ETV Bharat / opinion

বীরগাথা থেকে মিম, যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বদলে যাওয়া বিশ্ব

মত প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে মিম আর মোশন গ্রাফিক্স ৷ আগের পৃথিবী ছিল অন্যরকম, তুলনায় অনেক কঠিন ৷ বিশ্লেষণে ইটিভি ভারত ৷

IRAN WAR
মত প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে মিম আর মোশন গ্রাফিক্স (ইটিভি ভারত)
author img

By Bilal Bhat

Published : March 6, 2026 at 5:52 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

যুদ্ধের সঙ্গে বীরগাথার সম্পর্ক বহুকালের ৷ দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নিয়ে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের বীরত্বের কাহিনি বাকিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল হাতিয়ার ছিল গান ও কবিতা ৷ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার অস্ত্র ছিল ব্যঙ্গাত্মক রচনা ৷

প্রযুক্তিগত বদলের হাত ধরে পাল্টেছে বীরগাথার প্রকাশ-রীতি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের উপায় ৷ এখন সামরিক বাহিনীর বীরত্বকে প্রচার করতে এআই থেকে শুরু করে সাহায্য নেওয়া হয় অ্যানিমেশনের ৷ সমাজের মননে থাকা দেশপ্রেমকে চাগিয়ে দিতে কাজে লাগানো হয় অত্যাধুনিক রীতিনীতি ৷ রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে সুচিন্তিত মনোভাব প্রকাশের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পথ হয়ে উঠেছে মিম আর মোশন গ্রাফিক্স ৷ এই সব পোস্টের আলাদা কদর আছে সোশাল মিডিয়ায় ৷ খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেসব পৌঁছে যায় বহু সংখ্যক মানুষের কাছে ৷

আদতে রাজনৈতিক বিষয়ে জনমত তৈরি করা বা দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার পথটাই এখন বদলে গিয়েছে আমূল ৷ এখন আমাদের মাথা মেশিন লানিংয়ের খুঁটিনাটি বুঝে নিতে পারে ৷ আর তাই শিল্পভাবনাও এখন অনেক বেশি যন্ত্রনির্ভর ৷ আর সেই শিল্পভাবনা জনমত তৈরির ব্যাপারে অতিশয় দরকারি ভূমিকা নিয়ে থাকে ৷

Iran War
সামরিক বাহিনীর বীরত্বকে প্রচার করতে এআই থেকে শুরু করে অ্যানিমেশনের সাহায্য নেওয়া হয় (ইটিভি ভারত)

অতীতে যাঁরা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নিতেন বা যুদ্ধ যাঁদের জীবনে ধ্বংস নামিয়ে আনত তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানাতেন লেখক-কবি ও গীতিকারদের ৷ সেই অভিজ্ঞতা তার সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে হয়ে উঠত কবিতা-গল্প বা গান ৷ কিন্তু এখন সেই অভিজ্ঞতা মনে রাখা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রবণতা প্রযুক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে ৷ যুদ্ধের ধ্বংসলীলার মধ্যে বসে মিম তৈরি করা যায় এখন ৷ বিষাদ হয়ে উঠেছে ডিজিটাল মাধ্যমের শিল্পকলা ! কন্টেন্ট ক্রিয়েটারে মনের ভাব রিলের পাশাপাশি শর্টসের আকারে পৌঁছে যায় তাঁদের দর্শকদের কাছে ৷ শুধু মনের ভাব পৌঁছে যাওয়া নয় এখানে সময়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ৷ রিলটি ঠিক যে সময়ে তৈরি হচ্ছে তখনই পৌঁছে যাচ্ছে দর্শকের কাছে ৷ এতে মতামত বিনিময়ের পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে তৈরি হবে ৷ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং দর্শকের মধ্যে এমন এক সুনিয়োজিত ব্যবস্থা এখন তৈরি হয়েছে যা আগে ছিল না ৷

এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন পক্ষ একসঙ্গে অবস্থান করতে পারে ৷ মেসেজ থেকে শুরু করে মিমের মাধ্যমে একে অপরকে আক্রমণ করে ৷ শিল্পকলার অন্য ধারারও সেখানে অবাধ বিচরণ ৷ আর তার জেরে 'হিউমার ডিউরিং ওয়ার' বা 'ওর্য়াল্ড ওয়ার থ্রি মিমস' এর মতো হ্যাশট্যাগ তৈরি হতে মোটেই সময় লাগে না ৷ যুদ্ধক্ষেত্রে ভিতরে এবং বাইরে বসে প্রতিনিয়ত জে়নজি এই ধরনের পোস্ট তৈরি করে চলেছে ৷ পাল্লা দিয়ে চলছে পোস্ট করা ৷ ওয়ারমিমস-এর মতো ওয়েবসাইট এখন সক্রিয় ৷ তাদের একমাত্র কাজ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মিম তৈরি করা ৷ সবমিলিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরে যাচ্ছে নেতিবাচক এবং বিভাজনমূলক বক্তব্যে যদিও প্রচারের মাধ্যমগুলি আলাদা আলাদা ৷ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে এমনই নানা মিম ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র ৷ তার কোনও কোনওটি ইজরায়েলের প্রশংসাসূচক ৷ কয়েকটির ইজরায়েল বিরোধিতা সর্বজনবিদিত ৷ মিথ্যা প্রচার বাড়ছে ৷ গুজব ছড়াচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর অ্য়াখ্যানের বিরোধিতা করে ৷ মানুষও অন্য কাজ বাদ দিয়ে এই প্রচার তন্ত্রের অংশ হয়ে গিয়েছে ৷ কখনও তার কাজ কোনও একটি বিষয়ের মহিমা মণ্ডন করা ৷ কখনও আবার সমালোচনাই হয়ে দাঁড়ায় মূল কাজ ৷

ফেলে আসা সময়ে যুদ্ধ-গান আর আজকের দিনের প্রযুক্তি নির্ভর প্রচারের মধ্যে মূল ফারাক অভিঘাতে ৷ অ্যাখ্য়ান তৈরির ব্যাপারে আবেগ এবং অনুভূতির মধ্যে বিশেষ বদল ঘটেনি ৷ কিন্তু পরিণামের মধ্যে সামান্য মিলও নেই ৷ আগে দর্শক বা পাঠকের কাছে কোনও ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ পৌঁছে দিতে অনেক বেশি সময় লাগত ৷ এখন সময় লাগে মাত্র কয়েক মুহূর্ত ৷ তবে এটাও ঠিক যন্ত্র নির্ভর অ্যাখ্যানের ঠিকে থাকার সময়কাল খুবই কম ৷ আগে পরিস্থিতি ছিল আলদা ৷ যুদ্ধকে নিয়ে তৈরি একটি গান বা কবিতা দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক থাকত ৷ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহু মানুষের অনুপ্রেরণার কারণ হয়ে উঠত ৷ অতীতে ক্রিয়েটররা ছিলেন অনেক বেশি যোগ্য এবং স্বতন্ত্র ৷ মেশিন তাঁদের দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি ৷ ল্যাঙ্গুয়েল লার্নিং মডেল তাদের মানুষের অভিব্যক্তি নকল করার দক্ষতা শেখায়নি ৷ আগে দু:খ ছিল আসল ৷ কারণ সেখানে মেশিনের নিয়ন্ত্রণ ছিল না ৷ হত্যাকারীকে নিজেকেও অন্যের দু:খ-যন্ত্রণাকে দেখতে হত ৷ যুদ্ধ তখনও এআই নির্ভর হয়নি ৷

IRAN WAR
বিশ্বনেতাদের নিয়ে এখন অহরহ তৈরি হচ্ছে মিম (ইটিভি ভারত)

যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দেশ ড্রোনের পাশাপাশি মিসাইল ব্যবহার করে আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে ৷ যুদ্ধ এখন শুধু মাঠে হয় না ৷ নেটদুনিয়াও যুদ্ধে অংশ নিয়ে থাকে ৷ যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছেন তাঁদের মনোবল বাড়ানোর কাজ করে নেটবিশ্ব ৷ এখানে ক্রিয়েটার এবং উপভোক্তারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি ৷

এখন অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয় অ্যাখ্যানের গতিপ্রকৃতি কী হবে ? আগে এই বিষয়টি ঠিক করার ভার ছিল মানুষের উপর ৷ অনেক কিছু বদলেছে ৷ বদল অব্যাহত থাকবে আগামিদিনেও ৷ আর প্রযুক্তির এই বদল কেমন হবে, কতটা হবে সেটা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব ৷ তবে এটুকু বলা যায় প্রযুক্তি যেভাবে বদলাবে সেভাবেই বদলাবে উপভোক্তাদের ব্যবহার ৷ এখানেই আমাদের আশা আগামিদিনে পরিবর্তন হবে তা যেন মানুষের ভালোর জন্য হয় ৷ মানব সভ্যতার ভালোর জন্য হয় ৷