ETV Bharat / opinion

মিছিল-স্লোগান নয়, প্রথম দফায় বাংলার ভোটের ধারাপাত নীরব বিপ্লব

বাংলার 16টি জেলার 152টি আসনে ভোট বৃহস্পতিবার ৷ কোথায় কী পরিস্থিতি ? বিস্তারিত বিশ্লেষণে ইটিভি ভারত ৷

Bengal First Phase Polls
বাংলার 16টি জেলার 152টি আসনে ভোট বৃহস্পতিবার (ছবি: পিটিআই)
author img

By Dipankar Bose

Published : April 22, 2026 at 6:44 PM IST

13 Min Read
Choose ETV Bharat

ভোট মরশুম মানে উৎসাহ-তাড়াহুড়ো ৷ মিছিলে মিছিল স্লোগানে স্লোগান ৷ কিন্তু এবার মালদা-মুর্শিদাবাদের মতো জেলা যেখানে 23 এপ্রিল ভোট হওয়ার সেখানে এক অচেনা পরিবেশ, অদেখা নীররতা ৷ সকাল হতে না হতেই বুথমুখী হওয়ার জন্য জেলাগুলি তৈরি এমন অনুমান করে নেওয়াও বেশ কঠিন ৷ বরং দেখে মনে হতে পারে মানুষের মনের গভীর নানা প্রশ্নের সমাহার ৷ কখনও নেতৃত্বকে নিয়ে প্রশ্ন, কখনও এতদিন ধরে পূরণ না হওয়া প্রতিশ্রুতি ঘিরে প্রশ্ন, কখনও আবার প্রশ্নের মূলে আছে আনুগত্য ৷ প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে মানুষের মনে ৷ ভোটাররা শুধুই ভোট ঘিরে প্রস্তুত তা নয়, তাঁদের ভোটের পরিণাম কী সেটা নিয়েও ভাবিত ৷

এবার বাংলার ভোটের লড়াই শুধু মিছিল আর রোড-শোয়ে হচ্ছে সেটা ভাবা ঠিক নয় ৷ এবার লড়াইয়ের একটি বড় জায়গা হল মানুষের অভিজ্ঞতা ৷ বিশেষ করে বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঘিরে থাকা তাদের স্মৃতি ৷ যা সাধারণ মানুষের ইচ্ছা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করে অনেকেই ৷ গত কয়েক বছরের মধ্যে হওয়া নিয়োগ দুর্নীতির পরিধি আদালত কক্ষ থেকে এসে সাধারণের আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে ৷ প্রাথমিকভাবে নিয়োগ দুর্নীতি আবর্তীত হত তালিকা ঘিরে, চাকরি পাওয়ার পদ্ধতিকে ঘিরে ৷ কিন্তু এখন বিষয়টি অনেক বেশি রাজনৈতিক ৷ নিয়ম ভেঙে চাকরি দেওয়া হয়েছে বলেও চর্চা হয়েছে ৷ উঠেছে স্বজনপোষণের অভিযোগ ৷

Bengal First Phase Polls
ভোট করাতে বুথের পথে ভোটকর্মীরা (ছবি: পিটিআই)

রাজ্যের যে 16টি জেলায় ভোট হচ্ছে যেখানকার পরিস্থিতি কমবেশি এক ৷ বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনের জন্য নিজেকে তৈরি করা প্রার্থীরা এখন যেন আলোর দিশা পাচ্ছেন না ৷ অতীতে সাফল্য পাওয়া প্রার্থীদের পরিস্থিতিও খুব একটা আলাদা কিছু নয় ৷ এর ফলে এক যৌথ উদ্বেগের জন্ম হয়েছে যেখানে একই গোষ্ঠীর মধ্যে দলছুট হওয়ার ভয় এবং নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে সমন্তরালভাবে ৷ এসবের সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ৷ বিশেষ করে আরজি করের ঘটনার পর থেকে ৷ ভোটের অঙ্কে এই গোষ্ঠীর বিশেষ গুরুত্ব আছে ৷ এমনই আবহে 23 এপ্রিল রাজ্যের 152টি আসনে হবে ভোটগ্রহণ ৷

