ETV Bharat / opinion

Explainer: ফেডারেশনে তালা, ইম্পা সভাপতির পদত্যাগের দাবি! কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলা বিনোদন দুনিয়া

বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে স্ক্রিনিং কমিটি । রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার আসার পর বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির হালহকিকতের খোঁজ নিলেন নবনীতা দত্তগুপ্ত ।

Bengali film industry
বাংলা বিনোদন দুনিয়ার অন্দরে ইটিভি ভারত (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Entertainment Team

Published : May 13, 2026 at 7:07 PM IST

9 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 13 মে: বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রের পট পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে । তৃণমূলকে হারিয়ে রাজ্যে এসে গিয়েছে বিজেপির 'ডাবল ইঞ্জিন সরকার' । আর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী বাংলার মসনদে বসার পর টালিগঞ্জের অন্দরেও শুরু হয়েছে জোর জল্পনা । এবার কার হাতে যাবে ফেডারেশন বা ইম্পার দায়িত্ব?

ইতিমধ্যেই ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তর পদত্যাগের দাবি করেছেন প্রযোজক-পরিবেশকদের একাংশ । পদত্যাগের দাবির কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নানা সময়ে পিয়ার বিরুদ্ধে টাকা তছরুপের অভিযোগ । একইসঙ্গে রয়েছে ইম্পাতে রাজনৈতিক দলের আধিপত্য, অবৈধ কমিটির অভিযোগ ।

Bengali film industry
ফাইট মাস্টার চিত্ত কবিরাজ (নিজস্ব ছবি)

ওদিকে ফেডারেশনের সভাপতিরও দায়িত্বের মেয়াদ শেষ বলে খবর । পরের নির্বাচন জুন-জুলাই মাস নাগাদ । ততদিন ফেডারেশন সভাপতির পদও খালি । ফলে সিনেপাড়া এখন একপ্রকার অভিভাবকহীন তা বলাই যেতে পারে । এর প্রভাব কি সিনেমা-সিরিয়ালে পড়ছে? ফেডারেশনের মাথা না থাকলে কি থমকে যেতে পারে প্রতিদিনের শুটিংয়ের কাজ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আগে বুঝতে হবে বাংলা বিনোদন শিল্পে 'ইম্পা' এবং 'ফেডারেশন'-এর ভূমিকা ঠিক কী ।

কী করে 'ইম্পা'?

ইম্পা (Eastern India Motion Pictures Association) দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন । প্রযোজক, পরিবেশক, এক্সিবিটর - অর্থাৎ ছবির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে ইম্পা । ছবির রিলিজ, পরিবেশনা, শিল্প সংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রযোজকদের স্বার্থরক্ষা - এসব ইম্পার আওতায় পড়ে । বাংলা ছবিমুক্তির বিষয়টি এই কমিটি দেখাশোনা করে । বিশেষ করে, উৎসবের সময়ে যাতে একসঙ্গে একমুঠো বাংলা ছবি মুক্তি না-পায়, এই বিষয়টিই দেখার জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমতিক্রমে অরূপ বিশ্বাসের উদ্যোগে জন্ম হয় স্ক্রিনিং কমিটির ।

Bengali film industry
ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত (নিজস্ব ছবি)

ফেডারেশনের কী কাজ?

অন্যদিকে 'ফেডারেশন' (Federation of Cine Technicians and Workers of Eastern India) হল টেকনিশিয়ান ও কর্মীদের সংগঠন । লাইটম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট, স্পটবয়, ক্যামেরা বিভাগ, আর্ট বিভাগ থেকে শুরু করে শুটিং ফ্লোরে কাজ করা অসংখ্য কর্মী এই ফেডারেশনের বিভিন্ন ইউনিয়নের সদস্য । ফেডারেশনের বর্তমান সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস (অরূপ বিশ্বাসের ভাই) ৷

Bengali film industry
ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস (নিজস্ব ছবি)

