকরী নীতি বীজের বাজারকে করবে স্বচ্ছ ৷ গুণমানই যেখানে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে ৷ কিন্তু এই নীতি প্রয়োগ করতে হবে সাবধানে, বাস্তব পরিস্থিতি মাথায় রেখে এবং কৃষকদের স্বার্থ ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে ৷ আগামিদিনে বীজ-বৈচিত্র্য, বীজের গুণমান এবং কৃষকদের অধিকার রক্ষা সবচেয়ে বেশি জরুরি ৷
নয়া বিলে শুধু কড়া নিয়ম আরোপের কথা বললে হবে না ৷ এই নতুন বিলকে পারস্পরিক সহায়তার আবহ নির্মাণের মাধ্যমে কাজ করে দেখাতে হবে ৷ প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে এই নতুন বিল কৃষকদের সাহায্য করবে, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলবে না ৷ আমরা আশা করি এই সমস্ত দিক নিয়ে বিস্তারিত চর্চা করবে সংসদ ৷ দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর পাশ হবে বিলটি ৷ আর সেই সূত্র মানুষের মনে থাকা ভয় এবং অনিশ্চয়তা দূর হবে ৷ সকলে এই বিলটি খোলা মনে গ্রহণ করতে পারবেন ৷