অধীর চৌধুরী বহরমপুরে এতকাল ধরে যে কাজটা করে এসেছেন এবারও সেটাই করেছেন- মানুষের কাছে যাওয়া, তাঁদের প্রশ্ন শোনা এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ৷ কে না জানে রাজনীতির মর্মার্থ- নেতাকে হাতের কাছে পাওয়া ৷ এবার অবশ্য ভোটারদের অন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন অধীর ৷ এখন নেতার কাছাকাছি যাওয়া সমাধান নয় বরং সমস্যার অংশ ৷ অধীরের হাতিয়ার তাঁর ফেলে আসা অতীত ৷ কিন্ত অতীত পুরনো টাকার মতো ৷ একটু বেশি করে আতস কাচের নীচে আসতে হয় তাকে ৷ বহরমপুরে অধীরের পরীক্ষাটাও তেমনই ৷ ভোটারদের কাছে আন্তরিকভাবে ভোট দেওয়ার আবেদন করছেন অধীর ৷ একটু বেশি বয়সি ভোটারদের কাছে অধীর সেই নায়ক যিনি যখন দরকার ছিল তখন রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন ৷ কিন্তু এবারের লড়াই যে কঠিন তা মেনে নিয়েছেন নেতা নিজেই ৷ তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, "এবারের ভোটের লড়াই কঠিন ৷ পুরনো অনেকে আর নেই তবে আমি লড়াইয়ের ময়দানেই আছি ৷ " বহরমপুরের চিরাচরিত কংগ্রেস গড়ে ধস যে নেমেছে তার এর থেকে বড় প্রমাণ আর হয় না ৷ তা বলে কংগ্রেসের পায়ের তলার জমি সরে গিয়েছে সেটা ভাবার কোনও কারণ নেই ৷ কংগ্রেসের ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করেছিল তৃণমূলের হাত ধরে, বিজেপি সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে ৷

ক্ষোভ আর তার বহিঃপ্রকাশের মধ্যে থাকা ফাঁককে কাজ লাগাতে চাইছেন দিলীপ ঘোষের মতো নেতা ৷ তিনি লড়ছেন খড়গপুর সদর কেন্দ্র থেকে ৷ রেল শহর খড়গপুরে দিলীপের লড়াই শুধু জয়ী হওয়ার নয়, নিজের অতীতে ফিরে যাওয়ারও বটে ৷ দিলীপ সবসময় অকপট, দ্বিধাহীন এবং সূক্ষ্মতায় তাঁর আস্থা নেই ৷ তিনি যা বলেন তা সহজ ও স্পষ্ট ৷ অন্য শব্দ ও আলোচনা স্তব্ধ করে দেওয়া তাঁর স্বভাব, কখনও অবশ্য় তাঁর মন্তব্যই আলোচনার থুড়ি সমালোচনার মূল কারণ ৷ 2019 সালে তাঁর এই চাঁচাছোলা ভূমিকা কার্যত পরিবর্তনের বাতাসের রূপ নিয়েছিল ৷ বিজেপির বৃদ্ধি হল ৷ দিলীপ হয়ে উঠলেন বাংলার ভরসাযোগ্য কণ্ঠ ৷ 2021 সালে পরিবর্তনের হাওয়া প্রতিরোধের মুখোমুখি হল ৷ 2024 সালে সেই ধাক্কা আরও বড় হয় ৷ 2026 সালে তাহলে কী তাঁর রণকৌশল ? বেশিটাই স্মৃতি-নির্ভর ৷ বিশেষ করে সেই সময়ের স্মৃতি যখন হাওয়া ছিল তাঁর পক্ষে ৷ আর আছে যুক্তি- সেই হাওয়া আবারও তাঁর পক্ষে বইতে পারে ৷ মানুষের ক্ষোভ দিশা চাইলে দিলীপের নেতৃত্বের ধার বাড়ে ৷ নতুন করে ভোটারদের মনে জায়গা করা নেওয়ার চেয়ে এতদিন যে জায়গা তিনি দখল করেছিলেন সেটা ধরে রাখা তার কাছে সবচেয়ে জরুরি বিষয় ৷

Bengal First Phase Polls
প্রথম দফায় ভোট ঘিরে ধারাপাত নীরব বিপ্লব (ছবি: পিটিআই)

দিলীপের জন্য় চ্যালেঞ্জের ধরন আলাদা ৷ রাজনীতিতে দ্রুত উপরের দিকে উঠে আসা, বিধানসভা কেন্দ্রের বাইরে গিয়ে ভাবা এবং জাতীয় রাজনীতির মানচিত্রে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করা- কোনও একটি প্রার্থীকে প্রতিষ্ঠা দেয় ৷ কিন্তু এভাবে প্রত্যাশাও বেড়ে যায় ৷ ভোটাররা জানতে চান না, কোনও মহলের সঙ্গে দিলীপের ওঠাবসা ৷ জানতে চান, স্থানীয় এলাকায় চোখে পড়ার মতো কাজটা হবে কি না ৷