কার্যত টালিগঞ্জে শুটিংয়ের দৈনন্দিন পরিচালনায় ফেডারেশনের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ফলত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ফেডারেশনের নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে কি শুটিং বন্ধ হয়ে যেতে পারে? ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞদের মতে, সরাসরি তা হওয়ার সম্ভাবনা কম । কারণ কোনও একটি ব্যক্তির উপর পুরো ব্যবস্থাটি নির্ভর করে না । ফেডারেশনের অধীনে রয়েছে একাধিক ইউনিয়ন । প্রতিটি ইউনিয়নের নিজস্ব কমিটি ও পদাধিকারী আছেন । ফলে শীর্ষপদে পরিবর্তন বা ক্ষমতার টানাপোড়েন চললেও দৈনন্দিন কাজ সচল রাখা সম্ভব ৷

শুটিং বন্ধের প্রভাব

তবে বাস্তব সমস্যাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না । বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন ধরেই শুটিং পারমিশন, টেকনিশিয়ান বরাদ্দ, কাজের সময়সূচি, বকেয়া মেটানো কিংবা শ্রমিক সংক্রান্ত বিরোধে ফেডারেশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ফলে নেতৃত্বে বিভাজন তৈরি হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি হতে পারে । বিশেষ করে বড় বাজেটের সিনেমা বা একাধিক ইউনিটের সিরিয়ালের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়তে পারে ।

Bengali film industry
বাংলা বিনোদন দুনিয়া (নিজস্ব ছবি)

টেলিভিশন সিরিয়ালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল । কারণ প্রতিদিনের সম্প্রচার বজায় রাখতে নিয়মিত শুটিং দরকার । একদিন কাজ বন্ধ থাকলেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চ্যানেলের সম্প্রচারে । তাই প্রযোজনা সংস্থাগুলি সাধারণত রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও দ্রুত সমন্বয়ের পথ খোঁজে ।

টালিগঞ্জে পালাবদল

ইতিহাস বলছে, টালিগঞ্জে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সংগঠনের ক্ষমতার রদবদল নতুন কিছু নয় । অতীতেও সরকার বদলের পরে ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন সংগঠনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে । কিন্তু কাজ পুরোপুরি থেমে যায়নি কখনও । কারণ বাংলা বিনোদন শিল্পের অর্থনীতি প্রতিদিনের শুটিংয়ের উপর নির্ভরশীল । স্টুডিয়ো, চ্যানেল, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ডিস্ট্রিবিউশন-সবকিছুই একটি চলমান চক্রের অংশ ।

Bengali film industry
টালিগঞ্জ (নিজস্ব ছবি)

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরূপ বিশ্বাসের পরাজয়ে অস্তিত্ব নেই তাঁদের তৈরি স্ক্রিনিং কমিটির । এমনই আভাস দিয়েছেন ইম্পা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত । তিনি ইটিভি ভারতকে বলেন, "আগের সরকার এখন নেই । সেই সময়ের মন্ত্রীর উদ্যোগেই গঠিত হয় স্ক্রিনিং কমিটি । ফলে, এই স্ক্রিনিং কমিটির আর কোনও অস্তিত্ব আছে কি না আমি জানি না । তাই কোন ছবি কবে মুক্তি পাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তি পাবে কি না আমার জানা নেই ।"

