'ফার্স্ট লেডি'র পর প্রধানমন্ত্রী, জলপাইগুড়ির মেয়ে থেকে ব্যাটলিং বেগম- ফিরে দেখা জিয়া-জীবন
1981 সালে রাজনীতিতে প্রবেশ ৷ তারপর বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ৷ ফিরে দেখা খালেদার রাজনৈতিক জীবন ৷

Published : December 30, 2025 at 1:38 PM IST
ঢাকা, 30 ডিসেম্বর: রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল না কোনওদিন ৷ অবিভক্ত জলপাইগুড়ির এই মেয়ে পরবর্তী কালে হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী- বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি ৷ কিন্তু, 35 বছর বয়সে স্বামীকে হারানোর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে আধিপত্য বিস্তার করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৷ হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রথম এবং বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী ৷ তাঁর আগে এই নজির গড়েছিলেন পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো ৷ শেখ হাসিনা বনাম বেগম জিয়া, শেষ কয়েক দশক ধরে দুই নেত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অভ্য়স্ত হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষ ৷
তাঁদের একত্রে বলা হত 'ব্যাটলিং বেগমস' ৷ প্রায় কিংবদন্তির জায়গায় পৌঁছে যাওয়া সেই লড়াই শেষ হয়েছিল আগেই ৷ অসুস্থ হয়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গিয়েছিলেন খালেদা ৷ দেশ ছেড়েছেন হাসিনাও ৷ মঙ্গলবার শেষ হল খালেদার বর্ণময় জীবন ৷ দীর্ঘদিন একাধিক শারীরিক অসুস্থায় ভোগার পর রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)র দীর্ঘদিনের চেয়ারপার্সন খালেদার ৷ তাঁর মৃত্যুতে এক যুগের অবসান ঘটল বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের একাংশের ৷

শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন শেখ হাসিনা ৷ ঠিক তেমনই রাষ্ট্রপতি তথা জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন খালেদা ৷ 1981 সালের 30 মে সেনা অভ্যুথানে স্বামী জিয়াউরের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন সেদিনের 'অনভিজ্ঞ' খালেদা ৷ সেই সঙ্গে, 1978 সালে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ন্যাশানালিস্ট পার্টি (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেত্রীর দায়িত্ব নেন ৷
জলপাইগুড়ির খালেদা থেকে বাংলাদেশের বেগম জিয়া
তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের দিনাজপুরে 1946 সালের 15 অগস্ট জন্ম হয় খালেদার ৷ দেশভাগের পর তাঁর বাবা জলপাইগুড়ি থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন ৷ জলপাইগুড়িতে তাঁদের পারিবারিক চায়ের ব্যবসা ছিল ৷ এরপর 1960 সালে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ক্যাপটেন জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন খালেদা ৷ পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর ৷ বিয়ের পর বেগম জিয়া হিসাবেই পরিচিতি পান খালেদা ৷
বিএনপি-এর প্রধান হওয়ার পর তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে অনেকের মনেই অনিশ্চিয়তা তৈরি হয় ৷ কিন্তু রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন ৷ 2008 সালের নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে নিজেকে স্বশিক্ষিত বলে ঘোষণা করেন জিয়া ৷ পরে অবশ্য় বিএনপি-এর ওয়েবসাইটে বলা হয়, দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে পড়াশোনা করেন ৷