খড়গপুরে যখন নিজের দিলীপের চেনা মাঠ ফিরে পাওয়া লড়াই হচ্ছে তখন মাথাভাঙার লড়াই জমি ধরে রাখার ৷ এলাকার নেতা থেকে জাতীয় রাজনীতির চরিত্র হয়ে ওঠা নিশীথ প্রামাণিকের উত্থান আর বিজেপির বাংলা দখলের ছক একে অপরের পরিপূরক ৷ 2019 সালে বিজেপির ভালো ফলের অংশ ছিলেন ৷ সেই সূত্র ধরে 2021 সালের ভোটের ফলও বলে দিয়েছিল উত্তরবঙ্গ বিজেপির শক্তঘাঁটি ৷ 2024 সালে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন আসে খানিক ৷ ব্যবধান কমে যায় ৷ সেখানেও সম্প্রসারণ নয়, জমি আঁকড়ে থাকাই বড় হয়ে দাঁড়ায় ৷ নিশীথের লড়াই খুব একটা প্রতিস্পর্ধী নয় তবে ক্ষমতার আশপাশে থাকার গুণ তিনি জানেন ভালোই ৷ তাঁর কাছে যাওয়া যায় ৷ তাঁর দূরদৃষ্টিও আছে ৷ তাঁর শপথ বহমানতায় ৷

তাঁর আসনে কৃষিক্ষেত্রের পরিস্থিতি থেকে শুরু করে স্থানীয় সমীকরণের সম্পর্ক সুগভীর ৷ এবারের ভোটে নিশীথের পুঁজি শুধু সংগঠন নয় ৷ এক বিশেষ রাজনৈতিক বার্তার মুখও হয়ে উঠেছেন তিনি ৷ সেই বার্তা রাজনীতিতে প্রগতির বার্তা দেয় ৷ দেয় কেন্দ্রীয় স্তরে থাকা ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ৷ মানে নিশীথ হয়ে উঠেছেন এমন এক সেতু যার একদিকে আছে ভোটারদের প্রতিদিনের আশা-আকাঙ্খা ৷ অন্যদিকে আছে জাতীয় রাজনীতি বিশেষ করে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ৷

এই বিশেষ অবস্থানই নিশীথের চিন্তার কারণ ৷ এই নির্বাচনের রূপরেখা নির্ধারিত হয়েছে প্রশ্ন ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার উপর বাজি ধরে ৷ আর তাই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা শাখের করাত ৷ প্রার্থী ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারছেন ঠিকই, একইসঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছেন প্রত্যাশাও ৷ তাঁকে ঘিরে আছে দুটি প্রশ্ন ৷ প্রথমত, তিনি কি এমন কেউ যিনি ব্যবস্থার মধ্যে থেকে মানুষের কাজ করতে পারেন নাকি তিনি এমন কেউ যিনি শুধুই ব্যবস্থার সফল পরিচালক ?

অধীরের বহরমপুরে ঐতিহ্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে ৷ তা নিয়ে চর্চাও চলছে ৷ আবার মালদায় মৌসম বেনজির নূর ইচ্ছা করেই যেন খানিকটা হলেও ঐতিহ্য-চ্যুত হয়েছেন ৷ তবে সেখানেও অঙ্ক আছে ৷ মালতিপুর থেকে তাঁর প্রার্থী হওয়া শুধুই কংগ্রেসে ফিরে আসা নয় ৷ এটা আদতে এক কৌশলী প্রত্যাবর্তন ৷ তাঁর পদবি-রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং রাজনীতির পূর্বাশ্রমে ফিরে আসা ৷ বহরমপুরে নিজেদের ফেলে আসা সাংগঠনিক শক্তির ছায়াই ভরসা কংগ্রেসের ৷ মালতিপুরে আবার হাত শিবিরের কাছে সুযোগ সংগঠনকে আরও একবার শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর ৷ এই চেষ্টার মুখ মৌসম নূর ৷ তিনি শুধু ভোটে লড়ছেন না ৷ এককালে থাকা কিন্তু বর্তমানে হারানো পারিবারিক আনুগত্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন ৷ 2029 সালের লোকসভা নির্বাচনও আছে তাঁর নজরে ৷ মৌসমের জন্য এ এক দীর্ঘমেয়াদি লড়াই ৷ সেই বিচারে বিধানসভা নির্বাচন তাঁর কাছে নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার পরীক্ষাও বটে ৷ তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে থাকা মেরুকরণকে ভেঙে নিজের জন্য জায়গা বের করা মৌসমের শক্তি ৷ পরিবর্তন বলতে কী বোঝায়- অনেকে এ নির্বাচনে এই শব্দের প্রকৃত অর্থ খুঁজছেন ৷ এরইমধ্যে মৌসম যে অবস্থান নেওয়ার কথা বলছেন তার অভিঘাত বেশি হতে পারে অনেকটা ৷ মৌসমের উপস্থিতি বলে দিচ্ছে অনেক কিছু ৷

