ETV Bharat / international

নেপালের হড়পা বান, প্রিয়জনের আশা ছেড়ে আত্মার মুক্তিতে প্রতীকী পারলৌকিক ক্রিয়া

ধ্বংসলীলার পর এক সপ্তাহ কেটে গিয়েছে ৷ কারও খোঁজ মিললেও কারও ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছেন পরিজনরা ৷ আত্মার মুক্তিতে পারলৌকিক ক্রিয়া চলছে নেপালে ৷

Identification number tags are seen on the bodies of flash flood victims.
হড়পা বানে মৃতদের চিহ্নিত করা হয়েছে নম্বর দিয়ে (ছবি: এপি)
author img

By AFP

Published : September 2, 2026 at 7:33 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

নুয়াকোট (নেপাল), 2 সেপ্টেম্বর: কাদা-মাটির সুনামি যে পথ দিয়ে বয়ে গিয়েছে, সেখানে এখন শুধুই পলির পুরু স্তর ৷ এর নীচে যে কত মানুষ বা গবাদি পশু চাপা পড়েছে বা কত ঘরবাড়ি ডুবেছে, তার তল পাওয়া প্রায় অসম্ভব ! এই আবহে ঘটনার এক সপ্তাহ পরেও পরিজনদের খুঁজে পাচ্ছে না পরিবারগুলি ৷ তাই অনেকেই তাঁদের প্রিয়জনের প্রতীকী পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করছেন ৷

প্রার্থনা একটাই, হড়পা বানে মৃত স্বজনের আত্মা যেন মুক্তি পায়, যাঁরা ভোটেকোশির স্রোতের টানে কোথায় চলে গিয়েছেন, কেউ জানে না ৷ 26 অগস্ট, সকাল 8.30 টা নাগাদ হঠাৎ নেপাল-চিন সীমান্তে ভোটেকোশি নদীতে পাহাড় বেয়ে ধেয়ে আসে কাদা-মাটির বিপুল স্রোত ৷

এই বিপর্যয়ের পর এক সপ্তাহ কেটে গিয়েছে ৷ এখনও মৃতদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে এবং নিহতের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে ৷ এখনও পর্যন্ত 1 হাজার 127 জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে ৷ নেপালের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (NDRRMA) জানিয়েছে, 583 জন বিদেশি এবং 83 জন নিরাপত্তাকর্মী-সহ 4 হাজার মানুষ নিখোঁজ ৷

তবে নেপালের উদ্ধারকারীরা আশাবাদী, হয়তো এখনও এই কাদা-মাটির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কেউ বেঁচে আছে, কোথাও হয়তো প্রাণের স্পন্দন চলছে ৷ এদিকে হড়পা বানের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছেন এমন আত্মীয়-পরিজনরা তাঁদের প্রিয়জনের সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছেন- ত্রাণ শিবির থেকে মর্গ সর্বত্র ৷

Symbolic Funeral for missing ones
রাজধানী কাঠমান্ডুতে প্রিয়জনের প্রতীকী পারলৌকিক ক্রিয়া চলছে (ছবি: এএফপি'র ভিডিয়ো থেকে স্ক্রিনশট নেওয়া)

দোলমা নেওয়ার তামাং তাঁর স্বামীকে অনেক খুঁজেছেন, ফোন করেছেন ৷ সাতদিন কেটে যাওয়ার পরেও তাঁর সন্ধান না-পেয়ে প্রতীকী পারলৌকিক ক্রিয়া করেছেন ৷ তাঁর কথায়, "ওঁর আত্মা যেন মুক্তি পায় ৷ তাই এটা করতে হল ৷ তিনি যেখানেই থাকুন, সুখে-শান্তিতে থাকুন ৷" এই হড়পা বান যখন নেমে আসছিল, তখন তাঁর স্বামী চিনে যাচ্ছিলেন ৷ তাই তাঁর জীবন্ত ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছেন দোলমা ৷ সংবাদসংস্থা এএফপি-কে তিনি বলেন, "আমি বহুবার ফোন করেছি ৷ কিন্তু তিনি একবারও ফোন তোলেননি ৷"