রাজনীতিতে খালেদার উত্থাান
খালেদার রাজনৈতিক জীবন মসৃণ ছিল না ৷ দীর্ঘ 4 দশকের রাজনীতিতে একাধিক চড়াই উতরাই দেখেছেন ৷ সামরিক শাসনের অবসানের পর 1975 সাল থেকে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকার জন্য সমর্থকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হন বিএনপি'র চেয়ারপার্সন ৷ 1990 এবং 2000-এর শুরুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন তিনি ৷ তবে তাঁর এই উত্থানকে অনেকেই 'দুর্ঘটনা' বলে ব্যাখ্যা করেছেন ৷
আনুষ্ঠানিকভাবে 1982 সালের 3 জানুয়ারি বিএনপির সদস্য হন খালেদা ৷ সেই বছরই মার্চ মাসে দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন তিনি ৷ এরপর 1984 সালের মে মাসে দলের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে ৷ আমৃত্যু সেই পদেই ছিলেন ৷
তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচএম এরশাদের 1982 সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য একটি আন্দোলন শুরু করেন । এই আবহে 1986 সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘোষণা করেন এরশাদ ৷ সেই সময় জিয়ার বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট এবং হাসিনার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন 15টি দলের জোট গণতন্ত্রের সপক্ষে প্রচারে ব্যস্ত ছিল ৷ উভয় জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিলেও শেষপর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাকি দলগুলি ৷ সেই সময় গৃহবন্দী করা হয় হাসিনাকে ৷ এদিকে, নির্বাচন বয়কটেই স্থির থাকে খালেদার জোট ৷ ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন এরশাদ ৷
এরপর 1990 সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার 1991 সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন পরিচালনা করেন ৷ নির্বাচনে সকলকে অবাক করে বিপুল ভোটে জয়ী হয় খালেদার দল ৷ সংসদ সংবিধান সংশোধন করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসন সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করা হয় ৷ বাংলাদেশের প্রথম এবং পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন বেগম জিয়া ৷

এরপর 1996 সালের নির্বাচনেও ক্ষমতায় আসে বেগম জিয়ার দল ৷ মাত্র 12 দিনের মাথায় সেই সরকারের পতন ঘটে ৷ শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের একাধিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের চাপে সরকার ছাড়তে বাধ্য হয় বিএনপি ৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে চলে যায় বাংলাদেশের ক্ষমতা ৷ সেই বছরের জুন মাসে ফের নির্বাচন হয় ৷ ভোটে হেরে গেলেও 116টি আসন জিতে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হয়ে ওঠে বিএনপি ৷
চারটি দলের সমর্থনে 1999 সালে খালেদা তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন ৷ 2001 সালে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন । এরপর 2006 সালে ক্ষমতা থেকে সরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। দুর্নীতির একটি মামলায় 2007 সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় ৷ বিভিন্ন নির্বাচনে তাঁর দল ধাক্কা খেলেও তিনি নিজে কখনও পরাজিত হননি ৷ এক বিএনপি নেতা বলেন, "1991, 1996, 2001 এবং এমনকী 2008 সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করেন খালেদা ৷"
হাসিনা-জিয়া লড়াই
দীর্ঘ 15 বছর ধরে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে বিএনপি ৷ হাসিনার আমলে 2018 সালে ঢাকার একটি আদালত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে খালেদা ৷ প্রথম মামলায় তাঁকে 5 বছরের এবং পরে দ্বিতীয় মামলায় তাঁকে 7 বছরের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয় ৷ পরে তাঁর অসুস্থতার জন্য তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় ৷
গত বছর গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন ঘটে ৷ বাংলাদেশের তৈরি হয় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ৷ এরপর গত বছর নভেম্বরে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান এবং সৈয়দ এনায়েত হোসেনের বেঞ্চ খালেদা জিয়ার শাস্তি মকুব করে ৷
খালেদা জিয়ার ভারত যোগ
1991 সাল থেকে 1996 সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জিয়ার প্রথম মেয়াদে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক কূটনীতি এবং উত্তেজনার এক মিশ্রণ ৷ বিশেষ করে গঙ্গার জল বণ্টন এবং সীমান্ত পারের অনুপ্রবেশ নিয়ে দু'দেশের সম্পর্কে খানিকটা উত্তেজনা তৈরি হয় । ভারতকে উপেক্ষা করে চিন এবং ইসলামিক দেশগুলির সঙ্গে কৌশলগত জোট মজবুতের লক্ষ্যে তাঁর সরকার 'লুক ইস্ট' নামে একটি নীতি গ্রহণ করে ৷ এই নীতির ফলে স্বাভাবিকভাবে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক কিছুটা 'ব্যাকফুটে' চলে যায় ৷
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটে ৷ যার ফলে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয় ৷ সেই সময় বাংলাদেশ পরিচালিত জঙ্গি গোষ্ঠী এবং সীমান্তে অনুপ্রবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নয়াদিল্লি ৷ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে 1996 এবং 2006 সালে ভারত সফর করেন খালেদা ৷ বিরোধী নেত্রী হিসাবে 2012 সালে একবার নয়াদিল্লি পৌঁছন তিনি ৷