Bengal First Phase Polls
এবার ভোট ঘিরে বেনজির পরিস্থিতি বাংলায় (ছবি: পিটিআই)

এরপর আছেন হুমায়ুন কবীর ৷ যাঁকে ব্যাখ্যা করতে চাই 'অনিশ্চয়তা' শব্দটি ৷ তবে এখন তিনি সেই অনিশ্চয়তার হাতেই বন্দি ৷ একাধিক দল ঘুরে আসা রাজনৈতিক জীবনে এখন তিনি তৈরি করেছেন নিজের রাজনৈতিক দল ৷ আম জনতা উন্নয়ন পার্টি তৈরি করা নিশ্চয় বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতির থেকে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ৷ তবে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিয়ো তাঁর রাজনৈতিক পরিসরে এক সুদীর্ঘ ছায়া হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে ৷ ওই ভিডিয়োয় তাঁর মুখ থেকে শোন গিয়েছে, তিনি যদি মুসলমানদের ভোট ভাগ করতে পারেন তাহলে হিন্দু ভোট সহজেই চলে যাবে বিজেপির দিকে ৷ এই ভিডিয়ো ঘিরে ক্ষোভের পরিধি যতটা বড় হয়েছে, জল্পনাও ততটাই ব্যাপক ৷ ভিডিয়োটি সত্য না মিথ্যা সেটা বিচারের বিষয় ৷ তবে হুমায়ুনের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে তাতে কোনও সংশয় নেই ৷ আগে তিনি বলতেন, গোটা রাজ্যের মুসলমানরা তাঁর সঙ্গে আছেন ৷ এখন আর সেই জোর নেই ৷ বিশেষ করে সঙ্গীরা যেভাবে জোট ছাড়ছেন তা থেকে এই বক্তব্যই প্রতিষ্ঠা পায় ৷ তিনি নিজে রানিনগরের পাশাপাশি নওদা থেকে ভোটে লড়ছেন ৷ এই দুটি আসনই সম্প্রদায়-সমীকরণের দিক থেকে সংবেদনশীল ৷ আর হুমায়ুন সেখানে একজন প্রার্থীর চেয়ে বেশি অন্যদের ক্ষতির কারণ ৷

মালদা-মুর্শিদাবাদের বাইরে পশ্চিম মেদিনীপুরে সবং বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী মানস ভুঁইয়া রাজনৈতিক বহমানতার আরও এক উদাহরণ ৷ প্রবীণ মানসের তৃণমূলের প্রার্থী হওয়া চলমান ব্যবস্থায় বাধা তৈরি করা নয় বরং একীকরণ ৷ সবং তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মশালা, ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরির পটভূমি ৷ যা তিনি তৈরি করেছেন দশকের পর দশক ধরে ৷ সেই গ্রহণযোগ্যতা রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে এখনও অটুট ৷ তবে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা নেই তা নয় ৷ আছে নীরবে ৷ নির্বাচনকে স্থানীয় চেহারা দেওয়া মানসের মুন্সিয়ানা ৷ সেখানে সীমান্তবর্তী এলাকার সমস্য়া, পাওয়া- না-পাওয়ার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় বিধানসভা ভিত্তিক চাওয়া-পাওয়ার হিসেব ৷ তাঁর নজর বন্যা নিয়ন্ত্রণে ৷ স্থানীয় এলাকার পরিকাঠামো নির্মাণে ৷ প্রশাসনিক কাজে তাঁর উজ্জ্বল অবস্থান বিধানসভার বাসিন্দাদের এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে দেয় যেখানে তাঁরা অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে ভোটের লাইনে দাঁড়ান ৷ শুধু ফাঁকা প্রতিশ্রুতির বলে বলিয়ান হতে হয় না ৷ তবে সবংয়ের মাটিতে সীমান্ত-সমীকরণ যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত তেমন ভাবার কোনও কারণ নেই ৷ নিয়োগ-দুর্নীতি এখানে প্রভাব ফেলতে না পারলেও প্রশাসন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ধারনা দিচ্ছে অবশ্যই ৷