উদ্ধারকারীরা কাদা-মাটির পুরু আস্তরণের ভিতর থেকে দেহ বের করতে পেরেছেন ৷ কোথাও হয়তো দেহের অংশ বেরিয়ে রয়েছে ৷ সেই জায়গা খুঁড়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেহ উদ্ধারের চেষ্টা করে চলেছেন তাঁরা ৷ কোথাও দেহ পাওয়া গেলেও, অনেক জায়গা দেহাংশই তুলে দিতে হচ্ছে পরিবারের হাতে ৷ আর তাই ডিএনএ পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে নেপাল প্রশাসন ৷ দেশের বিদেশ মন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, তিনি আশা করেন হাজার হাজার নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধার করা যাবে ৷ তাঁর কথায়, "মিব়্যাকল তো হয় ! এই অবস্থায় আমি পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিতে পারি না ৷"

বিশ্বের দায়িত্ব

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ এই বিপর্যয় প্রসঙ্গে বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চল বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে ৷ সেই ঝুঁকি দিনে দিনে বেড়েই চলেছে ৷ আমাদের উপর দিয়ে যে বিপর্যয় বয়ে গিয়েছে, তা সেই ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়েছে ৷ জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের অবদান রয়েছে এবং এই ধ্বংসলীলায় সাড়া দেওয়ার দায়িত্বও সমগ্র বিশ্বের ৷"

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিমালয়ের তাপমাত্রাও বাড়ছে ৷ এর ফলে হিমবাহ গলে যাচ্ছে ৷ হিমালয় এবং হিন্দুকুশ পর্বতশৃঙ্গ, পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী 24 কোটি মানুষের জলের উৎস ৷ পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদী-উপত্যকাগুলিতেও জল নেমে আসে এই দুই বিশাল পর্বতশৃঙ্গ থেকে ৷ জল সরবরাহ করে আরও 165 কোটি মানুষকে ৷

আর হিমালয়ের কোলে ছোট্ট রাষ্ট্র নেপালে খুব বেশি হলে 3 কোটি মানুষের বাস ৷ বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন, যার উৎস উন্নত ও উন্ননয়নশীল দেশগুলি ৷ এদিকে গ্রামাঞ্চল অধ্যুষিত এই পাহাড়ি রাষ্ট্রের গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপাদনে কোনও ভূমিকা নেই ৷ অথচ এর মূল্য চোকাতে হচ্ছে তাদের ৷ তাই বিধ্বংসী হড়পা বানের পর দেশবাসীর মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে ৷

কাঠমান্ডু ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, ধ্বংসলীলার পর পুনর্নির্মাণে কয়েকশো বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন ৷ নেপালের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে ৷ সীমিত ক্ষমতা নিয়েই চলছে বিপর্যয় মোকাবিলার কাজ ৷ তবে উদ্ধার ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়ে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত, আমেরিকার মতো দেশগুলি ৷

চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছে, এই হড়পা বানে তিব্বতের গাইরং বন্দরে যাওয়ার রাস্তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ৷ প্রত্যেকদিন 24 ঘণ্টা কাজ করার পর বুধবার সেই রাস্তা আবার তৈরি করা সম্ভব হয়েছে ৷

গণ-কবর

নেপালের মর্গগুলিতে মৃতদেহ উপচে পড়ছে ৷ ডিএনএ নমুনায় কোনও পরিচয় না-পেয়ে কয়েকশো অজ্ঞাতপরিচয় দেহ কবর দিতে হচ্ছে ৷ মঙ্গলবার নেপাল জানিয়েছে, 1 হাজার 50 জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে ৷ 3 হাজার 916 মানুষ এখনও নিখোঁজ ৷ চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, 16 জনের মৃত্যু হয়েছে এবং 546 জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি ৷ নেপালের হড়পা বানের স্রোত নেমে এসেছে ভারতের নদীতেও ৷ সেখান থেকে 17টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে ৷

তিব্বত ও চিনে বিদেশি সাংবাদিকদের সঠিক তথ্যপ্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে ৷ তিব্বতের নির্বাসিত একটি গোষ্ঠী এই বিপর্যয়ে চিনের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ৷ এদিকে বেজিং জোর দিয়ে জানিয়েছে, সব তথ্য সবার সামনে রয়েছে ৷ সময়মতো প্রকাশ করা হচ্ছে এবং তা স্বচ্ছ ৷