কলকাতায় 41 কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’, কোনও বই স্পর্শ করলেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তথ্য
কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে 41 কোটি টাকা ব্যয়ে ‘শব্দলোক’ (Shabdalok) নামে একটি অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক 'শব্দের জাদুঘর' (Museum of Words) চালু হয়েছে ।

Published : August 29, 2026 at 3:34 PM IST
কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে যুক্ত হয়েছে এক নতুন অধ্যায় ৷ এটি এমন এক অধ্যায়, যেখানে শব্দ কেবল পড়াই হয় না, বরং অনুভব করা যায় । ন্যাশনাল লাইব্রেরির ঐতিহাসিক 'বেলভেডিয়ার হাউস'-এ স্থাপিত ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ (বা ‘শব্দলোক’) ভাষাকে এক জীবন্ত অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছে ।
এই জাদুঘরটি এমন এক প্রাণবন্ত মঞ্চ হিসাবে কাজ করে যা ধ্বনি থেকে শব্দ এবং শব্দ থেকে সভ্যতার বিবর্তনের যাত্রাকে তুলে ধরে । প্রায় 41 কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পটি ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি উৎসর্গীকৃত । 19 জুলাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এর উদ্বোধন করেন তবে এই জাদুঘরের ধারণাটি মূলত 2020 সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই উপস্থাপন করেছিলেন ।
শব্দ যখন অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়:
ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামস (NCSM) এবং সংস্কৃতি মন্ত্রকের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘শব্দ-লোক’-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক প্রকৃতি । এই জাদুঘরটি স্পর্শ, শব্দ, দৃশ্য এবং কল্পনার মাধ্যমে ভাষার উৎপত্তি, বিবর্তন ও প্রসারের কাহিনি তুলে ধরে । এখানে দর্শনার্থীরা কেবল দর্শক নন, বরং ভাষার জগতের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী । বেলভেডিয়ার হাউসের প্রথম ও দ্বিতীয় তল জুড়ে বিস্তৃত নয়টি বিশেষ গ্যালারিতে ভারতের 22টি তালিকাভুক্ত ভাষা এবং এর বিচিত্র সব উপভাষার বিবর্তন-যাত্রাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ।
প্রথম গ্যালারি, 'প্রথম শব্দ' (First Words), তুলে ধরেছে মানুষ কীভাবে কথা বলতে শিখেছিল ৷ কীভাবে ধ্বনি অর্থবহ হয়ে উঠেছিল এবং যোগাযোগের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল । দ্বিতীয় গ্যালারি, 'মাতৃভাষা' (Mother Tongue), ব্যাখ্যা করে যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, বরং তা মানুষের পরিচিতি, আবেগ ও স্মৃতির মূল ভিত্তি । ভারতে বিভিন্ন ভাষা-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত শত শত মাতৃভাষার প্রচলন রয়েছে । যোগাযোগ কেবল শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ নৃত্য, অঙ্গভঙ্গি, সঙ্গীত ও শারীরিক চালচলনের মাধ্যমেও নিজেদের আবেগ প্রকাশ করে থাকে । তৃতীয় গ্যালারি, 'নবরস' (Navras), হলোগ্রাফির মাধ্যমে আবেগের এই প্রকাশকে জীবন্ত করে তোলে, যেখানে একটি বোতামের ক্লিকেই মঞ্চ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ।
ভাষার স্বর্ণালী বিস্তার:
এই জাদুঘরে ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে যেভাবে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে হিন্দি এবং এর বিভিন্ন উপভাষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক । জাদুঘরের চতুর্থ গ্যালারিটি ভাষা ও হিন্দির বিবর্তনের ইতিহাসের (টাইমলাইন) উপর নিবেদিত ৷ এটি দর্শকদের প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক মুদ্রিত বই পর্যন্ত এক যাত্রাপথে নিয়ে যায় । এখানে দর্শকরা হিন্দি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার বিবর্তনের ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলি প্রত্যক্ষ করতে পারেন ৷ তাম্রফলক, তালপাতা ও ভূর্জপত্রে খোদাই করা শব্দ থেকে শুরু করে পাণ্ডুলিপিতে তাদের রূপান্তর এবং পরিশেষে মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস । ইন্টারেক্টিভ ডিসপ্লে, অডিয়ো ইনস্টলেশন এবং ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে হিন্দির এই বিবর্তনের যাত্রাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে । নির্দিষ্ট সাউন্ড প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দর্শকরা ঐতিহাসিক ভাষণ ও সাহিত্যের অংশবিশেষ শুনতে পারেন, যেখানে হিন্দির বলিষ্ঠ উপস্থিতি ভাষাটির প্রাণশক্তিকে অনুভব করায় ।
গুহা থেকে গুগল, এক যাত্রাপথ
ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস বা টাইমলাইন প্রদর্শনকারী গ্যালারিটি জাদুঘরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত । এখানে দর্শকরা দেখতে পান কীভাবে গুহাচিত্রের মাধ্যমে শুরু হওয়া ভাবপ্রকাশের মাধ্যমটি ধীরে ধীরে লিপি বা বর্ণমালায় বিবর্তিত হয়েছে এবং পাণ্ডুলিপি ও বইয়ের পর্যায় পেরিয়ে গুগলের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পৌঁছেছে । শিলালিপি, তাম্রফলক, তালপাতা, প্রাচীন মুদ্রা এবং দুর্লভ পাণ্ডুলিপি এই যাত্রাপথের বাস্তব প্রমাণ বহন করে । লোকশিল্প ও মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর নিবেদিত গ্যালারিগুলি প্রমাণ করে, ভাষা কেবল লিখিত শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; লোকসঙ্গীত, লোককথা, নাট্য পরিবেশনা এবং গল্প বলার ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজের সমষ্টিগত স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে । পাশাপাশি, 'গ্লোবাল ডায়ালগ' বা 'বৈশ্বিক সংলাপ' গ্যালারিটি তুলে ধরে কীভাবে ভাষা ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে ।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই হিন্দি বলা ও বোঝা হয় ৷ ভারতীয় প্রবাসীদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে এর বিস্তার ঘটেছে । প্রকৃতপক্ষে, 'শব্দলোক' (Shabdlok) তার বৈচিত্র্যময় গ্যালারিগুলির মাধ্যমে ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছে । এখানে অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR), থ্রি-ডি (3D) প্রজেকশন এবং রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (RFID)-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে । উদাহরণস্বরূপ, কোনও বই স্পর্শ করলেই তার সম্পর্কিত তথ্য পর্দায় ভেসে ওঠে, আবার গেম-ভিত্তিক মডিউলগুলি ভাষা শেখার প্রক্রিয়াকে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলে । আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, এই জাদুঘরটি তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ।