স্ক্রিনিং কমিটিতে আপত্তি

এদিকে 29 মে মুক্তির পথে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের পরিচালনায় 'ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড', পৃথা চক্রবর্তীর 'ফেরা' । এর আগে 15 মে মুক্তির পথে 'সপ্তডিঙার গুপ্তধন' । কিছুদিন আগে স্ক্রিনিং কমিটির সঙ্গে জোর বিতর্ক তৈরি হয় দেবের । এর আগে দেব সাফ জানিয়েছেন, স্ক্রিনিং কমিটির কোনও প্রয়োজন নেই এই ইন্ডাস্ট্রিতে । স্ক্রিনিং কমিটি গঠন প্রসঙ্গে তিনি জোরালো প্রতিবাদ করে বলেন, "কমিটি কখনও ঠিক করে দিতে পারে না, কোন প্রযোজক কখন তাঁর ছবিটি নিয়ে আসবেন । শীতকালের ফ্লেভার আছে যে ছবিতে, সেই ছবি গ্রীষ্মকালে এলে মানুষ মজা পাবে?" ক্যালেন্ডার নিয়েও ঘোর আপত্তি দেবের ।

এই নিয়ে বাংলা বিনোদন দুনিয়ার অন্দরে কম চর্চা হয়নি । আগে প্রযোজক-পরিচালকরা স্বাধীনভাবে, নিজেদের পছন্দমতো সময়ে ছবিমুক্তি ঘটাতেন । এতে হয়তো সাময়িক মতবিরোধ তৈরি হলেও পরে তা মিটে যেত বলে দাবি দেবের । তাঁর মতে, "কমিটি তৈরি হওয়ার পরে দেখছি, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে সারাক্ষণই ঝগড়া চলছে । তা হলে এই কমিটি থাকার মানে কী?" আর এখন সত্যিই ইন্ডাস্ট্রি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যে আগামিদিনে স্ক্রিনিং কমিটি থাকবে কি থাকবে না এই নিয়েও উঠছে প্রশ্ন । কেন না বাংলা বিনোদনের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশেরই বক্তব্য, "সিনেমা সিনেমার সময়ে আসবে । কেন তার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হবে?"

শিল্পীরা কী বলছেন ?

অন্যদিকে ফেডারেশনের সভাপতির অনুপস্থিতিতে শুটিং-এর দিকগুলি তা হলে দেখবেন কে? কার অনুমতিতে চলবে শুটিং? এই নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন । এই মুহূর্তে রোজকার শুটিংয়ে কীরকম অবস্থা? জানতে চাইলে প্রযোজক স্নিগ্ধা বসু ইটিভি ভারতকে বলেন, "আমার এই মুহূর্তে তিনটি ধারাবাহিক চলছে । 'কুসুম', 'সাত পাকে বাঁধা', 'মিলন হবে কত দিনে' । কাজে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না । নিয়ম মেনেই কাজ হচ্ছে । যেরকম চলছিল সেরকমই চলছে । তবে, মাঝখানে কয়েকবছর খুব অভিভাবকত্ব চলত । প্রয়োজনের বেশি লোক নিয়ে কাজ করতে হবে, কখনও কখনও কাজ না জানা লোকও ফ্লোরে পাঠিয়ে দেওয়া হত । তাদেরকে আবার শিখিয়ে, বুঝিয়ে কাজ করাতে হত । পছন্দের লোক নিয়ে আমরা কাজ করাতে পারতাম না । এই সমস্যাগুলো যেন আর না থাকে ।"

Bengali film industry
প্রযোজক স্নিগ্ধা বসু (নিজস্ব ছবি)

তাঁর কথায়, "চাই যোগ্য ব্যক্তি কাজ পাক । যোগ্য মানুষ দায়িত্ব পান । ইন্ডাস্ট্রির নানাবিধ কাজের মধ্যে যে কোনওদিন কোনওটাই করেনি, আমাদের ইন্ডাস্ট্রির কাজ সম্বন্ধে যার এতটুকু জ্ঞান নেই, এমন ব্যক্তিকে দায়িত্বে দেখতে চাই না । এমন কেউ দায়িত্ব নিলে ভালো, যিনি কাজটা জানেন এবং মাঠে নেমে কাজটা করেছেন কখনও ।"