অবশেষে হলদি নদীর ধারে এসে পৌঁছনো নির্বাচনের বেশিটাই প্রতীকী ৷ শুভেন্দু অধিকারীর লড়াই সেই নন্দীগ্রামে যা 2011 সালে বাংলায় রাজনৈতিক মানচিত্রে বদল আনতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল ৷ 2021 সালে মমতাকে পরাজিত করা তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে ৷ সেটা একটা নির্বাচনে জয় পাওয়ার থেকে অনেক বেশিকিছু ৷ সেই জয় ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল ৷ বুঝিয়েছিল শুভেন্দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী মুখ ৷ পাঁচ বছর বাদে এই প্রেক্ষাপট বদলে গিয়েছে সম্পূর্ণ ৷ এখন আর তিনি তৃণমূল থেকে বিদ্রোহ করে আসা কোনও নেতা নন, এখন তিনি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ৷ এখানে তাঁর লড়াই একসময়ের ঘনিষ্ঠ তৃণমূলের পবিত্র করের বিরুদ্ধে ৷ আর এই কারণেই এবারের লড়াই গতবার মানে 2021 সালের মমতা-শুভেন্দুর হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের থেকে আলাদা ৷

এবার ঝাড়াই-বাছাই অনেক বেশি ৷ এখানে লড়াইটা স্থায়ীত্বের ৷ আবার মমতার মুখোমুখি হতে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর থেকে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুভেন্দু ৷ আর তাই স্থায়ীত্বের প্রশ্ন এখানে আরও বড়, একটি কেন্দ্রের পরিধি পেরিয়ে সুদূরপ্রসারী ৷ শুভেন্দুর কাছে লড়াইটা ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ৷ তবে অন্য কেন্দ্রের মতো এখানকার ভোটাররাও রাজনৈতিক চমক নিয়ে ভাবিত নন ৷ তাঁরাও কাজ চান ৷ নন্দীগ্রামের লড়াই আর পাঁচটা হাইপ্রোফাইল কেন্দ্রের মতো নয় ৷ এটা অভিজ্ঞতা এবং জনাদেশের মিশেল ৷

Bengal First Phase Polls
এবারও থাকছে মহিলা পরিচালিত বুথ (ছবি: পিটিআই)

কোনও একটি অভিমুখকে সামনে রেখে বাংলার প্রথম দফার ভোটকে ব্যাখ্যা করা যায় না, অনেক ঘটনার সমাহার হিসেবে দেখতে হবে ৷ সুশাসনকে অনিবার্যতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় তৃণমূল ৷ আবার শাসকের বিরুদ্ধে থাকা অসন্তোষকেই কাজে লাগাতে মরিয়া বিজেপি ৷ বহরমপুর এবং মালতিপুরের মতো জায়গায় ব্যক্তি ক্যারিশমা মূলধন বিজেপির ৷ তাঁদের বাজি এমন কুশিলবরা যাঁরা স্থানীয় এলাকায় ভোটের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে ৷

মনের অনিশ্চয়তা ভাষায় প্রকাশ করছেন ভোটারারও ৷ তাঁদের বলতে শোনা যাচ্ছে, আমরা এবার সম্পূর্ণ পরিবর্তন চাই ৷ তবে মুখে থাকা তিক্ত হাসি হয়তো শব্দের থেকেও বেশি জোরালো ৷ আর তাঁদের বলা পরিবর্তনও একমুখী নয় ৷ কেউ কেউ পরিবর্তন বলতে ক্ষমতার বদল বোঝালেও বাকিদের কাছে বিষয়টি স্বচ্ছতার ফিরে আসা ৷ কারও কাছে আবার পরিবর্তন মানে সেই শক্তি যা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে মানুষের প্রতিদিনের জীবনে চোখে পড়ার বদল আনতে সক্ষম ৷ সবমিলিয়ে প্রচার শেষের পর থেকে যা হাতে আছে তা নিশ্চয়তা নয় অনুমান ৷

একটি প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থা এবং কীভাবে কাজ হওয়া উচিত তার প্রাত্যহিক স্মৃতি ঠিক করে দেবে প্রথম দফার ভোটে কী করবে বাংলা ৷ জোরালো স্লোগান নয়, নীরব হিসেব বলে দেবে কার উপর ভরসা করা যায় ! এখানেই দেখা মেলে দৃঢ়চেতা দিলীপ ঘোষের, উচ্চাকাঙ্খি নিশীথ প্রামাণিকের, অধীর চৌধুরীর মতো পোড়খাওয়া নেতার ৷ আছেন কৌশলী মৌসম নূর থেকে শুরু করে অস্থির হুমায়ুন কবীর, সুস্থির মানস ভুঁইয়া এবং মমতাকে হারিয়ে চমক দেওয়া শুভেন্দু অধিকারীও ৷ প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি এঁরা কে কী করেছেন সেটা ভোটারদের কাছে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ ৷