স্নিগ্ধা বসু আরও বলেন, "অনেক কাজ কমে গিয়েছে । অনেক চ্যানেল উঠে গিয়েছে । প্রযোজকরা সিনেমা-সিরিয়াল বানাতে ভয় পাচ্ছেন বাজেটের কারণে । সবার কাছে তো আর সমান বাজেট থাকে না । ফলে, সিনেমার সংখ্যা কমছে, সিরিয়ালেরও কমছে । তিনটে চ্যানেলে এখন সিরিয়াল চলে । সংখ্যা দেখা হোক । ফেডারেশনের 26টা গিল্ড মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার সদস্য । কাজ জেনে কাজ পায় আড়াই হাজার । বাকিদেরও কাজ দিতে হবে । কেন না টাকা দিয়ে কার্ড পেয়েছে তারা । এবার তাদেরও ফ্লোরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে । তারা কাজই জানে না । শেখাতে পড়াতে হচ্ছে । এভাবে চলে না । যোগ্যরা কাজ পাক । এটাই চাই ।"

তাঁর সংযোজন, "আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিতে যেন কোনও রাজনৈতিক রং না থাকে । সবাই নিয়ম জানে । সেটা জেনে যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সেটাই চাই ।"

ফেডারেশনের ভাবী সভাপতি নিয়ে জোর চর্চা

জানা গিয়েছে, ফেডারেশন সভাপতি কে হবেন তা নিয়ে জোর চর্চা টলিপাড়ায় । নতুন সরকার আসার পর থেকে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে ফেডারেশনের ঘরে ঝুলছে তালা । ওদিকে স্টুডিয়ো পাড়ার অন্দরের খবর, একাধিক গিল্ডের সম্পাদকেরও বদল চান সদস্যরা । ফাইট মাস্টার চিত্ত কবিরাজ বলেন, "শুটিং শুটিংয়ের মতোই চলছে । যেগুলো চলছিল সেগুলোই চলছে । নতুন কিছু আসেনি । কাজ বন্ধ করলে তো চলবে না । তাই যা চলছিল তা আগের মতোই নিয়ম মেনে চলছে ।"

তিনি আরও বলেন, "সব গিল্ডের মাথার উপরে একজন অভিভাবকের খুব প্রয়োজন । তিনি ফেডারেশন সভাপতি । এই পদে যিনিই থাকুন না কেন যেন সকলের ভালো করেন তিনি ।"

সিরিয়াল-সিনেমার ভবিষ্যত

চিত্ত কবিরাজের কথায়, "সিরিয়ালের সংখ্যা দিনদিন কমছে । 42টার জায়গায় এখন 28টা মাত্র সিরিয়াল চলে । সিনেমা কোথায়? সিনেমা না-বানালে সিনেমা হল চলবে কীভাবে? সব গিল্ড মিলিয়ে প্রায় আট সাড়ে আট হাজার টেকনিশিয়ান থাকলেও এর পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন আরও অনেক মানুষ । সকলের সংসার আছে । সবার ব্যাংক ব্যালেন্স নেই । তাই চাই নিয়মিত কাজ । চাই যাতে সুষ্ঠুভাবে সবাই কাজ করতে পারে । সরকারে যারাই আসুক না কেন সবসময় এটাই চেয়েছি তারা যেন এই ইন্ডাস্ট্রির ভালো করে ।"

সুতরাং এই মুহূর্তে সিনে পাড়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল 'স্থিতিশীলতা' । নতুন নেতৃত্ব যিনিই আসুন না কেন, প্রযোজক থেকে টেকনিশিয়ান-সকলেরই একটাই লক্ষ্য - কাজ সচল রাখা । কারণ টালিগঞ্জ জানে, ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতি সবার । কিছুদিন কোভিড সেই অভিজ্ঞতা দিয়ে গিয়েছে তাঁদের । আর সেই সময় ঘরে থেকেও মোবাইলে শুট করে টেলিকাস্ট চালানোর পথে হেঁটেছিল ইন্ডাস্ট্রি, বলছিলেন স্নিগ্ধা বসু ।